রামহরি বললে, খোকাবাবু, আমাদের মোটঘাটগুলোও রসাতলে গিয়েছে!
আমি বললুম, তাহলে উপায়? শত্রু নিপাতের পর বন্দুকের দরকার নেই বটে, কিন্তু রসদ না থাকলে পেট চলবে কেমন করে?
মাল্কান বললে, ভয় নেই বাবুসাহেব, আমাদের আর বেশিদূর যেতে হবে না। এই পাহাড়ের নীচেই আছে একটা নদী। তারপর নদী পার হয়ে ঘণ্টাখানেক পথ চললেই আমরা সেই মঠে গিয়ে হাজির হব।
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, নদীটা কত বড়?
চওড়া খুব বেশি নয় বটে, কিন্তু জল খুব গভীর। তবে আপনাদের ভাবনা নেই, নদীর ওপরে একটা কাঠের সাঁকো আছে।
বেশ, তাহলে আবার যাত্রা করা যাক এই বলে আমি অগ্রসর হলুম। সঙ্গীরাও আমার পিছনে-পিছনে চলল। পিছন থেকে মাঝে-মাঝে কমলের আঃ! উঃ! বলে আর্তনাদ কানে আসতে লাগল–বোধহয় তার আঘাতটা হয়েছে গুরুতর।
মিনিট পঁচিশ পরেই আমরা পাহাড়ের তলায় গিয়ে দাঁড়ালুম। সামনেই প্রভাত সূর্যকরে জ্বলন্ত সুদীর্ঘ এক বাঁকা তরোয়ালের মতন একটি বেগবতী নদী বয়ে যাচ্ছে কলনাদে উচ্ছ্বসিত হয়ে। চওড়ায় সে ষাট-সত্তর ফুটের বেশি হবে না, কিন্তু তার স্রোতের টান এমন বিষম যে দেখলেই মনে হয়, জল যেন টগবগ করে ফুটছে!
কুমার শুধোলে; মাল্কান, তুমি যে সাঁকোর কথা বললে সেটা কোথায়?
মাল্কান মাথা চুলকোতে-চুলকোতে বললে, সাঁকোটাতো এইখানেই ছিল।
এইখানেই ছিল তো গেল কোথায়? সাঁকোর তো আর পা নেই যে মর্নিংওয়াক করতে বেরুবে?
মাল্কান বললে, আমি আজ একবছর এদিকে আসিনি। গেল বর্ষায় জলের তোড়ে সাঁকোটা নিশ্চয় ভেসে গিয়েছে। এদেশে এমন ব্যাপার হামেশাই হয়।
আমি হতাশভাবে বললুম, তাহলে আমরা কী করব? এ নদীটা তো দেখছি দুই পাহাড়ের মাঝখানকার ঢালু জমি দিয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে, সাঁতার কেটে এর প্রখর স্রোত এড়িয়ে ওপারে যাওয়া সোজা নয়।
কমল বললে, সোজাই হোক আর কঠিনই হোক, আমার পক্ষে সাঁতার কাটা অসম্ভব। আমি ডানহাত নাড়তেই পারব না।
কুমার কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ পিছন থেকে ইংরেজি ভাষায় কর্কশস্বরে কে বললে, এখনি সবাই মাথার ওপরে হাত তোলো!
চমকে ফিরে দেখি ঠিক আমাদের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ছুন-ছিউ, আরও দুজন চিনেম্যান এবং চারজন কাফ্রি! ছুন-ছিউ ও তার চিনে সঙ্গীদের হাতে বন্দুক!
ছুন-ছিউ আবার শাসিয়ে বললে, এখনও হাত তুললে না?
বাধ্য হয়ে আমাদের সকলকেই হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে হল, কাঠের মূর্তির মতো।
ছুন-ছিউ ইঙ্গিত করতেই কাফ্রিরা ছুটে এসে ধাক্কা মেরে আমাদের মাটির ওপরে শুইয়ে দিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেললে।
আমার সামনে এগিয়ে এসে ছুন-ছিউ প্রথমে করলে বিকট অট্টহাস্য! তারপর বললে, বাবু, এইবারে তোমাদের আমি হাতের মুঠোয় পেয়েছি। কিন্তু আমি বেশি কথা বলতে চাই না। প্রাণ বাঁচাতে চাও তো লকেটখানা ফিরিয়ে দাও।
আমি বললুম, তুমি যা চাইছ আমার কাছে তা নেই।
আবার হা-হা করে হেসে উঠে ছুন-ছিউ বললে, নেই? তাহলে কি তোমরা এতদূরে এসেছ ছেলেখেলা করতে? ওহে, দ্যাখো তো এদের জামাকাপড় গুলো খুঁজে!
তারা আমাদের প্রত্যেকের জামাকাপড় তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলে–এমনি কী আমাদের মুখবিবর পর্যন্ত দেখতে ছাড়লে ।
লকেট আছে কলকাতায়, কিন্তু তার লিখন আছে আমার স্মৃতির ভাণ্ডারে। ছুন-ছিটকে সে কথা বলা উচিত মনে করলুম না।
ছুন-ছিট রাগে যেন পাগলের মতন হয়ে উঠল। চিৎকার করে বললে, ওরে বাঙালি কুত্তার দল! তোদের জন্যে আমার দুর্গতির সীমা নেই। চিন থেকে এলুম বাংলাদেশ, সেখানে বিপদের পর বিপদ এড়িয়ে এসেছি এই কাফ্রিস্থানে। এখানে এসে আমাদের দলের আটাশজন লোকের প্রাণ গিয়েছে, তবু আমি তোদের সঙ্গ ছাড়িনি। এত করেও শেষটা কি আমাকে ফাঁকে পড়তে হবে?
আমি বললুম, হ্যাঁ বন্ধু, ঠিক আন্দাজ করেছ। এখন দেশের ছেলে দেশে ফিরে যাও।
ছুন-ছিউ চোখ পাকিয়ে বললে, তাই নাকি? আমাকে যদি ফিরে যেতে হয়, তাহলে তোদেরও এই পৃথিবীতে রেখে যাব না!
বেশ, তাহলে আমাদের খুন করো। মরতে হবে সকলকেই মরতে আমরা ভয় পাই না।
আচ্ছা, দেখা যাক। ওরে, তোরা এই লোকগুলোকে একসঙ্গে বেঁধে ফ্যাল। তারপর ওদের ওই নদীতে ভাসিয়ে দেয়।
প্রতিবাদ করলুম না কারণ এই উন্মত্ত শয়তানদের কাছে প্রতিবাদ বা দয়া প্রার্থনা করে কোনই লাভ নেই।
তারা আমার ও কুমারের ওপরে রাখল বিনয়বাবু ও কমলের দেহ এবং তার ওপরে শোয়ালে মাল্কান ও রামহরিকে। তারপর লোকে যেমন করে চ্যালাকাঠের বোঝা বাঁধে, সেইভাবে দড়ি দিয়ে আমাদের সকলকে একসঙ্গে বেঁধে ফেললে। আমাদের হাত-পা আগেই বাঁধা ছিল– এটা হল বাঁধনের ওপর বাঁধন!
ভেবেছিলুম মাল্কান তো আমাদের মতন বিপদের পাঠশালায় শিক্ষা গ্রহণ করেনি, প্রাণের ভয়ে কাবু হয়ে সে হয়তো কান্নাকাটি জুড়ে দেবে। কিন্তু এখন দেখছি তার সাড়ে ছয়ফুট উঁচু দেহটির সবটাই হচ্ছে দুর্জয় সাহসে পরিপূর্ণ। তার মুখ ভাবহীন, কণ্ঠে টু শব্দ নেই।
ওরা সকলে মিলে ধরাধরি করে আমাদের নদীর ধারে নিয়ে গেল।
ছুন-ছিউ বললে, এই শেষবার জিজ্ঞাসা করছি বলো, লকেট কোথায় রেখেছ?
আমি বিরক্তস্বরে বললুম, আমাকে বারবার জ্বালাতন কোরো না ছুন-ছিউ! লকেট আমার কাছে নেই।
ছুন-ছিউ বিস্ময়মাখা ক্রুদ্ধস্বরে বললে, এই বাঙালিটা আমাকে আশ্চর্য করলে যে! এ মরবে, তবু মিছে কথা বলতে ছাড়বে না!
