কিন্তু অক্ষয় এ-ও জানে, মাথা খাটাতে আর অতি-লোভ সামলাতে পারলে, চুরি-বিদ্যাও লাভজনক হতে পারে।
অক্ষয় অতি-লোভী নয়। তার মাথাও আছে। তার দলবল নেই–সে একা চুরি করে। তার বিরুদ্ধে কেউ রাজার সাক্ষী হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। সে ঘন-ঘন চুরি করে না। অনেক বুঝেসুঝে ফন্দি এঁটে মাঝে-মাঝে চুরি করে, তারপর চোরাই মাল বেচে যে-টাকা পায়, তা নানাবিধ বৈধ উপায়ে খাটায়। আমাদের অক্ষয় চৌধুরী ভারি হুঁশিয়ার লোক। পুলিশ তার কাছে হার মেনেছে।
সে প্রকাশ্যে জহুরির কাজ করত। কিন্তু তার কোনও-কোনও সম-ব্যবসায়ীর বিশ্বাস ছিল, অক্ষয়ের কারবার নাকি চোরাই পাথর নিয়ে। তবে এ হচ্ছে সন্দেহ মাত্র। কেউ তাকে হাতে-নাতে ধরতে পারেনি। কাজেই অক্ষয় হাসিখুশি অম্লানই আছে আজ পর্যন্ত।
সুবিধা পেলেই সে চোরাই হিরা-পান্না-মুক্তা নিয়ে কাজ গোছাতে ভোলে না।
গল্পের আরম্ভেই দেখতে পাবেন, অতি-গুণধর অক্ষয় সান্ধ্যবায়ু সেবন করছে বাড়ির সামনেকার বাগানে।
এটি একটি গ্রামের বাড়ি। গ্রামের আসল নাম বলব না, আমরা চাঁদনগর নামেই ডাকব। এখান থেকে কলকাতা খুব বেশি দূরে নয়।
বাড়িতে অক্ষয় আজ একলা। রামচরণ ভিন-গাঁয়ে কী কাজে গেছে, ফিরবে বেশি রাতে। অক্ষয়কে যখন-তখন হঠাৎ গ্রাম ছেড়ে যেতে হত, তাই সে বাড়ির সদরের চাবি করেছিল দুটি। একটি থাকত তার নিজের কাছে, আর একটি থাকত রামচরণের জিম্মায়। যে যখন। আসত, তার নিজের চাবি দিয়ে দরজা খুলে বাড়ির ভিতরে ঢুকত। আজও রামচরণ জেনেই গিয়েছে যে, রাত্রে বাড়িতে এসে সে তার মনিবকে দেখতে পাবে না। অক্ষয়কে খানিক পরেই কলকাতায় যেতে হবে। উদ্দেশ্য, খানকয় ছোট-বড় হিরা বেচা। সেগুলি চোরাই বলে অক্ষয়ের মানহানি করব না। কিন্তু সে হিরাগুলি কোথায় আছে জানেন? তার জুতার গোড়ালির ভিতরে!
অবাক হওয়ার কিছুই নেই। অক্ষয়ের একপাটি জুতার গোড়ালি হচ্ছে দেরাজের পুঁচকে সংস্করণ। কৌশলে টানলে তার একটি অংশ টানার মতন বেরিয়ে আসে। এই উপায়ে পকেট কাটার ও পুলিশের অন্যায় জব্দ হয়।
সন্ধ্যা। বাতাসে বন্য গন্ধ, অন্ধকারের গায়ে চুমকির মতন জোনাকি। চারিদিক নিঃসাড়। অক্ষয় বাইরে যাবার পোশাক পরেই বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এখনও ট্রেনের সময় হয়নি।
হঠাৎ অদূরে রাস্তায় জাগল কার পায়ের শব্দ।
অক্ষয় ভাবতে লাগল। কোনও অতিথি আসছে না কি? কিন্তু তার বাড়িতে অতিথি আসে তো কালেভদ্রে। এখানে কাছাকাছি অন্য কারুর বাড়ি নেই। তার বাড়ির পরেই হচ্ছে পোড়ো জমি–একটা অর্ধ-নির্মিত রাস্তা শেষ হয়েছে সেখানে গিয়েই। এ-নতুন পথে তো গায়ের লোক আসে না!
বাগানে ঢোকবার মুখেই ছিল একটি বেড়া। কৌতূহলী অক্ষয় তার উপরে ঝুঁকে ভর দিয়ে অন্ধকারের ভিতরে চোখ চালাবার চেষ্টা করলে।
অন্ধকারের বুকে জ্বলল একটা দেশলাইয়ের কাঠি, দেখা গেল একখানা মুখ, অস্পষ্ট দেহ। আগন্তুক সিগারেট ধরাচ্ছে।
অক্ষয় শুধোলে, কে?
আগন্তুক এগিয়ে এল। কাছে এসে ইংরেজিতে জিজ্ঞাসা করলে, এই পথ দিয়ে কি চাঁদনগর জংশনে যাওয়া যায়?
অক্ষয় ইংরেজিতে বললে, না; স্টেশনে যাওয়ার অন্য রাস্তা আছে।
আবার অন্য রাস্তা! রক্ষে করুন মশাই, যথেষ্ট হয়েছে! কে এক বোকা আমায় এমন। রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছে, ঘুরে-ঘুরে পায়ের নাড়ী ছিঁড়ে গেল।
মশাইয়ের কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
কলকাতা থেকে এসেছিলুম এখানকার জমিদারবাড়িতে। যাব আবার কলকাতায়। এখন পথ হারিয়ে অন্ধের মতন ঘুরে মরছি। একে আমি চোখে খাটো, তায় এই অন্ধকার। আর পারি না!
আপনি কটার ট্রেন ধরতে চান?
সাড়ে আটটার।
তাই নাকি? আমিও ওই ট্রেনে আজ কলকাতায় যাব। কিন্তু এখন সবে সাতটা, আমি আটটা-পনেরোর আগে বাড়ি থেকে বেরুব না। আপনি যদি আমার বৈঠকখানায় এসে খানিকক্ষণ বসেন, তা হলে আমরা একসঙ্গেই স্টেশনে যেতে পারি। স্টেশন এখান থেকে আধ মাইলের বেশি হবে না।
মুখখানা সামনের দিকে বাড়িয়ে চশমা-পরা চোখে বাড়ির দিকে তাকিয়ে আগন্তুক কৃতজ্ঞকণ্ঠে বললে, ধন্যবাদ মশাই, ধন্যবাদ।
অক্ষয় বেড়ার দরজা খুলে দিলে। আগন্তুক একটু ইতস্তত ভাব দেখালে। তারপর মুখের আধপোড়া সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাগানের ভিতরে প্রবেশ করলে।
.
দ্বিতীয়
বৈঠকখানা অন্ধকার ছিল। অক্ষয় কড়িকাঠ থেকে ঝোলানো একটা ল্যাম্পে অগ্নিসংযোগ করল। এতক্ষণ পরে দুজনেরই দুজনকে ভালো করে দেখবার সুবিধা হল।
অক্ষয় সচমকে নিজের মনে-মনে বললে, ও হরি, এ যে দেখছি জহুরি মণিলাল বুলাভাই! হুঁ, মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, আমাকে চেনে না।
প্রকাশ্যে বললে, বসুন মশাই, আরাম করে বসুন। অনেক হাঁটাহাঁটি করেছেন, একটু চা-টা ইচ্ছা করেন?
মণিলাল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তার পরনে কোট-পেন্টুলুন। মাথায় ধূসর রঙের নেমদার টুপি–অর্থাৎ ফেল্ট হ্যাট। সে টুপিটা ঘরের কোণে একখানা চেয়ারের উপরে রাখলে এবং হাতের ছোট ব্যাগটা রাখলে একটা টেবিলের উপরে। ছাতাটাও তার গায়ে ঠেসিয়ে দাঁড় করিরে সোফার উপরে বসে পড়ল।
বৈঠকখানায় একপাশে রান্নাঘর। উনুনে আগুন ছিল। চায়ের জল গরম করতে দেরি লাগল না। চা তৈরি করে অক্ষয় আবার বৈঠকখানায় এসে ঢুকল। চায়ের ট্রে-খানা টেবিলের উপরে রাখলে। একখানা থালায় দুটি রসগোল্লা ও আর একখানা থালায় খানদুই ক্রিম-ক্র্যাকার বিস্কুট দিতেও ভুলল না।
