আছে বাবুজি, আছে!
মানে?
মুখপোড়া বামুকের কাছ থেকে বকশিশের আগাম আড়াইশো টাকা আমি আদায় করে নিয়েছি।
গুমলি!
ঘাবড়াবেন না বাবুজি, ঘাবড়াবেন না। বামুক হচ্ছে পাজির পা ঝাড়া, মানুষ মারতে তার হাত এতটুকুও কঁপে । সে কাফির হলেও আমাদের ধর্ম ছেড়েছে, তাই তাকে আমরা পরম শত্রু বলেই মনে করি। তাকে ঠকিয়ে যদি আড়াইশো টাকা লাভ করতে পারি, তাহলে আমার কোনও পাপ হবে না।
গুমলি, আমরা এখনি তোমার বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই।
ভয় নেই বাবুজি। যখন সবকথা প্রকাশ করলুম, তখন আপনাদের খাবারের সঙ্গে নিশ্চয়ই আমি বিষ মাখিয়ে দেব না। বামুকের মতলবটা ঠিক বুঝতে পারছি না বটে, তবে তার অর্ধেক টাকা যখন নিয়েছি, অর্ধেক কাজও আমি করব।
অর্থাৎ?
আজ রাত্রে সদর দরজাটা খুলে রাখব।
তারপর?
তারপর রাত্রে কেউ আমার বাড়িতে ঢুকলে ভালো করেই তাকে আদর-যত্ন করব। গরক, বাচিক, কারুক আর মাল্কানকে খবর দিয়েছি, তারা এল বলে।
তারা আবার কে?
আমার বিশ্বাসী লোক আমার কথায় তারা ওঠে বসে। আজ রাত্রে তারা আমার বাড়িতে পাহারা দেবে।
বিনয়বাবু যখন সব কথা আমাদের বুঝিয়ে দিলেন, তখন আমিও বললুম, আমিও গুমলির মতে সায় দি। শঠের সঙ্গে শঠতা করতে কোনও দোষ নেই। আসুক ছুন-ছিউ, আসুক বামুক! এখানে এলেই তারা দেখতে পাবে, মড়ারা জ্যান্ত হয়ে বন্দুক ধরে বসে আছে!
কুমার কৃতজ্ঞ স্বরে বললে, গুমলি ঠাকরুণ! তোমার বাকি আড়াইশো টাকাও মারা যাবে না। ও টাকাটাও আমরা নিজেদের পকেট থেকে তোমায় দেব!
গুমলি একগাল হেসে সেলাম করে বললে, বাবুজি মেহেরবান!
পাহাড়ের টঙে কাফ্রিদের ছোট্ট গাঁ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল প্রথম রাত্রেই। রাত যত গম্ভীর হয় স্তব্ধতা ততই থমথমে হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন বোবা দুনিয়ায় জেগে আছে কেবল গোটাকয়েক বদরাগি কুকুর।
সদর দরজার পাশেই একটা ঘর তার মধ্যে আলো নিবিয়ে অপেক্ষা করছি আমি, কুমার, বিনয়বাবু, কমল ও রামহরি। বলা বাহুল্য, আমাদের প্রত্যেকেরই হাতে আছে একটা করে রিভলভার। এই সংকীর্ণ স্থানে বন্দুকের সাহায্য দরকার হবে না।
গরক, বাচিক, কারুক আর মাল্কানও এসেছে। তারা সবাই হচ্ছে কাফ্রিদের পুরাতন ধর্মের লোক। প্রত্যেকেরই দেহ প্রায় ছয় ফুট করে লম্বা, সারা গায়ে কঠিন মাংসপেশির খেলা। তারা কথা কয় কম, কিন্তু তাদের ভাবভঙ্গি দেখলেই বেশ বোঝা যায়, আমাদের সাহায্য করবার জন্যে তারা সকলেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
গরক ও বাচিক বাড়ির ছাদের ওপরে বসে আছে, পাহারা দেওয়ার জন্যে। কারুক আর মাল্কান অপেক্ষা করছে গাঁয়ের পথে, শত্রুরা দেখা দিলেই তারা আমাদের সাবধান করে দেবে। প্রথমে তারা আমাদের সঙ্গে বাড়ির ভেতরেই থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি। আমি তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি বাড়ির ভেতরে পাঁচটা রিভলভারই যথেষ্ট, তারা যদি যথাসময়ে শত্রুদের আগমন সংবাদ দিতে পারে, তাহলেই আমাদের যথার্থ উপকার করা হবে।
রাতের অসাধারণ নীরবতার মাঝে আমাদের হাতঘড়িগুলোর টিকটিক শব্দ যেন রীতিমতো কোলাহল বলে মনে হচ্ছে!
বাঘা পর্যন্ত বুঝতে পেরেছে, আমরা কোনও অযাচিত ও অনাহুত অতিথিকে অভ্যর্থনা করবার জন্যে অপেক্ষা করছি। সে আমার কোল ঘেঁষে কান খাড়া করে বসে আছে।
আচম্বিতে দূর পথ থেকে ভেসে এল একটা বিড়ালের ম্যাও ম্যাও চিৎকার। তারপরই ছাদের ওপর থেকে সাড়া দিলে আর একটা বিড়াল!
এই হল আমাদের সঙ্কেতধ্বনি! এর মানে, এখনি হবে শত্রুদের আবির্ভাব।
আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালুম।
বিনয়বাবু চুপিচুপি বললেন, আমরা কী করব?
বিশেষ কিছু না। এখানে সবাই মিলে রিভলভার ছুঁড়ে হুলুস্থুল বাধিয়ে দিলে পুলিশ হাঙ্গামে জড়িয়ে পড়তে হবে। বদমাইশগুলোকে কিছু ভয় দেখাতে বা সামান্য জখম করতে পারলেই আমাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে। রামহরি, বাঘাকে সামলে রাখো। কুমার, শত্রুরা যখন পালাবে তখন তোমরা সবাই মিলে রিভলভার ছুঁড়ে তাদের পেটের পিলে চমকে দিতে পার।
এক, দুই করে প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট কাটল। তারপরেই একটু একটু করে সদর দরজাটা ফাঁক করে ভেতরে ক্রমেই বেশি চাঁদের আলো এসে পড়তে লাগল। সদর দরজা একেবারে খুলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কালো কালো পোশাক পরা তিনতিনটে মূর্তি।
প্রথম মূর্তিটার পা লক্ষ করে আমি রিভলভার ছুড়লুম। লোকটা বিকট আর্তনাদ করে মাটির ওপরে বসে পড়ল।
আমার রিভলভার আরও দুইবার গর্জন করলে কিন্তু এবারে আমি আর কারুকে লক্ষ করিনি।
যে পায়ে চোট খেয়ে বসে পড়েছিল, সে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে প্রাণের ভয়ে ছুটতে শুরু করলে! অন্য দুজনও দাঁড়াল না।
ছাদের ওপর থেকে বড় বড় পাথর বৃষ্টি হতে লাগল–নিশ্চয় গরক ও বাচিকের কীর্তি। কুমার প্রভৃতিও ঘর থেকে বেরিয়ে ঘন-ঘন রিভলভার ছুঁড়তে লাগল আর বাঘার চাঁচামেচির তো কথাই নেই। শান্তিপূর্ণ মৌন রাত্রি যেন কর্কশ শব্দের চোটে হঠাৎ বিষাক্ত হয়ে উঠল।
তারপরেই চাঁদের আলোয় দেখা গেল, দুজন লোক উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে আমাদের দিকেই আসছে। প্রথমটা তাদের শত্রু ভেবে আমি আবার রিভলভার তুললুম, কিন্তু তারপরেই দেখি তারা হচ্ছে আমাদের লোক কারুক আর মাল্কান।
মাল্কান কাছে এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, পশ্চিম দিক থেকে অনেক লোক এই দিকেই আসছে!
