একটা চাকতি তুলে নিয়েই দেখি, মোহর। অনেক কালের পুরোনো মোহর খুব সম্ভব। দু-হাজার বছর আগেকার।
পঞ্চম সারের প্রথম ও দ্বিতীয় ঘড়াও মোহরে মোহরে পরিপূর্ণ। মুক্তোর স্রোত! কোনও মুক্তোই ছোট নয়, অনেক মুক্তোই পায়রার ডিমের মতন বড়! মেঝের ওপরে মুক্তোর স্তূপ। এত মুক্তো জীবনে এক জায়গায় দেখিনি!
চতুর্থ বা শেষ কলশ মেঝের ওপরে সৃষ্টি করলে রত্নের সুপ! তার মধ্যে না আছে কি হিরে, চুনি, পোখরাজ, পদ্মরাগ মণি কত আর নাম করব? টর্চের আলোতে সেইসব অপূর্ব রত্ন জুলজুল করে জুলতে লাগল!
বিস্ময়-বিস্ফারিত নেত্রে আত্মহারার মতন দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ বাঘা চাপা গলায় গর্জন করে উঠল।
পরমুহূর্তে শুনলুম কাদের কণ্ঠস্বর ও পদশব্দ! কারা যেন খটখট করে সিঁড়ি দিয়ে নামছে।
কে ওরা? আবার ছুন-ছিউর দল নাকি?
কিন্তু ভাববারও সময় নেই–আমরা নিরস্ত্র!
বললুম, শিগগির ঘরের ওদিকে চল! ওই বড়-বড় সিন্দুকের পিছনে!
সিন্দুকের আড়ালে হুমড়ি খেয়ে আমরা মাটির সঙ্গে প্রায় মিশিয়ে রইলুম। সমস্ত ঘর আলোর আলোর উজ্জ্বল হয়ে উঠল! তা মশাল কিংবা লণ্ঠনের আলো, উঁকি মেরে দেখবার ভরসা হল না।
পায়ের শব্দ শুনে বুঝলুম, ঘরের ভেতরে ঢুকল সাত-আট জন লোক!
একজন ভাঙা-ভাঙা হিন্দি ভাষায় বললে, বামুক, তুমি ঠিক বলেছ! গুহার দরজা যখন খোলা, তখন সেই হতভাগা বাঙালিরা বেঁচে আছে–হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বেঁচে আছে! আশ্চর্য!
ছুন-ছিউ সাহেব, আমার চোখ ভুল দেখে না! আমি দূর থেকে চকিতের মতন দেখেছি, একটা পাহাড়ের আড়ালে তারা মিলিয়ে গেল!
কিন্তু বদমাইশগুলো গেল কোথায়? আমাদের সাড়া পেয়ে কোথায় তারা গা-ঢাকা দিলে? গুহার ভেতরটা ভালো করে খুঁজে দ্যাখ!
দুই-তিনজনের পায়ের শব্দ আমাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগল! বুঝলুম, আর রক্ষে নেই! স্থির করলুম শুধু হাতেই লড়তে লড়তে মরব–আত্মসমর্পণ করব না কিছুতেই!
হঠাৎ বামুর্কই বোধহয় বললে, ছুন-ছিউ সাহেব! দ্যাখো, দ্যাখো, ওদিকে জ্বলে-জুলে উঠছে কী ওগুলো?
যেদিকে কলশগুলো ছিল সকলে সেই দিকেই দ্রুতপদে ছুটে গেল–তারপরই বিস্ময়পূর্ণ চিৎকার!
বামুক চেঁচিয়ে উঠল, আল্লা, আল্লা! এ যে হিরে, মুক্তো, পান্না!
তারপরেই গুহায় নামবার সিঁড়ির ওপরে শোনা গেল আবার অনেক লোকের পায়ের শব্দ! নিশ্চয় গুহার ভেতরে আনন্দ কলরব শুনে শত্রুদের দলের আরও অনেক লোক নীচে নেমে আসছে! আমাদের বাঁচবার আর কোনও উপায়ই নেই!
নতুন পায়ের শব্দগুলো এল ঘরের ভেতরে! পর মুহূর্তে ছুন-ছিউয়ের ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বরে জাগল ভীষণ গর্জন এবং তারপরেই বন্দুকের-পর-বন্দুকের কানফাটা আওয়াজে সেই বদ্ধ গুহাগৃহের ভেতরটা হয়ে উঠল ভয়াবহ! সঙ্গে-সঙ্গে নানা কণ্ঠের অভিশাপ ও আর্তনাদ, ধুপ ধাপ করে দেহপতনের শব্দ! মনে হল কারা যেন কাদের সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধও করছে!
এ আবার কী কাণ্ড? কারা লড়ছে কাদের সঙ্গে? গুপ্তধনের লোভে শত্রুরা কি নিজেদের মধ্যেই মারামারি হানাহানি লাগিয়ে দিয়েছে? দেখবার জন্যে মনের ভেতরে জাগল বিষম কৌতূহল, কিন্তু মুখ বাড়াতে গিয়ে যদি শেষটা ধরা পড়ে যাই, সেই ভয়ে দমন করলুম সমস্ত কৌতূহল!
মিনিট পাঁচেক ধরে চলল এমনি হুলুস্থুল কাণ্ড! তারপর বন্দুকের চিৎকার থামল কেবল একাধিক কণ্ঠের আর্তনাদে সারা ঘরটা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
কাফ্রি ভাষায় কে একজন বললে, কই, বাবুরা তো এখানে নেই! মাল্কানও নেই!
সিন্দুকের পিছন থেকে একলাফে দাঁড়িয়ে উঠে মাল্কান আনন্দ-বিহ্বল স্বরে বললে, বাঁচিক! কারুক! গরক! তোমরা?
আরে, আরে, এই যে মাল্কান। বাবুরা কোথায়?
মাল্কান আমাদের ডেকে বললে, বাবুসাহেব, বাবুসাহেব! আর ভয় নেই! আমাদের বন্ধুরা এসেছে!
সবিস্ময়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাঁচিকদের মশালের আলোকে এমন এক বিষম রক্তরাঙা দৃশ্য দেখলুম যে, আমাদের কারুর মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরুল না!
সিঁড়ির দিকে ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বাঁচিক, কারুক ও গরক এবং তাদের আরও বিশ-বাইশজন সঙ্গী–অনেকেরই হাতে রয়েছে বন্দুক। ঘরের মেঝের ওপরে এখানে ওখানে পড়ে রয়েছে অনেকগুলো মানুষের দেহ–তাদের কেউ একেবারে নিস্পন্দ এবং কেউ বা করছে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট! ভূপতিত দেহের সংখ্যা এগারো–তার মধ্যে ছুন-ছিউর দলের লোক ছিল সাতজন! সমস্ত দেহের চারিপাশ দিয়ে বইছে যেন রক্তের নদী–সে রক্ত-বিভীষিকা দেখে শিউরে উঠে কমল দুই হাতে চোখ ঢেকে অবশ হয়ে আবার বসে পড়ল।
আমি জিজ্ঞাসা করল, বাঁচিক, তোমরা কী করে এখানে এলে?
বাঁচিক সেলাম করে বললে, গুমলি-বিবির হুকুমে বাবুসাহেব?
তার মানে?
গুমলি-বিবি হুকুম দিয়েছে, যেমন করে হোক শয়তানদের হাত থেকে বাবুসাহেবদের উদ্ধার করবার জন্যে। আপনারা কোন পথে কোথায় আসবেন জানতুম, তাই প্রস্তুত হয়েই দলবল নিয়ে এইদিকে ছুটে এসেছি!
তখন আমার মনে পড়ল, আমরা যখন বিদায় নিই, গুমলি বলেছিল আপনারা আমার অতিথি, কিন্তু আপনাদের শত্রুকে আমন্ত্রণ করে আনলুম আমিই। কিন্তু সর্বদাই মনে রাখবেন বাবুজি, গুমলির দৃষ্টি রইল আপনাদেরই ওপরে!
গুমলি নিজের কথা রেখেছে। নইলে আমাদের মৃত দেহগুলো সকলের অজান্তে এই অন্ধকার গুপ্তগুহার মধ্যেই মাংসহীন কঙ্কালে পরিণত হত। গুমলির উদ্দেশে করলুম মনে-মনে নমস্কার। মহিয়সী নারী!
