চলতে-চলতে কেটে গেল আরও মিনিট দশ-বারো! পথ সেখানে সিধে নেমে গিয়েছে। মুখ ফিরিয়ে দেখলুম, মশালের আলোগুলো আমাদের কাছ থেকে বড়জোর সিকি মাইল তফাতে আছে।
আমি দাঁড়িয়ে পড়ে বললুম, বিনয়বাবু, আর এগুবার চেষ্টা করা নিরাপদ নয়। তাহলে প্রস্তুত হওয়ার সময় পাব না।
বিনয়বাবু হতাশভাবে বললেন, বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধ আমাদের করতেই হবে।
হ্যাঁ, করতেই হবে। কুমার, তোমরা প্রত্যেকেই ব্যাগগুলো সামনের দিকে রেখে মাটির ওপরে শুয়ে পড়। ওরা যদি বন্দুক ছোড়ে, তাহলে ব্যাগগুলো সামনে থাকলে আত্মরক্ষার খানিকটা সুবিধে হবে।
মাল্কান বললে, বাবুসাহেব, আমাদের বাঁ-পাশেই পাহাড়ের গায়ে একটা বড় গুহা রয়েছে। আমরা এর মধ্যে আশ্রয় নিলে কি ভালো হয় না?
এ গুহার ভেতর দিয়ে কি অন্যদিকে বেরুবার পথ আছে?
না বাবুসাহেব।
তাহলে ও গুহা হবে আমাদের পক্ষে ইঁদুর কলের মতন। ওর মধ্যে বন্দি হতে চাই না।
ঠিক সেই সময়ে নীচের দিকে চার-পাঁচটা বন্দুকের আওয়াজ হল–সঙ্গে-সঙ্গে আমরাও মাটির ওপরে সটান শুয়ে পড়ে নিজের নিজের বন্দুক বাগিয়ে ধরলুম।
আচম্বিতে আর একটা ভয়াবহ গম্ভীর ধ্বনি জেগে উঠে সেই পর্বতরাজ্যকে শব্দময় করে তুললে। সে ধ্বনি অপূর্ব, বিস্ময়কর, বজ্ৰাধিক ভীষণ–শুনলে হৃদয় স্তম্ভিত হয়ে যায়।
এদেশে এসে এরকম ধ্বনি আগেও শুনেছি–এ হচ্ছে পাহাড় ধসে পড়ার শব্দ– কাফ্রিস্থানের এক সাধারণ বিশেষত্ব!
কিন্তু আমাদের এত কাছে এমন শব্দ-বিভীষিকা আর কোনদিন জাগ্রত হয়নি। দলবদ্ধ বজ্র যেন গড়গড় করে ভৈরব নদে ধেয়ে আসছে আমাদের মাথার ওপর দিক থেকেই।
মাল্কান এক লাফে দাঁড়িয়ে উঠে উদভ্রান্তের মতন চিৎকার করে বললে, বাবুসাহেব, পাহাড় ধসে পড়ে নেমে আসছে এই পথ দিয়েই!
.
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ । সলিল-সমাধি
সেই কল্পনাতীত, গতিশীল শব্দ-বিভীষিকার তলায় থেকে মনে হল, সৃষ্টির শেষ মুহূর্ত উপস্থিত এবং দুর্দান্ত প্রলয় উৎকট আনন্দে নেমে আসছে আমাদের মাথার ওপরে!
প্রাণের আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি–হঠাৎ মাল্কান প্রাণপণে চিৎকার করে প্রচণ্ড এক লাফ মেরে আমাদের বাঁ-পাশের গুহাটার ভেতরে গিয়ে পড়ল।
চোখের পলক পড়তে-না-পড়তেই আমরাও প্রায় একসঙ্গেই সেই গুহার ভেতরে গিয়ে উপস্থিত হলুম–এমন কি বাঘা পর্যন্ত! আত্মরক্ষার চেষ্টা এমনি স্বাভাবিক যে, মানুষ আর পশু চরম বিপদের সময়ে ব্যবহার করে ঠিক একই রকম!
ভেতর গিয়ে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই গুহার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল এবং পথের ওপর দিয়ে চলে যেতে লাগল যেন কান-ফাটানো, প্রাণ-দমানো মহাশব্দের অদ্ভুত এক ঝটিকা ও প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথরের স্তূপ–চারিদিকে নুড়ির-পর-নুড়ি ছড়াতে-ছড়াতে! একটা নুড়ি এসে লাগল কমলের কাঁধের ওপরে, সে আর্তনাদ করে বসে পড়ল!
মিনিট দুই ধরে গুরুভার পাথরের স্তূপগুলো ঠিক জীবন্ত ও হিংস্র প্রাণীর মতন গড়াতে গড়াতে ও লাফাতে লাফাতে নীচের দিকে নামতে লাগল–সেই দুই মিনিট যেন দুই ঘণ্টারও চেয়ে বেশি! গুহার ভেতরটা কেঁপে-কেঁপে উঠছে যেন ভূমিকম্পে! গুহার ছাদটাও যেন হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে চায়!
ভয়ানক মৃত্যুর বন্যা যখন গুহামুখ ছেড়ে নীচের দিকে নেমে গেল, তখনও আমরা স্তম্ভিতের মতন নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম!
সর্বপ্রথমে কথা কইলেন বিনয়বাবু। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, বিমল, নীচের দিক থেকে বিষম এক হাহাকার শুনতে পেয়েছ?
আমি বললুম, পেয়েছি। যে মৃত্যুকে আমরা কঁকি দিলুম, শত্রুরা বোধহয় তাকে এড়াতে পারেনি! অনেক লোকের কান্না শুনেছি, বোধহয় তারা সদলবলে মারা পড়েছে!
কমল আর্তস্বরে বললে, বিমলদা, নুড়ি লেগে বোধহয় আমার কাঁধের হাড় ভেঙে বা সরে গেছে। আমি ডানহাত নাড়তে পারছি না।
বিনয়বাবু তাড়াতাড়ি কমলের কাছে গিয়ে তার সেবা-শুশ্রূষায় নিযুক্ত হলেন।
কুমার ব্যাকুলস্বরে বলে উঠল, সর্বনাশ। আমার বন্দুকটা যে বাইরে ফেলে এসেছি!
আমারও বন্দুক বাইরে পড়ে আছে–প্রাণরক্ষার জন্যে ব্যস্ত হয়ে বন্দুকের কথা ভাববার সময় পাইনি।
বিনয়বাবু আর কমল বন্দুকহীনবন্দুক নিয়ে ভেতরে ঢুকতে পেরেছে কেবল রামহরি।
ছুটে গুহার বাইরে গেলুম। সেখানেও বন্দুকগুলোর কোনও চিহ্ন নেই ছুটন্ত পাথরের বিষম ধাক্কায় বঁটার মুখে তুচ্ছ ধুলোর মতো বন্দুকগুলো যে কোথায় গিয়ে পড়েছে তা কে
জানে! পাথরের চাপে হয়তো সেগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গিয়েছে!
কুমার বললে, শত্রুদের অবস্থাও যদি বন্দুকগুলোর মতন হয়ে থাকে তাহলে আমাদের ভাবনার কারণ নেই। রামহরির একটা বন্দুক আর আমাদের চারটে রিভলভারই যথেষ্ট।
পাহাড়ের গা দিয়ে যে ঢালু পথ বেয়ে আমরা ওপরে উঠেছি তার দিকে তাকিয়ে দেখলুম। যতদূর নজর চলে কেবল দেখা যায়, পথের ওপরে ছড়ানো রয়েছে নুড়ি আর নুড়ির রাশি,বড়-বড় পাথরগুলো গড়াতে-গড়াতে নীচের দিকে নেমে হারিয়ে গিয়েছে দৃষ্টির অন্তরালে। শত্রুরাও অদৃশ্য। হয়তো তাদের দেহগুলো এখন পাহাড়ের পদতলে পড়ে আছে নির্জীব ও রক্তাক্ত মাংসপিণ্ডের মতো।
আশ্বস্ত হলাম বটে, কিন্তু দুঃখিতও হলুম যথেষ্ট। এতগুলো মানুষের এমন শোচনীয় পরিণাম!
তখন রঙিন উষার রহস্যময় আলো সেই শৈলরাজ্যকে করে তুলেছে নতুন এক স্বপ্নলোকের মতো। ভোরের পাখিদের সভায় জাগল ঘুমভাঙানি গান এবং পলাতক অন্ধকারের পরিত্যক্ত আসর জুড়ে বিরাজ করছে স্নিগ্ধসবুজ লতাপাতা-বনস্পতি।
