আলোর ছায়া পড়ে না জানি, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল চারিদিককে মায়াময় করে তুলেছে যেন অচঞ্চল জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ ছায়া! কিছুই স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে না, অথচ সামনে পিছনে এপাশে ওপাশে যেদিকেই তাকাই সেইদিকেই পাহাড় বা জঙ্গল বা ঝোপঝাপের আবছা অস্তিত্ব জাগে চোখে।
সব আগে চলেছে মাল্কান, তারপর আমরা। এমন এক সংকীর্ণ পথ দিয়ে অগ্রসর হচ্ছি যে, দুজনের পাশাপাশি চলবার উপায় নেই।
কুমার বাঘার গলা জড়িয়ে ধরে বললে, বাঘা, তুমি এখন কারুকে ধমকধামক দেওয়ার চেষ্টা কোরো না। একেবারে চুপ করে থাকো–বুঝেছ?।
বাঘা নিশ্চয়ই বুঝলে। আমরা নিজেদের মনুষ্যত্বের গর্বে কুকুর প্রভৃতি গৃহপালিত জীবকে পশু বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি। কিন্তু পরীক্ষা করলেই দেখা যায়, মানুষের সংসারে যে সব। জীব বা পশু পালিত হয়, তাদের অনেকেই আমাদের মুখের ভাষা বা মনের ভাব বুঝতে পারে। বাঘাও কুমারের বক্তব্য বুঝে একটিমাত্র শব্দও উচ্চারণ করলে না।
মিনিট পাঁচ-সাত পরে শত্রুদের পায়ের শব্দ আর শোনা গেল না। কিন্তু আরও মিনিট কয়েক পরে বহু কণ্ঠের একটা উচ্চ কোলাহল জেগে উঠে রাতের নীরবতা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে।
মাল্কান বললে, বাবুসাহেব, ওরা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে যে শিকার হাতছাড়া হয়েছে। যদিও ওরা জানে না আমরা কোনদিকে গিয়েছি, তবু সাবধানের মার নেই–তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলুন।
আমরা দৌড়তে আরম্ভ করলুম। সেই পাহাড়ে-পথ কোথাও বনের অন্ধকার, কোথাও চাঁদের আলো মেখে এবং কোথাও উঁচু দিকে উঠে ও কোথাও নীচু দিকে নেমে এঁকেবেঁকে সামনে চলে গিয়েছে। মাঝে-মাঝে দেখি দু-পাশেই গভীর খাদ, সেখানে এবড়োখেবড়ো পথে ছুটতে গিয়ে একবার যদি হোঁচট খাই তাহলে এ জীবনে আর শালোকা মঠ, কুবের মূর্তি ও গুপ্ত গুহার গুপ্তধন নিয়ে মাথা ঘামাবার কোনও দরকার হবে না।
এতক্ষণে পথটা চওড়া হয়ে এল। এখন চার-পাঁচ জন লোক অনায়াসেই পাশাপাশি চলতে পারে। চাঁদের আলোও আর পাহাড়ের আড়ালে নেই। সুতরাং পথ চলবার কষ্ট আর হঠাৎ বিপদে পড়বার ভয় থেকে অব্যাহতি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম।
মাল্কান একবার পিছনদিকে মুখ ফিরিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর অভিভূত স্বরে বললে, দেখুন বাবুসাহেব, দেখুন!
পিছন ফিরে দেখলুম, অনেক দূরে–প্রায় হাজার ফুট নীচে এক জায়গায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে এবং আরক্ত অগ্নির ক্রুদ্ধ শিখায় শূন্যের অনেকখানি লাল হয়ে উঠেছে।
কুমার বললে, ওখানে অমন আগুন জ্বলবার কারণ কী?
মাল্কান বললে, আমি বেশ বুঝতে পারছি, আগুনে পুড়ছে গুমলি বিবির বাড়ি। শয়তানরা আমাদের ধরতে না পেরে রেগে পাগল হয়ে গুমলি-বিবির বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে।
রামহরি দরদ ভরা গলায় বললে, আহা, আমাদের আশ্রয় দিয়েই গুলি আজ পথে বসল।
মাল্কান মাথা নেড়ে বললে, একখানা বাড়ি পুড়ে গেলেই গুমলি-বিবি পথে বসবে না। তার কেবল টাকাই নেই, যেসব কাফির এখনও বাপ-পিতামহের ধর্ম ছাড়েনি, তাদের কাছে গুমলি-বিবির মানমর্যাদাও যথেষ্ট, তার জন্যে তারা প্রাণ দিতেও নারাজ নয়। তারা যখন খবর পাবে তখন বিধর্মী বামুর্ককে প্রাণ নিয়ে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। কিন্তু বাবুসাহেব, আমার কী ভাবনা হচ্ছে জানেন? আজ গুমলি-বিবিকে হাতে পেয়ে দুশমনরা যদি তার ওপর অত্যাচার করে, তাহলে কে তাদের বাধা দেবে?
মান্ধানের কথা শুনতে-শুনতে নীচে আর-এক দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সেখানটায় চাঁদের আলো নেই, অন্ধকারের মধ্যে নাচছে কতকগুলো ছোট ছোট চলন্ত আলোক শিখা।
মাল্কানও দেখতে পেল। এস্ত স্বরে বললে, বাবুসাহেব, বাবুসাহেব! শত্রুরা আবার আমাদের ধরতে আসছে!
বাঘা পর্যন্ত বুঝতে পারলে। চাপা গলায় গরর গরর করে গজরাতে লাগল।
আমি বললুম, এগিয়ে চল–এগিয়ে চল! যতক্ষণ পারি এগিয়ে তো চলি, তারপর দরকার হলে যুদ্ধ করতেও আপত্তি নেই!
কুমার বললে, হুঁ, ছুন-ছিউ এখনও আমাদের ভালো করে চিনতে পারেনি! ভেবেছে দলে ভারী হয়ে আমাদের ওপরে সে টেক্কা মারবে!
কমল বললে, দেখা যাক ছুন-ছিউ কত বড় গুলিশোর–আমাদের অটোমেটিক রাইফেলের কটা গুলি সে হজম করতে পারে!
বিনয়বাবু রুষ্ট কণ্ঠে বললেন, থামো ছোকরা, থামো–অত আর বাক্য-বন্দুক ছুঁড়তে হবে না! কথায় কথায় যুদ্ধ অমনি করলেই হল না? বিনা যুদ্ধে যাতে কার্যসিদ্ধি হয়, আগে সেই চেষ্টাই দ্যাখো!
রামহরিও বিনয়বাবুর কথায় সায় দিয়ে কমলের দিকে বিরক্ত চোখে চেয়ে বললে, যা বলেছেন বাবু! বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়!
আমি হাসছি দেখে বিনয়বাবু বললেন, না বিমল, এসব হাসির কথা নয়। আমার বিশ্বাস, শত্রুদের দলে চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের কম লোক নেই, আর ওরাও হয়তো বন্দুক নিয়ে তৈরি হয়েই এসেছে। যুদ্ধে ওদের দশ-পনেরো জন মারা পড়লেও দলে ওরা ভারী থাকবে। কিন্তু গুনতিতে আমরা তো মোটে ছয় জন লোক, এর মধ্যে তিন-চার জন যদি মারা পড়ে বা জখম হয় তখন কী উপায় হবে?
আমি বললুম,ঠিক কথা বিনয়বাবু! নিতান্ত নিরুপায় না হলে আমরা নিশ্চয়ই যুদ্ধ করব না। চলো, চলো, তাড়াতাড়ি পা চালাও!
আরও মিনিট পনেরো ধরে নীরবে দ্রুতবেগে আমরা অগ্রসর হতে লাগলুম। কিন্তু শত্রুরা এগিয়ে আসছিল আমাদেরও চেয়ে বেশি বেগে। কারণ খানিকক্ষণ পরেই তাদের চিৎকার শুনতে পেলুম।
