কমল বললে, সেটা যদি সহজে আবিষ্কার করা যেত, তাহলে তার নাম গুপ্তগুহা হত না।
কমল ঠিক বলেছে কিন্তু কুবের মূর্তি যখন পেয়েছি, তখন ধুকধুকির লিখনকে আর অবিশ্বাস করা চলে না। নবজাগ্রত উৎসাহে আমরা সকলে দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে গুহার সন্ধান করতে লাগলুম। জঙ্গল ভেঙে আনাচেকানাচে অনেক খোঁজাখুঁজি করলুম, কিন্তু গুহার কোনও অস্তিত্বই আবিষ্কার করতে পারলুম না।
সকলে আবার নিরাশ মনে ভাঙা কুবের-মূর্তির পাশে এসে দাঁড়ালুম। ঘাটে এসে নৌকা ডুবল বোধহয়।
কুমার বললে, উপত্যকার শেষে ওই যে পাহাড় রয়েছে, ওখানে গিয়ে একবার গুহার খোঁজ করে দেখব নাকি?
বিনয়বাবু বললেন, আমার বিশ্বাস, গুহা যদি থাকে, এই কুবের-মূর্তির কাছেই আছে। মন্দিরের সম্পত্তি মন্দিরের বাইরে থাকবে কেন?
যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু বেদির ওপরে এই তো রয়েছে কুবের-মূর্তি, তার আশপাশের অনেকখানি পর্যন্ত সমস্তটাই পাথর দিয়ে বাঁধানো কারণ এটা হচ্ছে বিলুপ্ত মন্দিরের মেঝে। এখানে গুহা থাকবে কোথায়? খানিকক্ষণ ভেবেও কোন হদিস পাওয়া গেল না।
কুমার হঠাৎ কৌতুকচ্ছলে কুবেরের পা টেনে ধরে বললে, হে কুবের, হে দেবতা! আমরা হচ্ছি টাকার–অর্থাৎ তোমার পরম ভক্ত! কোথায় তোমার ঐশ্বর্য লুকিয়ে রেখেছ প্রভু, দেখিয়ে দাও–দেখিয়ে দাও!
হঠাৎ আমার মনে হল, কুবের-মূর্তি যেন নড়ে উঠে ডানদিকে একটু সরে গেল!
তাড়াতাড়ি মূর্তির পায়ের তলায় হেঁট হয়ে পড়ে দেখি, ধূলি-ধূসরিত বেদির ওপরে আধ ইঞ্চি চওড়া একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখা! মুর্তিটা যে একটু সরে গেছে, আর তার নীচেকার পরিষ্কার অংশটুকু বেরিয়ে পড়েছে, সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই।
আমি বললুম, কুমার, কমল, রামহরি! এসো, আমরা সবাই মিলে মূর্তিটাকে বাঁ-দিক থেকে ঠেলা দি! আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই মূর্তির ভেতরে কোনও রহস্য আছে।
সকলে মিলে যেমন ঠেলা দেওয়া, ভাঙা মুর্তিটা হড়হড় করে প্রায় হাত-দুয়েক সরে গিয়ে আবার অটল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
অবাক বিস্ময়ে দেখলুম, মূর্তির তলদেশেই আত্মপ্রকাশ করেছে একটি চতুষ্কোণ গর্ত এবং তার ভেতরে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে একার সংকীর্ণ সিঁড়ি! এই তাহলে গুপ্তগুহাঃ।
কুমার আনন্দে মেতে বলে উঠল, আজ দেখছি আমাদের ওপরে সব দেবতারই অসীম দয়া! রামহরির কৃষ্ণ আমাদের প্রাণ বাঁচালেন, আর পাথরের কুবের আমাদের সামনে খুলে দিলেন তার রত্নভাণ্ডারের গুপ্তদ্বার! এখন দেখা যাক, ভাণ্ডার পূর্ণ কি না!–বলেই সে গর্তের ভেতরে পা বাড়িয়ে দিলে।
রামহরি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললে, ওগো কুমার বাবু, কোথা যাও? এখানে যকের ভয় আছে, সে-কথা কি ভুলে গেছ?
আমি বললুম, থামো রামহরি, বাজে বোকো না! প্রায় দু-হাজার বছর ধরে বেঁচে আছে, এমন ভূতের গল্প কোনওদিন শুনিনি। বেঁচে থাকলেও সে এত বুড়ো হয়ে গেছে যে, আমাদের দুটো ঘুসিও সইতে পারবে না! চল সবাই গুহার মধ্যে!
.
পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ । গুপ্তধন
সিঁড়ির পরেই মাটির তলায় মস্ত একটি ঘর–তার চারিদিকে পাথরের দেওয়াল। সে ঘরে অন্তত দুশো লোকের স্থান সংকুলান হতে পারে।
আমাদের সমস্ত মোটঘাট চুলের দোরে পাঠিয়েছে ধসে যাওয়া পাহাড় এবং আমাদের সঙ্গে যা-কিছু ছিল সমস্ত কেড়েকুড়ে নিয়েছে ছুন-ছিউর দলবল। কেবল কমলের কাছে ছিল ছোট্ট একটি পকেট-টর্চ, নদীর জলও তার শক্তি ক্ষয় করতে পারেনি।
সেইটেই চারদিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিরেট অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে দেখলুম, সেই প্রশস্ত গুহা-গৃহের একদিকে রয়েছে তিনটে বড়-বড় পাথরের সিন্দুক–পুরাকালের এইরকম সিন্দুক আমি কোনও-কোনও জাদুঘরে দেখেছি। প্রত্যেক সিন্দুক প্রায় দুহাত করে উঁচু ও চওড়া এবং পাঁচহাত করে লম্বা। তার এক-একটার মধ্যে অনায়াসেই একজন লম্বা-চওড়া মানুষ শুয়ে থাকতে পারে।
রামহরি প্রথমটা ভূতের ভয়ে জড়সড় হয়েছিল। এখন সিন্দুক দেখে সমস্ত ভয় ভুলে তাড়াতাড়ি একটার ডালা তুলে ফেললে! অন্য দুটোর ডালা তুললে কুমার ও কমল।
তিনটে সিন্দুকের ভেতরেই পাওয়া গেল কেবল ছোট-বড়-মাঝারি থালা ও অন্যান্য পাত্র।
বিনয়বাবু দু-চারখানা থালা পরীক্ষা করে বললেন, অনেক কালের জিনিস, বিবর্ণ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে এগুলো সোনার বাসন। নইলে এত সাবধানে গুপ্ত-গুহায় লুকিয়ে রাখা হত না।
কমল চমকৃত স্বরে বললে, এত সোনার বাসনকোশন! না জানি এর দাম কত হবে?
বিনয়বাবু বললেন, অনেক। কেবল এইগুলো বেচলেই আমরা লক্ষপতি হতে পারি। কিন্তু কেবল সোনার বাসন কেন কমল, পরিব্রাজক হুয়েন সাংয়ের কথা যদি সত্যি হয়, তাহলে এখানে আরও অনেক ধনরত্ন আছে!
বিনয়বাবুর কথা শুনতে-শুনতে আমি টর্চের আলোটা ঘুরিয়ে অন্যদিকে ফেলতেই দেখি, ঘরের আর-এক কোণে সাজানো রয়েছে সারে-সারে বড়-বড় ঘড়া!
সবাই ছুটে সেইদিকে গেলুম। গুনে দেখলুম, প্রত্যেক সারে রয়েছে চারটে করে ঘড়া– এমনি পাঁচ সারে মোট কুড়িটা ঘড়া!
ব্যগ্র হস্তে সবাই ঘড়াগুলো তুলে পরীক্ষা করতে লাগলুম। প্রথম তিনসারে প্রত্যেক ঘড়াই খালি। চতুর্থ সারের দুটো ঘড়া খালি ও দুটো ঘড়া তুলেই বোঝা গেল, তাদের মধ্যে কিছু আছে–সে দুটো রীতিমতো ভারী!
আমি ও কুমার দুটো ঘড়াই তুলে মেঝের ওপরে উপুড় করে দিলুমঝনঝনঝনঝন রবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল রাশি-রাশি গোল-গোল চাকতি!
