বাঘা তখন গলা পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে গরর গরর রবে গর্জন শুরু করলে!
আমাদের দিকে তাকিয়ে বাঘা এতটা চটে উঠল কেন?
পরমুহূর্তেই এ-প্রশ্নের উত্তর পেলুম!
হঠাৎ বাঘা আক্রমণ করলে আমাদের বাঁধন-দড়িকে! এই দড়ির ওপরেই তার রাগ হয়েছে, সে বুঝতে পেরেছে এই দড়ির বাঁধনই হচ্ছে যত অনিষ্টের মূল!
কুমার তাকে উৎসাহ দিয়ে বারংবার বলতে লাগল, আমার সোনার বাঘা! আমার বন্ধু বাঘা! বাহাদুর বাঘা! কেটে দাও তো দড়িগুলো–চটপট কেটে দাও তো ভাই!
উৎসাহ পেয়ে বাঘার আনন্দ আর ধরে না, জয়পতাকার মতন তার লাঙ্গুল জলের ওপর তুলে সে নাড়তে লাগল ঘনঘন।
.
স্বাধীন, আমরা স্বাধীন! বাঘার দৌলতে আমরা জলে ডুবে মরিনি, বাঘার অনুগ্রহে ঘুচল আমাদের বন্ধন দশা!
এতক্ষণ মাল্কান একটিমাত্র কথা কয়নি, সে হঠাৎ এখন উচ্ছ্বসিত হয়ে দুই হাত বাড়িয়ে বাঘাকে বুকের ভেতরে জড়িয়ে ধরে অরুদ্ধ স্বরে বললে, বন্ধু, আমার জীবন রক্ষক বন্ধু!
রামহরি আহ্লাদে নাচতে নাচতে বললে, দেখছ কমলবাবু, কৃষ্ণ বাঁধন খুলে দিলেন কি না? বাঘা সেই কৃষ্ণেরই জীব!
কুমার বললে, ভগবান যা করেন ভালোর জন্যে! দ্যাখো বিমল, ছুন-ছিউ চেয়েছিল আমাদের পাতালে পাঠাতে, কিন্তু আমরা এসে উঠেছি নদীর এপারে! আর সাঁকোর দরকার হল না!
আমি বললুম, মাল্কান, আমরা শা-লোকা মঠের কাছে এসে পড়েছি নয়?
হ্যাঁ বাবুসাহেব, খুব কাছে।
তাহলে আর দেরি নয়! ছুন-ছিউ নদীর ওপারে সদলবলে সদর্পে বিচরণ করুক, ইতিমধ্যে আমরা করব কার্যোদ্ধার!
.
চতুর্দশ পরিচ্ছেদ । গুপ্তগুহা
ইতিহাস-বিখ্যাত কপিশ পাহাড়ের উপত্যকায় এসে দাঁড়িয়েছি আমাদের পথের শেষে।
ধ্বংসস্তূপের পর ধ্বংসস্তূপ! প্রাচীন মঠের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়েছে–এমন একখানা ভাঙাচোরা ঘরও নেই, যার ভেতরে মাথা গোঁজা যায়। সম্রাট কণিষ্ক এখানে যেসব স্থাপত্য ও ভাস্কর্য কীর্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন, আজ তার কোনও সৌন্দর্য উপভোগ করবার উপায় নেই। অতীতের ঐশ্বর্য অতীতের আড়ালেই গা-ঢাকা দিয়েছে।
মঠের ধ্বংসাবশেষের ভেতরে অনেক খোঁজাখুঁজি করলুম, কিন্তু অষ্টদন্ত তিনপদ কুবের মূর্তির কোনও সন্ধানই পাওয়া গেল না।
বিনয়বাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, আমি তো আগেই একথা বলেছিলুম! দ্বিতীয় শতাব্দীর কণিষ্ক আর বিংশ শতাব্দীর আমরা! এর মধ্যে কত যুগ যুগান্তর চলে গিয়েছে– কত দস্যু, কত লোভী এখানে এসেছে, গুপ্তধনের এক কণাও আর পাওয়া যাবে না!
আমার মন মুষড়ে পড়ল। তাহলে এতদিন ধরে আমরা দেখছিলুম আলেয়ার স্বপ্ন? আমাদের এত আগ্রহ, এত চেষ্টাশ্রম, এত বিপদভোগ, সবই হল ব্যর্থ?
মাল্কান বললে, বাবুসাহেব, এখান থেকে প্রায় এক মাইল দূরে আর একটা ছোট ধ্বংসস্তূপ আছে। তার ভেতরে একটা ভাঙা মূর্তিও দেখেছিলুম বলে মনে হচ্ছে।
কিছুমাত্র উৎসাহিত না হয়েই বললুম, যখন এতদূর এসেছি তখন সেখানেও না হয় যাচ্ছি, কিন্তু আর কোনও আশা আছে বলে মনে হয় না।
কুমার ও কমল প্রভৃতি একেবারে গুম মেরে গেল। মাল্কানের পিছনে-পিছনে আবার আমরা এগিয়ে চললুম বটে, কিন্তু সে যেন নিতান্ত জীবন্মাতের মতোই।…
মিনিট পনেরো পরে আমরা উপত্যকার শেষ প্রান্তে একটা জঙ্গলভরা জায়গায় এসে দাঁড়ালুম। সেখানেও প্রায় আশি ফুট জায়গা জুড়ে একটা ধ্বংসস্তূপ পাওয়া গেল।
পরীক্ষা করে বুঝলুম, একসময়ে সেখানে একটা মাঝারি আকারের মন্দির ছিল–এখন কোথাও পড়ে আছে রাশিকৃত পাথর, কোথাও বা খোদাই করা থামের টুকরো এবং কোথাও বা ভাঙাচোরা মূর্তির অঙ্গপ্রতঙ্গ।
চারিদিক তন্নতন্ন করে খুঁজলুম। ধুকধুকির ওপরকার লেখাটা বারবার স্মরণ করতে লাগলুম –শা-লো-কাঃ পশ্চিম দিক ভাঙা মঠ ও কুবের মূর্তি ও গুপ্তগুহা।
আমরা আগে যে ধ্বংসস্তূপে গিয়েছিলুম হয়তো সেইখানেই ছিল প্রাচীন শা-লোকা মঠ। তারপর আমরা পশ্চিম দিকেই এসেছি বটে এবং এখানেও পেয়েছি একটা মঠ বা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু কোথায় কুবের-মূর্তি?
কুমার বললে, হয়তো আগে এখানে কুবের-মূর্তি ছিল। এখন সেটা ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেছে। কিন্তু গুপ্তগুহাটাই বা কোথায়?
এমন সময় বিনয়বাবু সাগ্রহে আমাদের নাম ধরে ডাক দিলেন তিনি তখন এক জায়গায় হাঁটু গেড়ে বসে কি পরীক্ষা করছিলেন।
বিনয়বাবুর কাছে গিয়ে দেখলুম, সেখানে কোমর পর্যন্ত ভাঙা একটা মূর্তি রয়েছে, দেখলেই বোঝা যায় অটুট অবস্থায় তার উচ্চতা ছিল অন্তত বারো ফুট। মূর্তির একখানা পা-ভাঙা, তার তলায় রয়েছে একটা হাতখানেক উঁচু লম্বাটে বেদি।
বিনয়বাবু বেদির ওপরে অঙ্গুলিনির্দেশ করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
প্রথমটা কিছুই বুঝতে পারলুম না। তারপরই লক্ষ করলুম, বেদির ওপরে মূর্তির অটুট পায়ের পাশেই রয়েছে পরে পরে আরও দুখানা পায়ের চিহ্ন! পা দুখানা অদৃশ্য হয়েছে বটে কিন্তু পায়ের ছাপ এখনও বর্তমান!
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, এই তোমাদের কুবের মূর্তি! কুশ্রী কুবেরের অষ্টদন্ত মুখ আর প্রকাণ্ড ভুঁড়ি মহাকালের প্রহারে নষ্ট হয়ে গেছে, প্রথম দৃষ্টিতে একখানার বেশি পদও নজরে পড়ে না বটে, কিন্তু পাথরের ওপরে অন্য দুখানা পদের কিছু কিছু চিহ্ন আজও লুপ্ত হয়ে যায়নি। হ্যাঁ, এই তোমাদের কুবের মূর্তি! বোঝা যাচ্ছে, ধুকধুকিতে মিছে কথা লেখা নেই। কিন্তু গুপ্তগুহা কোথায়?
