এই গল্পের গোড়ার দিকটা যতই ভয়াবহ হোক, এর শেষদিকটা হয়তো অনেকেরই কাছে প্রহসনের মতন হাসির খোরাক জোগাবে। অনেকেই হয়তো একে প্রহসনের মতোই হালকা ভাবে নেবেন। কিন্তু মানুষের এই জীবনটাই হচ্ছে প্রহসনের মতন! একজনের হাসি আর একজনের কাছে মৃত্যুর মতন সাংঘাতিক! গল্পের শেষ ঘটনাগুলি পড়ে পাঠকরা যখন হাসবেন, তখন তারা হয়তো মনেও করতে পারবেন না যে, ঘটনার সময়ে আমার মনের মধ্যে হাস্যরসের একটা ফোঁটাও বর্তমান ছিল না!
আমার এই কাহিনির নাম দেওয়া যেতে পারে–দুঃস্বপ্নের ইতিহাস! মানুষ স্বপ্নে যেসব ভয়ঙ্কর ও অলৌকিক দৃশ্য দেখবার সময়ে অত্যন্ত ভয় পায়, জেগে উঠে তার কথা মনে করে হাসি আসে! আমারও অবস্থা এখন অনেকটা সেইরকম! কেবল দুর্ভাগ্যের কথা এই যে, আমি যা দেখেছি তার কথা ভেবে অনেককাল ধরে হাসবার মতন পরমায়ু আমার নেই।
কোনওরকমে পাহাড়ের এই গুহার ভিতরে আশ্রয় নিয়ে আমার এই দুঃস্বপ্নের ইতিহাস লিখছি! আমি যে আর বেশিক্ষণ বাঁচব, এমন আশা রাখি না। তবু আমার ইতিহাস লিখে রেখে গেলুম এইজন্যে, কোনও না কোনও দিন হয়তো এটা অন্য মানুষের চোখে পড়বে।
কুলিরা কেউ আমার সঙ্গে আসতে রাজি হল না। সকলেরই মুখে এক কথা–জুজু পাহাড়ে মানুষ যায় না।
আমার রোখ বেড়ে উঠল। জুজু-পাহাড়ের ভিতরে কী রহস্য আছে, না জেনে এখান থেকে ফিরব না,–এই পণ করে কুলিদের পিছনে ফেলেই আমি একলা পাহাড়ের ওপরে উঠতে লাগলুম।
উঠছি, উঠছি, উঠছি! জুজু বলে কোনও কিছুর অস্তিত্ব দেখতে পেলুম না বটে, কিন্তু এই প্রকাণ্ড পাহাড়টা কী আশ্চর্যরকম নির্জন। কোথাও মানুষের একটা চিহ্নও নেই।
আরও খানিকটা ওপরে ওঠবার পর আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। এ পাহাড়ে মানুষের পদচিহ্ন পর্যন্ত নেই কেন এবং কোনও মানুষ এখানে আসে না কেন? সূর্যের সোনার আলোয় ঝলমলে এমন সুন্দর পাহাড়; এখানে ওখানে কৌতুকময়ী ঝরনা রুপোর ধারা কুলকুচো করতে করতে ও নীলাকাশকে নিজের গানের ভাষা শোনাতে-শোনাতে পাথর থেকে পাথরের ওপরে লাফিয়ে নাচতে নাচতে পৃথিবীর কোলের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বার জন্যে নীচে-আরও নীচে নেমে যাচ্ছে, ফলে-ফুলে রঙিন ও লতায় পাতায় সাজানো, নরম ঘাসের সবজে সাটিনে ঢাকা আনন্দময় উপত্যকা, এ তো কবির স্বর্গ, ভ্রমণকারীর তীর্থ! তবু মানুষ এই পাহাড়কে পরিত্যাগ করেছে কেন? এত বড় একটা চমৎকার পাহাড়, তবু কোথাও এর বর্ণনা শুনিনি কেন?
আর-একটা অদ্ভুত ভাবে আচ্ছন্ন হয়ে আমি ওপরে উঠছি। আশপাশ, আনাচকানাচ, বনজঙ্গলের আড়াল দিয়ে যেন আরও কারা সব নিঃশব্দ পদে আমার সঙ্গে সঙ্গেই ওপরে উঠছে! এখানে মানুষ নেই, অন্য কোনও জীবেরও সাড়া নেই, তবু যেন আমি একলা নই! কারা যেন অদৃশ্য হয়ে আমার সমস্ত গতিবিধি সতর্ক দৃষ্টিতে লক্ষ করছে! এদিকে তাকাই ওদিকে তাকাই, সামনে ফিরি পিছনে ফিরি–এমনকী হঠাৎ ঝোপেঝাপে গিয়েও উঁকি মারি, তবু জনপ্রাণীকেও দেখতে পাই না! তবু আসছে, আসছে,–অদৃশ্য আত্মারা আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছে আর আসছে আর আসছে! এই অদ্ভুত ভাবটাকে কোনওরকমেই মন থেকে মুছে ফেলতে পারলুম না! কী অসোয়াস্তি!
ঘণ্টা চারেক এগিয়ে যাবার পর হঠাৎ এক জায়গায় একটি ব্যাপার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
দু-ধারের পাহাড় কেটে কারা যেন একটা সরু রাস্তা তৈরি করেছে। রাস্তার মাঝে মাঝে শুকনো কাদা রয়েছে। তার ওপরে মানুষের পায়ের ছাপ আছে কি না দেখবার জন্যে অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলুম। মানুষের পায়ের একটিমাত্র ছাপও সেখানে নেই। তার বদলে কাদার ওপরে অনেকগুলো টানা টানা বিচিত্র চিহ্ন দেখলুম। মাটি যখন ভিজে ছিল, তখন এই পথ দিয়ে যেন অনেকগুলো পিপের মতন জিনিস কারা গড়িয়ে গড়িয়ে নিয়ে গেছে, তাদের পায়ের চিহ্নগুলো কোথায় গেল? অদ্ভুত রহস্য!
পরীক্ষা করতে করতে হঠাৎ আমার পা গেল ফসকে! যেখানে দাঁড়িয়েছিলুম, ঠিক তার পাশেই ছিল একটা গভীর খাদ। কোনওরকমেই নিজেকে সামলাতে না পেরে আমি সেই খাদের ভিতরে গিয়ে পড়লুম।
গড়াতে-গড়াতে পাতালের ভিতরে নেমে যাচ্ছি! দেহের ওপরে আঘাতের পর আঘাত! চারিদিক অন্ধকার যন্ত্রণায় চিৎকার করছি।
হঠাৎ পাথরের ওপরে মাথা ঠুকে অজ্ঞান হয়ে গেলুম!
.
ষষ্ঠ । ষোলো হাত লম্বা হাত
যখন আমার জ্ঞান হল, দেখলুম আমি একটা টেবিলের ওপরে শুয়ে আছি। পরে জেনেছিলুম সেটা হচ্ছে অপারেশন টেবিল–অর্থাৎ যাকে বলে রোগীকে অস্ত্র করবার টেবিল।
ভালো করে চেয়ে দেখি, আমি টেবিলের ওপরে শুয়ে নেই–টেবিলটাই আছে আমার পিঠের উপরে! কড়িকাঠ থেকে এক ঝোলানো টেবিলে পিঠ রেখে আমি ঘরের মেঝের দিকে মুখ করে আছি! আমার হাত-পা বাঁধা নেই, তবু আমি পড়ে যাচ্ছি না! যদিও পরে এই রহস্যেরও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা শুনেছিলুম কিন্তু তখন আমি অত্যন্ত আশ্চর্য ও আড়ষ্ট হয়ে ভাবতে লাগলুম, বোধহয় আমি দুঃস্বপ্ন দেখছি!
হঠাৎ চেয়ে দেখি, ঘরের মেঝেতে একটা পিপের ভিতর থেকে একখানা অদ্ভুত মুখ উঁকি মারছে! ছবিতে গোল চাঁদের ভিতরে চোখ নাক ঠোঁট এঁকে দিলে যে-রকম হয়, সেই মজার মুখখানা ঠিক সেইরকম দেখতে! তখন আমার দৃঢ় ধারণা হল যে, আমি স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই দেখছি না!
চাঁদমুখো লোকটা একটু হাসলে। বললে, এই যে, তোমার জ্ঞান হয়েছে দেখছি। অমল, তোমার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তুমি ভাবছ এসব স্বপ্ন,না?
