জয়ন্ত বলল–দেখুন, কোনও লোক খুন করে ছাপ মেরে যখন পলায়ন করে তখন ঠিক হাতের সামনেই তাড়াতাড়ি ছাপ মারে। ইচ্ছা করে অনেক উঁচুতে কিংবা অনেক নীচুতে মারবার মতো অবকাশ তার থাকে না।
সুন্দরবাবু বললেন, হ্যাঁ, তা বটে।
জয়ন্ত বলল–তার থেকে অনুমান করা যায় খুনির দেহের দৈর্ঘ্য। অবশ্য পাঞ্জার ছাপটা যে কয় ইঞ্চি লম্বা তাও জানা প্রয়োজন।
সুন্দরবাবু বললেন–আচ্ছা, ফোনে তোমায় আমি জানাব।
সেদিন সন্ধ্যার কিছু আগে জয়ন্ত সুন্দরবাবুর কাছ থেকে ফোনে জানতে পারল যে, মেঝে থেকে ছয় ফিট কয়েক ইঞ্চি ওপরে খুনির হাতের ছাপ পাওয়া গেছে এবং ছাপটির দৈর্ঘ্য প্রায় আট ইঞ্চি।
জয়ন্ত হাসতে-হাসতে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, দেখছি খুনির দৈর্ঘ্য প্রায় ছফুটের কাছাকাছি হবে।
আপনমনেই সে গভীর চিন্তার মাঝে তলিয়ে যায়।
.
তিনদিন পর।
খুব ভোরে জয়ন্তের ঘুম ভাঙল দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে। তাড়াতাড়ি ধড়মড় করে উঠে গিয়ে সে দরজা খুলে দিল। দেখা গেল ইনস্পেকটর সুন্দরবাবুকে।
আশ্চর্য হয়ে সে প্রশ্ন করল–এত ভোরে যে আপনার আগমন সুন্দরবাবু! রাতে ভালো ঘুম হয়নি বলে মনে হচ্ছে।
সুন্দরবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–আর বলো কেন ভায়া? এক মুহূর্তও কি আর শান্তিতে থাকবার যো আছে। কাল বরানগরে আলমবাজারের কাছে আর একজন লোককে ছোরা মেরে। খুন করা হয়েছে এবং এক্ষেত্রেও দালানের গায়ে পাওয়া গেছে রক্তমাখা হাতের ছাপ।
জয়ন্ত প্রশ্ন করল–এবারে মেঝে থেকে কত ফুট ওপরে ছাপ পেয়েছেন, এবং ছাপটি কত ইঞ্চি লম্বা?
সুন্দরবাবু বিজ্ঞের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল, সেইজন্যেই তো আমি এসেছি ভায়া। এবারে সমস্ত মাপ-জোপ করে তৈরি হয়েই এসেছি। এবারেও ঠিক বাঁ-হাতে ছোরা মেরে খুন এবং এবারেও মেঝে থেকে প্রায় ছফিট ওপরে আট ইঞ্চি লম্বা অবিকল পূর্বের মতো হাতের ছাপ। তাই তো ভায়া তোমায় আমার এত সুনজরে পড়ে গেছে। এখন উপায় একটা করো দেখি।
জয়ন্ত হেসে বলল–না, আর চুপ করে বসে থাকলে আরও দু-একজনের ওপরে লোকটি প্রতিহিংসা নিতে পারে! সুতরাং কালই সন্ধ্যায় আমি খুনিকে গ্রেপ্তার করব সুন্দরবাবু। কিন্তু আপনার সাহায্যের যে আমার একান্ত প্রয়োজন।
সুন্দরবাবু বললেন কি সাহায্য?
জয়ন্ত বলল–আচ্ছা, নিহত প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যক্তির মধ্যে কোনও আত্মীয়তা কিংবা অন্য কোনও সম্পর্ক ছিল কি?
সুন্দরবাবু বললেন–মোটেই নয়। বিষয়-সম্পত্তির লোভে যে খুনি এ কাজ করেনি, তা নিশ্চিন্ত। কারণ দুজনের মধ্যে কোনও সম্পর্কই ছিল না। সুতরাং দুজনকেই হত্যা করবে এমন আত্মীয় আসবে কোথা হতে! তা ছাড়া ওঁরা দুজনেই যদিও নেহাত গরিব নন তবুও এমন প্রচুর অর্থ ওদের ছিল না যার জন্যে কোনও আত্মীয়ের এত বড় লোভ হতে পারে!
জয়ন্ত বলল–বেশ, প্রথম ব্যক্তির কোনও নিকট আত্মীয় আছেন কি?
সুন্দরবাবু বললেন–হ্যাঁ, তার ভাইপো মণিবাবু আছেন।
জয়ন্ত বলল–ওতেই চলবে। এখন একটা কাজ করুন দেখি। প্রথম যে ব্যক্তি খুন হয়েছে তার অতি পরিচিত, অল্প পরিচিত, এমনকী সামান্যতম পরিচিত এ-রকম যতগুলি লোক আছে তাদের সকলের নাম জেনে নিয়ে একটা তালিকা প্রস্তুত করুন। আর দ্বিতীয় যে ব্যক্তিকে খুন করা হয়েছে তারও ঠিক এমনি একটা তালিকা প্রস্তুত করুন। তারপর দেখুন, এই দুই নিহত ব্যক্তিকেই চেনে, অর্থাৎ দুজনেরই পরিচিত এরূপ কজন ব্যক্তি আছে এবং তাদের মধ্যে কে কে লম্বা ও শক্তিশালী–তাদের নামের লিস্টটা আমায় দিন।
সুন্দরবাবু বললে–খাসা বুদ্ধি বটে তোমায় জয়ন্ত। তুমি কি ঘটনাস্থলে না গিয়ে শুধু ঘরে বসেই সব কাজ সারতে চাও?
জয়ন্ত হেসে বলল হ্যাঁ। ঘরে বসেই আমি খুনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হব সুন্দরবাবু। যা আপনারা খুনের ব্যাপারে তদন্ত করেও পারেননি।
.
সন্ধ্যাবেলা জয়ন্তের ঘরে আবার সুন্দরবাবুকে দেখা গেল। হাতে তাঁর বিরাট দুটি নামের তালিকা। জয়ন্তকে দেখে হেসে বললেন–দেখো জয়ন্ত, প্রথম এবং দ্বিতীয় নিহত ব্যক্তির আত্মীয়, পরিচিত এমনকী একবারও যে তাঁদের সাথে আলাপ করেছে তাদের আমি একটি তালিকা প্রস্তুত করেছি। কিন্তু দুজনকেই চেনে এমন লোক মাত্র এই পাঁচজন। তার মধ্যে আবার ছফুট লম্বা শক্তিশালী ব্যক্তি এই তিনজন। এদের নাম আমি লাল কালি দিয়ে দাগ দিয়ে রেখেছি।
জয়ন্ত প্রশ্ন করল–অপর দুজন?
সুন্দরবাবু হেসে বললেন–ওরা নেহাত বেঁটে আর রোগা। সুতরাং ওদের দ্বারা যে। এ হত্যা সম্ভব হয়নি তা নিশ্চিত সত্য।
জয়ন্ত বলল–ঠিক। এখন এই তিনজনের নাম ও পরিচয় আমি জানতে চাই।
সুন্দরবাবু বললেন–মোটামুটি যা জানা আছে দেখ। প্রথমজন, একজন রেসের বুকি। নাম তার অমর সিং। দ্বিতীয়জন, চক্রধরপুরের জমিদার রামতারণ বোস আর তৃতীয় ব্যক্তি একজন শাস্ত্রপণ্ডিত জ্যোতিষী, যিনি ওদের দুজনকেই শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত করেছিলেন। তাঁর নাম রামদেও শর্মা! লোকটির আসল বাড়ি বিহার, তবে বাংলায় বেশ কথা বলতে পারে।
জয়ন্ত জিজ্ঞাসা করল, ওঁরা দুজনেই কি ছিলেন শক্তিমন্ত্রের উপাসক?
সুন্দরবাবু শুধু বললেন হুঁ।
জয়ন্ত বলল–এবার তাহলে খুনিকে ধরবার ব্যবস্থা করি, কী বলেন?
সুন্দরবাবু জিজ্ঞাসা করলেন কিন্তু তুমি কী করে জানবে যে আসল খুনি কে?
জয়ন্ত হেসে বলল–দেখুন, আসল খুনি ধরা পড়ে দোষ পর্যন্ত স্বীকার করতে বাধ্য হবে…
