অনেক লোক! কত?
তা বিশ-বাইশ জনের কম হবে না!
তারাও কি আমাদের শত্রু?
তাই তো মনে হচ্ছে বাবুজি! এত রাতে ভালো লোকেরা দল বেঁধে কখনও পাহাড় পথে চলে না!
এমনসময়ে ছাদের ওপর থেকে গরক চিৎকার করে বললে, হুশিয়ার বাবুজি, হুঁশিয়ার! পুব দিক থেকে অনেক আদমি আসছে!
কারুক সভয়ে বললে, কী মুশকিল! দুশমনরা কি বাড়িখানা ঘিরে ফেলতে চায়?
কারুক বোধহয় ঠিক আন্দাজই করেছে! হয়তো আমাদের বেড়াজালেই ধরা পড়তে হবে।
.
একাদশ পরিচ্ছেদ। মৃত্যুর হুঙ্কার
দু-দিক থেকে শত্রুরা আসছে দলে-দলে, হয়তো পালাবার সব পথই বন্ধ করে আমাদের টিপে মেরে ফেলবার জন্যে।
জানি, আমাদের পাঁচজনের কাছে আছে পাঁচটা স্বয়ংবহ বন্দুক বা অটোমেটিক রাইফেল তাদের প্রত্যেকটা মিনিট গুলিবৃষ্টি করতে পারে পঁয়ত্রিশবার! সুতরাং শত্রুরা যে সহজে আমাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা এসে পড়েছি অপরিচিত শত্রুদের স্বদেশে; গুমলির বাড়িখানা এখানে আমাদের পক্ষে মরুভূমিতে ওয়েসিসের মতন বটে, কিন্তু সমস্ত গ্রামের বিরুদ্ধে আমরা পাঁচজনে কতক্ষণ দাঁড়াতে পারব? আর আমাদের আশ্রয় দিয়ে গুমলিই বা বিপদে পড়বে কেন? শত্রুরাও নিশ্চয় নিরস্ত্র নয় এবং ওদের দলে যদি শয়তান ছুন-ছিউ থাকে তাহলে ওদের সঙ্গেও যে আগ্নেয়াস্ত্র আছে, এটাও অনুমান করতে পারি। অতএব আমাদের আশ্রয়দাত্রী এই বিদেশিনী নারীর বাড়ির অঙ্গনকে যুদ্ধক্ষেত্ররূপে ব্যবহার করা বোধহয় সঙ্গত নয়।
বেশিক্ষণ ভাববার সময় নেই–প্রতি মুহূর্তেই শত্রুরা আরও কাছে এসে পড়ছে।
তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলুম, মাল্কান, আমাদের পালাবার কোন পথই কি খোলা নেই?
মাল্কান যা বললে বিনয়বাবু তার অর্থ বুঝিয়ে দিলেন–একটা পথ আছে বাবুসাহেব!
কোথায়?
বাড়ির খিড়কি দিয়ে বেরুলে উত্তরদিকে একটা সরু পাহাড়ে পথ পাওয়া যাবে।
উত্তরদিকে? মাল্কান, আমরা কী দেখবার জন্যে এদেশে এসেছি সেকথা তুমি বোধহয় জানো না?
জানি বাবুসাহেব! গুমলি বিবির মুখে আমি সব শুনেছি কারণ আপনাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভার পড়েছে আমারই ওপরে। আপনারা তো সেকালের সেই ভাঙা মঠ দেখতে যেতে চান?
হ্যাঁ। সে মঠও তো উত্তরদিকে?
হ্যাঁ বাবুসাহেব।
এখান থেকে সে মঠ কত দূরে?
তা প্রায় বিশ-পঁচিশ মাইল হবে।
তুমি এখনি আমাদের সঙ্গে যেতে পারবে?
এখনি?
হ্যাঁ মাল্কান। যদি রাজি হও, একশো টাকা বকশিশ পাবে।
মাল্কান ইতস্তত করছিল, কিন্তু এই দরিদ্র কাফ্রিস্থানে একশো টাকা হচ্ছে কল্পনাতীত সৌভাগ্য! সে মহা উৎসাহে বলে উঠল, বাবুসাহেব, আমি যেতে রাজি!
আসছে কাল সকালেই আমাদের এখান থেকে বেরুবার কথা বলে আমরা আগে থাকতেই মোটঘাট বেঁধে রেখেছিলুম।
হুট বলতে ছুট দেওয়ার অভ্যাস আমাদের বরাবরই। এ হপ্তায় আমরা কলকাতার শৌখিন নাগরিক, আসছে হপ্তায় আফ্রিকার বিপুল অরণ্যে বনবাসী! এমনি ভবঘুরের জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে একটা ভালো শিক্ষা আমরা পেয়েছি। প্রবাসে যেতে হলে বাঙালিরা মস্ত বড় গৃহস্থালি ঘাড়ে করে বেরোয়–বড়-বড় ট্রাঙ্ক, সুটকেশ, বিছানা, পোঁটলা-পুঁটলি। কিন্তু কত কম জিনিস সঙ্গে নিয়ে পথে-বিপথে অনায়াসেই দৈনিক জীবনযাপন করা যায়, সে সমস্যা আমরা সমাধান করতে পেরেছি! যা দরকার সে সমস্তই আমাদের সঙ্গে আছে, অথচ আমাদের মালের সংখ্যা এত কম যে, কুলি ডাকবার দরকার হয় না–নিজেদের মাল নিজেরাই বয়ে নিয়ে যেতে পারি।
তিন মিনিটের মধ্যেই আমরা মোটঘাট গুছিয়ে নিয়ে অজানার অন্ধকারে যাত্রা করবার জন্যে প্রস্তুত হলুম!
গুমলি এসে ম্লান মুখে বললে, বাবুজি, আমি এখন বুঝতে পারছি, বার্মুকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভালো কাজ করিনি। আপনারা আমার অতিথি, কিন্তু আপনাদের শত্রুকে আমন্ত্রণ করে আনলুম আমিই! এ দুঃখ আমার কখনই যাবে না!
কুমার বললে, না গুমলি বিবি, মিথ্যে অনুতাপ কোরো না। শত্রুরা নিশ্চয়ই আজ আমাদের আক্রমণ করত। তবে ওরা কেবল একবার চেষ্টা করে দেখেছিল যে, তোমার সাহায্যে চুপিচুপি নিরাপদে কাজ সারা যায় কি না! আর সময় নেই–সেলাম!
সেলাম বাবুজি, সেলাম! একটা সেকেলে ভাঙা মঠে বেড়াতে যাওয়ার জন্যে এত বিপদ মাথায় নিয়েছেন কেন, সে কথা আমি জানি না বটে, কিন্তু সর্বদাই মনে রাখবেন বাবুজি, গুমলির দৃষ্টি রইল আপনাদেরই ওপরে!
বাড়ির খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে এই ভাবতে-ভাবতে অগ্রসর হলুম, গুমলির শেষ কথাগুলোর অর্থ কী?
চাঁদ তখনও অস্ত যায়নি বটে, কিন্তু একটা উঁচু পাহাড়ের পিছনে নেমে গিয়েছে– চারিদিকে রাত্রির বুকের ওপরে দুলছে ঘন ছায়ার রহস্যময় যবনিকা।
শত্রুরা এখন আর চোরের মতন আসছিল না, পাহাড়ে-পথের ওপরে বহু পাদুকার কঠিন ধ্বনি শুনে নিশীথিনী তার মৌনব্রত ভঙ্গ করে যেন সচমকে জেগে উঠল। বুঝলুম কৌশলে কার্যোদ্ধার হল না দেখে শত্রুরা এমন মরিয়া হয়ে ছুটে আসছে দস্যুর মতো।
ছুন-ছিউর বাহাদুরি দেখে মনে-মনে তারিফ না করে পারলুম না। যে লোক এরই মধ্যে অপরিচিত দুরবিদেশে এসে এমন বৃহৎ এক দল গড়তে পারে, নিশ্চয়ই সে অসাধারণ ব্যক্তি।
কিন্তু বিনয়বাবু মাথা নেড়ে বললেন, না বিমল, আমি ছুন-ছিউর অসাধারণতা স্বীকার করি না। পৃথিবীতে সঙ্গীর অভাব হয় ভালো কাজেই, কারণ জগতে সাধুর সংখ্যা বেশি নয়। কিন্তু কুকার্যে নিযুক্ত হয়ে তুমি যদি একবার ডাক দাও, চারিদিক থেকে সঙ্গী এসে জুটবে পঙ্গপালের মতো। পৃথিবীর হিতসাধন করবার জন্যে বুদ্ধদেবকে পথে বেরুতে হয়েছিল একাকীই, কিন্তু চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লং আর নাদির শা যখন পৃথিবীর ওপরে অমঙ্গলের অভিশাপ বর্ষণ করতে বেরিয়েছিলেন, তখন তাদের লক্ষ লক্ষ পাপ-সঙ্গীর অভাব হয়নি।
