কিন্তু এখন আর পালানোও অসম্ভব! সেই বিপুল নারীবাহিনী তখন পঙ্গপালের মতো চারিধার থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে! আর নারী বলে তাদের কারুকে তুচ্ছ করবারও উপায় নেই! তাদের কেহই বাংলাদেশের ভেঙেপড়া লতার মতন মেয়ে নয়, তাদের অধিকাংশই সাধারণ বাঙালি পুরুষেরও চেয়ে মাথা উঁচু শক্ত ও বলিষ্ঠ তাদের দেহ!
আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলুম–এমন অদ্ভুত সমস্যায় কখনও আর পড়িনি। বিকট স্বরে চেঁচিয়ে মেয়ের দল সবেগে আমাকে আক্রমণ করলে! আর সে এমন বিষম আক্রমণ যে, স্বয়ং ভীমসেন তাঁর বিরাট গদা ঘুরিয়েও নিজেকে বাঁচাতে পারতেন না।
ভীতু ভেড়ার মতন আমি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলুম। তারা ছিনেজোঁকের মতন আমাকে চেপে ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল এবং তারপর আমি কিছু বোঝবার আগেই আমাকে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে একেবারে নদীর ভেতরে ফেলে দিল!
ঝুপ করে জলে পড়লুম। নদী সেখানে গভীর নয় বটে, কিন্তু সেই বরফ-গলা জলে আমার সর্বাঙ্গ যেন হিম হয়ে গেল, নাকানিচোবানি খেয়ে অসাড় দেহটাকে কোনওরকমে টেনে ডাঙায় তুলে দেখি, মেয়ের পাল সকৌতুকে হাসতে-হাসতে আর একদিকে চলে যাচ্ছে। তবে কি এটা হচ্ছে ওদের ঠাট্টা? মেয়েমানুষ তেড়ে এসে জোয়ান পুরুষকে ধরে বেড়ালছানার মতন জলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়–এ কীরকম সৃষ্টিছাড়া দেশ? প্রাচীন গ্রিক সৈনিকরা নাকি এক জাতের বীর নারীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, তাদের সঙ্গে প্রাচীন কাফির নারীদের কোনও সম্পর্ক নেই তো?
কাঁপতে কাঁপতে বাসার দিকে চললুম। পথের চারিদিকেই মেয়ের দল হুড়োহুড়ি করে বেড়াচ্ছে, পাছে আবার তাদের পাল্লায় পড়তে হয়, সেই ভয়ে মানে-মানে আমি পাশ কাটিয়ে সন্তর্পণে অগ্রসর হতে লাগলুম–কিন্তু তারা কেউ আর আমার দিকে কৃপাদৃষ্টি নিক্ষেপ করলে না।
আর একটা ব্যাপার লক্ষ করলুম। আজ যেন এ দেশটা দস্তুরমতো মেয়ে-রাজ্যে পরিণত হয়েছে–পথে পুরুষ খুব কম, কেবল মেয়ে, মেয়ে আর মেয়ে! যে কয়জন পুরুষের সঙ্গে দেখা হল তাদের প্রত্যেকেরই জামাকাপড় ভিজে সপসপ করছে। একটু পরেই সব রহস্য বোঝা গেল।
বাসায় ঢুকতেই কুমার, কমল আর রামহরি অট্টহাস্য করে উঠল। বিনয়বাবুও বোধহয় অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে খানিকটা হেসে নিলেন।
আমি ক্রুদ্ধ স্বরে বললুম, যত সব কাপুরুষ! ভয়ে পালিয়ে এসে আবার দাঁত বার করে হাসতে লজ্জা করছে না?
কুমার বললে, স্বীকার করছি ভাই, আমরা হচ্ছি পয়লা নম্বরের কাপুরুষ। এই সব পাহাড়ে মেয়ের সঙ্গে হাতাহাতি করবার শক্তি আমাদের নেই। কিন্তু হে বীরবর, তোমার চেহারা। এমন ভগ্নদূতের মতো কেন?
কোনও জবাব না দিয়ে রাগে জ্বলতে জ্বলতে আমি কাপড়চোপড় বদলাতে লাগলুম।
বিনয়বাবু বললেন, ভায়া বিমল, কুমার তোমাকে সাবধান করে দিলে, তবু তুমি আমাদের সঙ্গে পালিয়ে এলে না কেন?
কেমন করে আমি বুঝব যে ওই দজ্জাল মেয়েগুলো আমাকেই আক্রমণ করতে আসছে?
আমরাও আগে বুঝতে পারিনি। ভাগ্যে গুমলি এসে সাবধান করে দিলে, তাই আমরা মানে-মানে মাথা বাঁচাতে পেরেছি।
কিন্তু এ প্রহসনের অর্থ কী?
আজ এখানে যে উৎসবটা হয়ে গেল, এর শেষে এখানকার মেয়েরা পুরুষদের ধরে নদীর জলে হাবুডুবু খাইয়ে দেয়। এটা হচ্ছে কাফিরদের লোকাঁচার–এর বিরুদ্ধে পুরুষদের কোনও জারিজুরিই খাটে না।
তাই নাকি। তাহলে গুমলির কাছ থেকে জেনে রাখবেন, ওদের এরকম আরও লোকাঁচার আছে কি না?
.
অজানা দেশের নানা বৈচিত্র্যের ও নিত্যনতুন দৃশ্য সমারোহের মধ্যে আমরা ছুন-ছিউ ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোদের কথা একরকম ভুলেই গিয়েছিলুম। তারা যে এখনও আমাদের পিছনে লেগে আছে, এমন সন্দেহ করবার কোনও কারণও পাইনি। অন্তত তারা যে আমাদের সঙ্গে আসতে পারেনি, এ বিশ্বাস আমার ছিল।
কিন্তু হঠাৎ বোঝা গেল, আমার বিশ্বাস ভ্রান্ত।
আজ বৈকালে মুখ অন্ধকার করে গুলি এসে আমাদের ঘরে ঢুকল। খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর যেন আপন মনেই বললে, বামুক লোকটা মোটেই সুবিধের নয়!
বিনয়বাবু জিজ্ঞাসা করলেন, বামুক? সে আবার কে?
সে হচ্ছে এই গাঁয়ের জাস্ট। (জাস্ট–অর্থাৎ সময়।)।
.
দশম পরিচ্ছেদ । বেড়া জালে
গুমলির মুখের ভাব দেখে আমাদের সকলেরই মনে খটকা লাগল। কিন্তু এই অজানা গাঁয়ের অচেনা সর্দার যদি সুবিধার লোকও না হয়, তাতে আমাদের কী ক্ষতি হবে?
বিনয়বাবু জিগ্যেস করলেন, লোকটা সুবিধের নয় বলছ কেন?
আজ দুপুরবেলায় আমি ভিন গাঁয়ে গিয়েছিলুম। ফেরবার পথে দেখলুম, পাহাড়ের একটা ঝোপের ছায়ায় বসে আছে বামুক আর দুটো চিনেম্যান।
বিনয়বাবু সচকিত কণ্ঠে বললেন, চিনেম্যান?
হ্যাঁ বাবুজি। তারা চুপিচুপি কী বলাবলি করছিল, আমাকে দেখেই একেবারে চুপ মেরে গেল। আমি কোনও কথা না বলে এগিয়ে এলুম। খানিক দূর এসেই ফিরে দেখলুম, বামুক আমাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে চিনেম্যান দুটোকে কী যেন বলছে।
তারপর?
তারপর তখন আর কিছু হল না। কিন্তু এইমাত্র বামুক এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে।
কেন?
হতভাগা আমাকে কী বলে জানেন বাবুজি? আজ রাত্রে আমি যদি আপনাদের খাবারের সঙ্গে বিষ মাখিয়ে আর সদরদরজা খুলে রাখতে পারি, তাহলে সে আমাকে পাঁচশো টাকা বকশিশ দেবে। অর্ধেক টাকা সে এখনি দিতে চায়।
বকশিশের লোভ তোমার কাছে নাকি?
