আমি বললুম, আমি সত্য কথাই বলছি।
সত্যকথা? তুমি কি বলতে চাও, লকেট তোমার কাছে ছিল না?
নিশ্চয়ই ছিল!
তবে?
লকেট এখন আমার কাছে নেই।
মানে?
মানে আমি জানি না।
এই তোমার শেষ কথা?
হুঁ।
বেশ। তাহলে আমরাও আমাদের শেষ কাজ করি। ওদের জলে ফেলে দাও।
তারা সকলে মিলে আমাদের শূন্যে তুলে ধরলে।
রামহরি চেঁচিয়ে বললে, হে বাবা বিশ্বনাথ, চরণে ঠাই দিও!
পরমুহূর্তে আমরা ঝপাং করে পড়লুম নদীর গর্ভে এবং সঙ্গে-সঙ্গে তলিয়ে গেলুম পাতালের শীতল অন্ধকারে।
.
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ । আমাদের বাঘা
পাতালের দিকে তলিয়ে গেলুম, এবং তারপর আবার ভেসে উঠলুম।–কেবল আমি নই, আমার সঙ্গে যারা বাঁধা ছিল তারাও ভেসে উঠল আমার সঙ্গেই। আমাদের এক যাত্রায় পৃথক ফল হওয়ার উপায় নেই।
আচ্ছন্নের মতো শুনতে পেলুম কল-কল-কলকল করে গভীর জলগর্জন! কী তীব্র স্রোত গতি তার প্রায় বন্যার মতো! জল টলমল করে হেলছে দুলছে, পুঞ্জ পুঞ্জ ফেনার ফুল ফুটিয়ে ওপরে উঠছে, নীচে নামছে, ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে ফিরছে এবং শত সহস্র বল্লমের ফলকের মতন চকচকিয়ে ছুটে যাচ্ছে হু-হু করে। সেই নিম্নমুখী গিরিনদীর গতি অত্যন্ত দ্রুত বলে আমরা তৎক্ষণাৎ আবার ডুবে গেলুম না টানের মুখে ভেসে চললুম খানিক দূর। এজন্যে বিস্মিত হলাম না। অত বেগবতী নদী যে পাথরকে খানিক দূর ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, এ কথা সকলেই জানে।
তারপর আবার আমরা ডুবে গেলুম এবং জলের তলায় নিশ্বাস যখন বন্ধ হয়ে এসেছে, নদী আবার আমাদের ওপরে ভাসিয়ে তুলল।
এবার ভেসে উঠেই দেখি, ঠিক আমাদের পাশেই সাঁতার কাটছে বাঘা! এতক্ষণ ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে তার কথা ভুলে গিয়েছিলুম। তুচ্ছ কুকুর ভেবে শত্রুরা হয় তাকে কিছু বলেনি, নয় সে নিরাপদ ব্যবধানে সরে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষা করেছে। এখন প্রভুভক্ত বাঘা এসেছে আমাদের মৃত্যুযাত্রার সাক্ষী হতে এবং আমাদের সঙ্গেই মরতে।
যেকয় মুহূর্ত ভেসে থাকি, এর মধ্যেই সুন্দরী পৃথিবীকে ভালো করে শেষবার দেখে নিই! সূর্যের ওপরে ওই সেই নীলাকাশের চন্দ্রাতপ, তীরে-তীরে ওই সেই পাখি-ডাকা সবুজ বনভূমি, দূরে কাছে ওই সেই গিরিরাজ হিমালয়ের স্তম্ভিত শৈল-তরঙ্গ! ভালো করে আরও কিছু দেখতে না দেখতেই আবার ডুবে গেলুম-কিন্তু আবার ভেসে উঠলুম পর মুহূর্তেই। এবার মনে হল, কে যেন আমাদের টেনে তুললে।
সবিস্ময়ে তাকিয়ে দেখি, বাঘা প্রাণপণে আমাদের বাঁধন-দড়ি কামড়ে ধরেছে!
বাঘা আর দড়ি ছাড়লে –আমরাও আর ডুবলুম না।
আমাদের পাঁচজনকে টেনে তোলবার শক্তি নিশ্চয়ই বাঘার নেই। কিন্তু প্রথমত জলে গুরুভারও হয় লঘুভার এবং দ্বিতীয়ত, এই খরস্রোতা নদীর তীব্র টান আমাদের ভাসিয়ে রাখবার পক্ষে সাহায্য করলে যথেষ্টই।
বাঁধন-দড়ি কামড়ে ধরে বাঘা নদীর তীরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে। কিন্তু স্রোতের টানে তার চেষ্টা সফল হল না। তবে সে কোনক্রমে জলের ওপরে আমাদের ভাসিয়ে রাখলে। ধন্যবাদ, বাঘাকে ধন্যবাদ!
এতক্ষণ পরে কুমার কথা কইলে। বললে, বিমল, বাঘা আজ যা করলে, অন্য কোনও কুকুর তা করতে পারত না। কিন্তু এভাবে বাঘা আর কতক্ষণ আমাদের ভাসিয়ে রাখবে? বাঘা জলচর জীব নয়, আর একটু পরেই সে দুর্বল হয়ে পড়বে। তখন যে মরণ ছাড়া আমাদের আর কোনও গতি নেই?
আমিও সেই কথাই ভাবছি কুমার।
বিনয়বাবু বললেন, শত্রুরা কি এখন আমাদের দেখতে পাচ্ছে না?
আমি বললুম, তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক দূরে এসে পড়েছি।
কমল উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, দ্যাখো বিমলদা! বাঘার চেষ্টা একেবারে ব্যর্থ হয়নি। সে একটু একটু করে আমাদের তীরের খানিকটা কাছে এনে ফেলেছে!
কমলের উৎসাহ দেখে এত দুঃখেও আমার হাসি এল। আমাদের এই অবস্থায় তীরের খানিকটা কাছে আসা আর তীরে গিয়ে ওঠার মধ্যে আকাশপাতাল তফাত!
এমন সময়ে এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটল। নদীর গতি হঠাৎ অত্যন্ত বেড়ে উঠল–বোধহয় এখন আমরা যেখান দিয়ে যাচ্ছি নদীর তলাকার জমি সেখানে খুব বেশি ঢালু। যেদিকে চলেছি সেই দিকেই ছিল আমার মাথা, তাই ওদিককার কিছুই এতক্ষণ দেখতে পাচ্ছিলুম না। আচম্বিতে ঘূর্ণায়মান স্রোতের টানে আমাদের একসঙ্গে বাঁধা দেহগুলো উলটে ঘুরে গেল–প্রচণ্ড বেগে খানিকদূর ভেসে গিয়েই দেখি, তীর একেবারে আমাদের খুব কাছে সরে এসেছে!
বিনয়বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, আমরা নদীর বাঁকে এসে পড়েছি–আমরা নদীর বাঁকে এসে পড়েছি!
সঙ্গে-সঙ্গে আমরা পেলুম এক বিষম আঘাত! অন্য সময় হলে সে আঘাতে রীতিমতো অভিভূত হয়ে পড়তুম, কিন্তু এখন আমরা অভিভূত হওয়ারও অবকাশ পেলুম না কারণ আমাদের দেহের ওপরে লাগল কঠিন পাথুরে মাটির স্পর্শ। এ স্পর্শ যত কঠিনই হোক– এটা যে স্নেহময়ী পৃথিবীর মাটির ছোঁয়া, এই আশ্চর্য অনুভূতিই আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে দিলে উন্মত্ত আনন্দে।
আমরা ঠেকে গিয়েছি নদীর বাঁকে! কেবল তাই নয়, বাঁকের মুখে ছিল কী একটা জলজ লতাপাতার ঘন জাল, দেহগুলোকে সে যেন জীবন্তেরই মতন জড়িয়ে ধরলে! স্রোত আর আমাদের টেনে নিয়ে যেতে পারবে না।
রামহরি বলে উঠল, জয় বাবা বিশ্বনাথ! একেই বলে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে?
কমল বললে, হায় রামহরি, তোমার কৃষ্ণ আমাদের রাখলেন বটে, কিন্তু বাঁধনগুলো খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন না কেন?
