পায়ে-পায়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি, রত্নস্তূপের ওপরে এলিয়ে পড়ে রয়েছে দুরাত্মা ছুন ছিউর রক্তাক্ত মৃতদেহ! তার দু-দিকে ছড়িয়ে পড়া দুই হাতের এক মুঠোর ভেতরে মুক্তোরাশি এবং আর-এক মুঠোর মধ্যে হিরে-চুনি-পান্না! তার দুই চক্ষু ও মুখবিবর ভোলা স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে মৌন ভাষায় সে যেন বলতে চায়–বাঙালিবাবু, আমারই জয়-জয় কার, গুপ্তধন লুণ্ঠন করব বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম-গুপ্তধন নিয়েই চললুম আমি পৃথিবী ছেড়ে!
রক্তপাঞ্জা
অদ্ভুত একটা ফোন পেলেন ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবে প্রাতরাশ শেষ করেছেন, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল ঝনঝন শব্দে–
–হ্যালো? কে?
আমি লালবাজার থেকে কথা বলছি, ডেপুটি কমিশনার ডি. ডি. নর্থ সেকশন।
–ও, আপনি স্যার! হঠাৎ এত ভোরে কী আবার হল?
–বাগবাজারে মল্লিক স্ট্রিটের তেরো নম্বর বাড়িতে নাকি এক ভদ্রলোককে ছোরা মেরে খুন করা হয়েছে আর বিষয়টির তদন্ত ভার আমরা দিতে চাই আপনার উপর। আশা করি কৃতকার্য হবেন এক্ষেত্রে। উইস ইউ গুড লাক–
সুন্দরবাবু হেসে বললেন–ধন্যবাদ স্যার।
তাড়াতাড়ি পোশাক পরে তিনি যখন তদন্তে বেরিয়ে গেলেন তখন সাড়ে আটটা।
পরদিন বেলা নটা।
বিখ্যাত ডিটেকটিভ জয়ন্ত তার প্রাত্যহিক খবরের কাগজ পড়া শেষ করে মুখ তুলল। একটু আগে চা এবং খাবার খেয়ে শরীরটাও বেশ একটু চাঙ্গা। এখন হাতে কোনও কাজ নেই, চুপচাপ বসে থাকতে তার কোনওদিনই ভালো লাগে না।
ঘরে সশব্দে প্রবেশ করলেন ইনস্পেকটর সুন্দরবাবু। ঘরে পা দিয়েই হন্তদন্ত হয়ে বলতে শুরু করলেন–আরে জয়ন্ত, তুমি এখনও চুপচাপ বসে!
জয়ন্ত হেসে বলল–তাছাড়া আর উপায় কী বলুন? কাজ নেই, আপনারাও নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুচ্ছেন। আমি আর কী করব বলুন। চুপ করে বসে থাকতে কি আর ভালো লাগে! কিছু কাজকর্ম না থাকলে বনের মোষ তাড়িয়ে তো আর বেড়াতে পারি না!
সুন্দরবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন কী বলছ কাজ নেই! জানো পরশু রাতে বাগবাজারের তেরো নম্বর মল্লিক স্ট্রিটে একজন লোক রহস্যজনকভাবে খুন হয়েছেন। পেছন থেকে ছোরা মেরে তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ঘরের মধ্যে এমন কোনও চিহ্নই পাওয়া যায়নি যাতে কাউকে সন্দেহ করা যায় অথবা কোনও সূত্র মিলতে পারে।
জয়ন্ত হেসে বলল–তার মানে সংক্ষেপে এই বোঝায় যে, আপনারা একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছেন।
সুন্দরবাবু বললেন–তা ছাড়া উপায়ই বা কী এ ক্ষেত্রে? অথচ ডেপুটি কমিশনার আমার উপরই ভরসা করে এ-কেসটির ভার অর্পণ করেছেন। কিন্তু আমি তো প্রায় বোকা বনে গেছি!
জয়ন্ত হেসে বললে–ও, বোকা বনে গেছেন বলেই শেষ পর্যন্ত ভাঙা কুলো অর্থাৎ আমার কাছে ছুটে এসেছেন?
সুন্দরবাবু ঠাট্টাটা গায়ে মেখে বললেন–বেশ, তাই না হয় স্বীকার করছি। একথা বলতে আমার লজ্জা নাই যে, এসব ক্ষেত্রে তোমার মাথা আমাদের চেয়ে অনেকটা পরিষ্কার।
জয়ন্ত বললে– বেশ, আমার উপরেই যখন ভার দিচ্ছেন তখন কয়েকটা প্রশ্ন করছি, উত্তর দিন দেখি।
সুন্দরবাবু বললেন–বেশ, বলো।
জয়ন্ত প্রশ্ন করলে–প্রথম কথা, পেছন থেকে যখন ছোরা মারা হয়েছে বলছেন, তখন এটা নিশ্চয়ই খুনের কেস? কিন্তু এ ছাড়া আর কি কোনও সুত্রই আশেপাশে দেখেননি?
সুন্দরবাবু বললেন, একটা কথা ভুলে গিয়েছিলাম। একটা চিহ্ন পাওয়া গেছে। সেটা আর কিছুই নয়, দালানের গায়ে একটা রক্তাক্ত পাঞ্জার ছাপ। পুরোনো পাপীদের হাতের যে ছাপ লালবাজারে আছে তার সাথে মিলিয়ে দেখা গেছে যে এ কোনও পুরোনো পাপীই নয়। এটাই এই খুনির প্রথম খুন, এবং দালানের গায়ে হাতের ছাপ দিয়েই সে তার বিজয়-বার্তা ঘোষণা করে গেছে।
জয়ন্ত একটু চিন্তা করে বললে–আমার মনে হয় কেউ হয়তো লোকটির ওপরে পুরোনো কোনও প্রতিহিংসা পোষণ করত! তাই এভাবে হত্যা করে দালানের গায়ে রক্তাক্ত হাতের ছাপ রেখে সে যে সেটাই চরিতার্থ করল তা প্রমাণ করতে চায়।
তারপর একটু থেমে বলল–কোনও হাতের ছাপ পেয়েছেন দালানের গায়ে?
সুন্দরবাবু বললেন–বাঁ-হাতের।
জয়ন্ত প্রশ্ন করল–আচ্ছা, পেছন থেকে ছোরা মারা হয়েছে কোনদিকে? নিহত লোকটির পিঠের বাঁ-পাশে না ডান পাশে?
সুন্দরবাবু একটু চিন্তা করে বললেন–ছোরা মারা হয়েছে লোকটির বাঁ-পাঁজরে।
জয়ন্ত বলল, লোকটি বাঁ-হাতের সাহায্যেই ছোরা মেরেছে দেখছি, সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে, খুনি বাঁ-হাত ব্যবহার করে বেশি। অর্থাৎ খুনি লেফট হ্যানডেড…
তারপর একটু থেমে প্রশ্ন করল–আচ্ছা, ছোরার আঘাত ছাড়া আর কোনও আঘাত দেখতে পেয়েছেন কি?
সুন্দরবাবু বললেন–না, একটি ছোরার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছে।
জয়ন্ত প্রশ্ন করল–আচ্ছা, নিহত লোকটির শরীর কি বেশ হৃষ্টপুষ্ট?
সুন্দরবাবু বললেন হ্যাঁ নিহত লোকটির দেহে যে যথেষ্ট শক্তি ছিল তা তাকে দেখলেই বুঝতে পারা যায়।
জয়ন্ত বললে–বেশ, তাহলে এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, এমন একজন শক্তিশালী লোককে যে একটি মাত্র ছোরার আঘাতেই খুন করতে পারে তার নিজের দেহেও শক্তি কম নেই। অর্থাৎ সংক্ষেপে খুনি যথেষ্ট শক্তিশালী। কী বলেন?
সুন্দরবাবু বললেন হ্যাঁ, তা বটে!
জয়ন্ত প্রশ্ন করল–আচ্ছা, মেঝে থেকে রক্তমাখা হাতের ছাপ কতটা ওপরে তা কি বলতে পারেন?
সুন্দরবাবু বললেন না, তা মেপে দেখিনি। কিন্তু ছাপের উচ্চতার কী প্রয়োজন?
