.
জয়ন্তের বাড়িতে বসেছে একটা চায়ের বৈঠক। উপস্থিত আছেন জয়ন্ত, মানিক, সুন্দরবাবু, দুজন ছদ্মবেশী পুলিশ-ইনস্পেকটর আর ওরা তিনজন–অমর সিং, চক্রধরপুরের জমিদার রামতারণ বোস এবং জ্যোতিষী রামদেও শর্মা।
চায়ের বৈঠকে সাধারণ নানা আলোচনা চলছিল। হঠাৎ সুন্দরবাবু বলে উঠলেন– অমরবাবু, জয়ন্তবাবু পাশের ঘরে আপনার সাথে কয়েকটা কথা বলতে চান। আপনার অসুবিধা হবে না তো?
অমরবাবু হেসে বললেন–না না, অসুবিধা আর কী?
জয়ন্ত অমরবাবুর সাথে পাশের আধো-অন্ধকার ঘরটিতে প্রবেশ করল।
অমরবাবু ঘরের মধ্যে পা দিয়েই চমকে উঠলেন। আধো-অন্ধকার ঘরের এক কোণে ঠিক যেন নিহত ব্যক্তি দুজন দাঁড়িয়ে আছে বাঁ-পাঁজরে ছোরা বেঁধানো, রক্তে দেহ ভেসে যাচ্ছে, মুখে আতঙ্কের চিহ্ন…
জয়ন্তের দিকে চেয়ে অমরবাবু প্রশ্ন করলেন–এটা কী জয়ন্তবাবু?
জয়ন্ত হেসে বলল, ও কিছু না, শুধু আমার একটা খেয়াল মাত্র।
তার মানে?
–মনে করছি এবার থেকে নিহত ব্যক্তিদের একটা করে মোমের পুতুল তৈরি করে আমার এই ঘরটায় সাজাব একে-একে।
অমরবাবু হেসে বললেন, আচ্ছা অদ্ভুত খেয়াল তো মশাই আপনার!
জয়ন্ত হেসে বলল–হ্যাঁ। ডিটেকটিভদের মাঝে-মাঝে এরকম অদ্ভুত খেয়াল হয়ে থাকে বটে। তবে এরও নিশ্চয় কোনও অর্থ আছে!
দু-একটা কথাবার্তার পর জয়ন্ত তাকে বিদায় দিয়ে ডেকে পাঠালে জ্যোতিষী রামদেও শর্মাকে। রামদেও নিশ্চিন্ত মনে ঘরে প্রবেশ করছিল। হঠাৎ একসময় নিজের অজ্ঞাতেই তার চোখ দুটো গিয়ে ঠিকরে পড়লে ঘরে এককোণে রক্ষিত মূর্তিদুটির ওপরে। তার যেন মনে হল নিহত ব্যক্তি দুজনেই দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। কে যেন মুহূর্তে শুষে নিল তার মুখের সব রক্তটুকু। একটা অস্ফুট শব্দ করেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
সবাই ছুটে এল। চারিদিকে বেধে গেল হইহুল্লোড়।
সুন্দরবাবুও ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন। তার দিকে চেয়ে জয়ন্ত বললে–এই নিন সুন্দরবাবু আপনার খুনি। একে এক্ষুনি গ্রেপ্তার করুন।
.
জ্ঞান ফিরে পাবার পর জয়ন্ত তার দিকে চেয়ে হেসে প্রশ্ন করল–আপনার অপরাধ আমরা জানতে পেরেছি, সুতরাং এবারে দোষ স্বীকার করুন, তাহলে শাস্তির পরিমাণ কম হতে পারে।
জ্যোতিষী রামদেও শর্মা দোষ স্বীকার করল।
জয়ন্তের প্রশ্নের উত্তরে তিনি সংক্ষেপে জানালেন তার হত্যার কারণ।
.
রামদেও শর্মা যে কাহিনি বলল তা অতি রহস্যজনক। রামদেও আসলে খুব বড় জ্যোতিষী ছিল না। জ্যোতিষী সেজে কেবল লোকের মনের খবর বের করে নিত। তারপর অন্য একজন লোকের নাম দিয়ে চিঠি লিখে জানাত তাকে প্রচুর টাকা না দিলে সে সব রহস্য ফাঁস করে দেবে। আসলে সে ছিল একজন ব্ল্যাকমেলার। পুলিশ কিন্তু তার ওপরে কোনওদিন সন্দেহই করেনি।
নিহত ব্যক্তি দুজন এবং আরও চার-পাঁচজন লোককে সে ব্ল্যাকমেল করেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেকেই পরে টাকা দিতে অস্বীকার করে। নিহত ব্যক্তি দুজনও তাদের মধ্যে অন্যতম। যদিও ওরা দুজনেই তাকে ভক্তি করত এবং তার কাছেই শক্তিমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিল, কিন্তু পরে তারা বেঁকে বসে, যখন তার আসল রূপ ওদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ে।
ওদের মতো আরও অনেকে রামদেও শর্মার কবল থেকে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে এবং চক্রধরপুরের জমিদার রামরতন বোসও তাদের মধ্যে অন্যতম।
কোনও উপায় না পেয়ে রামদেও শর্মা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং তার মক্কেলদের ভয় দেখাবার জন্যেই পরপর দুটি খুন করে এবং ঘরে রক্ত-পাঞ্জার ছাপ এঁকে রেখে যায়।
পরিশেষে রামদেও শর্মা স্বীকার করল যে, সত্যি জয়ন্তবাবুর মতো সুযোগ্য গোয়েন্দা এ ব্যাপারে হাত না দিলে কেউ তাকে সন্দেহও করতে পারত না।
ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু সবার শেষে বললেন সত্যি জয়ন্ত, অদ্ভুত তোমার ক্ষমতা। ঘরে বসেই তুমি খুনিকে আবিষ্কার করলে! জয়ন্ত হেসে বললে–সে তো আপনাদেরই সাহায্যে।
রহস্যের আলো-ছায়া (উপন্যাস)
প্রথম অংশ — অপরাধের কলাকৌশল
প্রথম
অক্ষয়কুমার চৌধুরী পণ্ডিতদের একটি মস্তবড় উক্তি ব্যর্থ করে দিয়েছে। পণ্ডিতরা বলেন, মানুষের মুখ হচ্ছে মনের আয়না।
কিন্তু অক্ষয়ের মুখের পানে তাকিয়ে তার চরিত্রের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে, এমন লোক কেউ আছে বলে জানি না। তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে পণ্ডিতদের মুখ হবে বন্ধ।
কী হাসি-হাসি সরল মুখ তার! সে-হাসির ভিতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে যেন সদাশয়তা আর ন্যায়পরায়ণতা! বসুধার সবাই যেন তার কুটুম্ব!
কিন্তু অক্ষয় নিজেই জানে, কেউ যদি তাকে চোর, জুয়াচোর, অসাধু বা দাগাবাজ বলে ডাকে, তবে একটুও মিথ্যা বলা হবে না।
তার ছোট বাড়িখানিতে থাকে একটি মাত্র আধবুড়ো লোক–একাধারে সেই-ই হচ্ছে পাঁচক ও বেয়ারা। নাম রামচরণ। সকলের কাছেই সে বলে বেড়ায়, আমার মনিবের মতন সৎ, আমুদে আর ভালোমানুষ লোক আর দেখা যায় না। মুখে তার গান আর মিষ্টি কথা লেগেই আছে।
কিন্তু রামচরণ যদি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারত, অক্ষয় তার মাইনের টাকা জোগাড় করে বড় বিদ্যা চুরি-বিদ্যার দ্বারা, তা হলে ব্রহ্মাণ্ডেও তার প্রকাণ্ড বিস্ময়ের স্থান-সংকুলান হত না।
চুরি-বিদ্যা বড় বিদ্যা হতে পারে, কিন্তু বিপজ্জনকও বটে। এ-সত্য অক্ষয়ের অজানা ছিল না। চোরের পক্ষে কেউ নেই বিপক্ষে সবাই।
