বিনয়বাবু বললেন, ধুকধুকিখানা তারা খুঁজে পায়নি তো?
আমি হাসতে-হাসতে নীচু গলায় বললুম, ধুকধুকিখানা আছে কলকাতায়।
বিনয়বাবু সবিস্ময়ে বললেন, সে কী?
ধুকধুকিখানা একেবারেই বাজে। আসল দরকার তার ভেতরের লেখাটুকু। আমি আর কুমার সেটুকু মুখস্থ করে রেখেছি।
কমল খুশি হয়ে বলে উঠল, বাহবা কি বাহবা। ধুকধুকির লেখা পড়তে হলে ছুন ছিউকে এখন বিমলদা আর কুমারদার মনের ভেতরে ঢুকতে হবে!
আরও খানিকক্ষণ পরে ট্রেন এসে স্টেশনে ঢুকে বিষম চাঞ্চল্য সৃষ্টি করলে। চারিদিকে মহা হইচই, লোকজনের ছুটোছুটি!
রামহরিকে নিয়ে আমরাও গাড়ি থেকে নেমে পড়লুম। গার্ড আর পুলিশের সঙ্গে ট্রেনের প্রত্যেক কামরা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলুম, কিন্তু রামহরি সেই তিনজন লোককে কোথাও আবিষ্কার করতে পারলে না। নিশ্চয়ই তারা মাঠের মধ্যে নেমে গিয়েছে।
সকালবেলায় একদল পুলিশের লোক ঘটনাস্থলে গেল খানাতল্লাশ করবার জন্যে। কিন্তু মাঠ, জঙ্গল ও আশপাশের গ্রাম খুঁজে অপরাধীদের কারুকেই পেলে না। আমার বিশ্বাস, তারা কোনও পাহাড়ে উঠে আত্মগোপন করে আছে।
যথাসময়ে লাইন মেরামত হল। ট্রেন আবার ছাড়ল। দিন-রাত যক্ষপতির রত্নপুরীর সমুজ্জ্বল স্বপ্ন দেখতে-দেখতে আমরা ক্রমেই এগিয়ে চললুম, ভারতের উত্তরসীমান্তের দিকে।
ভারতের উত্তর সীমান্ত আমার মনে চিরদিনই জাগিয়ে তোলে বিচিত্র উত্তেজনা। আফগানিস্থান যখন ছিল হিন্দুস্থানেরই এক অংশ, তখন সেই রামায়ণ-মহাভারতের যুগ থেকে সেখানে হয়েছে কত না অদ্ভুত নাটকের অভিনয়! শক, তাতার, হূণ, মোগল, চিন, পারসি ও গ্রিক প্রভৃতি জাতির-পর-জাতি এই পথ দিয়েই মূর্তিমান ধ্বংসের মতন ছুটে এসেছে সোনার ভারত লুণ্ঠন করবার জন্যে। দেশরক্ষার জন্যে যুগে-যুগে ভারতের কত লক্ষ-লক্ষ বীর ঢেলেছে সেখানে বুকের রক্তধারা! ওখানকার আকাশছোঁয়া পাহাড়ের শিখরে শিখরে আজ বাতাসে-বাতাসে যে অশ্রান্ত গান জেগে ওঠে, সে হচ্ছে এই প্রাচীন ভারতেরই অতীত গৌরবগাথা। ঐতিহাসিক ভারতের সর্বপ্রথম সম্রাট ও শ্রেষ্ঠ মহাবীর চন্দ্রগুপ্ত ওই পথ দিয়েই ভারতের শত্রু গ্রিকদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন আর্যাবর্তের বাইরে। যে পার্বত্যজাতি প্রচণ্ড রণোন্মাদ পৃথিবীজয়ী আলেকজান্ডারকেও ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল, তাদের সুযোগ্য বংশধররা আজও সেখানে বর্তমান আছে। এই বিংশ শতাব্দীর উড়োজাহাজ আর কলের কামানও তাদের যুদ্ধোন্মাদ শান্ত বা তাদের অস্তিত্ব লোপ করতে পারেনি। দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ-সিংহ আজও সেখানে ঘুমোবার অবসর পায় না। আজকের ভারতে যারা সত্যিকারের অ্যাডভেঞ্চার খুঁজে বেড়ায়, ভারতের উত্তর সীমান্ত পূর্ণ করতে পারে তাদের মনের প্রার্থনা।
বিনয়বাবুর মুখে শুনলুম, আফগানিস্থানের মধ্যে কাফ্রিস্থান হচ্ছে এক রহস্যময়, অদ্ভুত দেশ। ওখানকার লোকজন, আচার-ব্যবহার সমস্তই নতুনরকম। আমাদের যক্ষপতির ঐশ্বর্য আছে ওই কাফ্রিস্থানেই। ওইখানেই উঠবে পরের দৃশ্যের যবনিকা।
.
অষ্টম পরিচ্ছেদ। কাফ্রিস্থানের কথা
মালাকান্দ গিরিসঙ্কটের ভেতর দিয়ে আগে পড়লুম সোয়াট, তারপর ডির মুল্লুকে; তারপর উঠলুম লোয়ারি গিরিসঙ্কটের (দশ হাজার ফুটের চেয়েও উঁচু) ওপরে এবং তারপরে পৌঁছেলুম চিত্রল রাজ্যে।
এসব জায়গার বেশি বর্ণনা দেওয়ার দরকার নেই, কারণ আমাদের গন্তব্যস্থান হচ্ছে কাফ্রিস্থান। তবে অল্প দু-চার কথা বললে মন্দ হবে না।
এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে অপূর্ব, সে কথা বলা বাহুল্য। আমাদের মতন সমতল দেশের বাসিন্দাদের চোখ আর মন এই অসমোচ্চে পর্বত সাম্রাজ্যে এসে একেবারে অভিভূত হয়ে গেল। নানা আকারের শৈলমালার এমন বিচিত্র উৎসব আমি আর কখনও দেখিনি। এই চিত্রল যে কীরকম বন্ধুর দেশ, একটা কথা বললেই সকলে সেটা বুঝতে পারবেন। এ অঞ্চলে মোটঘাট স্থানান্তরিত করবার জন্যে কেউ মালগাড়ি ব্যবহার করে না, কারণ তা অসম্ভব। চিত্রলীদের অভিধানে নাকি গাড়ির চাকা বোঝায় এমন কোনও শব্দই নেই। তবে চিত্রলের শাসনকর্তার (Mehtar) দৌলতে আজকাল ওখানে খানকয় মোটরের আবির্ভাব হয়েছে বটে।
এ হচ্ছে কেবল পনেরো, ষোলো, সতেরো হাজার ফুট উঁচু আকাশছোঁয়া পাহাড়ের দেশ– খালি চড়াই আর উতরাই, খাদ আর উপত্যকা, শৈলশিখরের পর শৈলশিখরের নিস্পন্দ তরঙ্গ! দূরে-দূরে দেখা যায় আরও উঁচু শৈলমালার ওপরে চিরতুষারের শুভ্র সমারোহ। আমাদের একমাত্র সহায় এদেশি পনি ঘোড়া–অতি ভয়াবহ, উঁচু-নীচু সংকীর্ণ পথেও এসব ঘোড়ার পা একবারও পিছলায় না কিন্তু একবার পিছলোলে আর রক্ষা নেই, কারণ পরমুহূর্তে তোমাকে নেমে যেতে হবে হাজার-হাজার ফুট নীচে কোথায় কোন অতলে। ইহলোক থেকে একেবারে পরলোকে।
একদিন দুপুরবেলায় নিশ্চিন্তভাবে এগিয়ে চলেছি, নির্মেঘ আকাশ পরিপূর্ণ রৌদ্রে ঝলমল করছে, আচম্বিতে দূরে জাগলে ঘনঘোর মেঘগর্জন!
আমার বিস্মিত মুখের পানে তাকিয়ে গাইড হাসতে-হাসতে বললে, বাবুজি, ও মেঘের ডাক নয়।
তবে?
পাহাড় ভেঙে পড়ছে।
এদেশে প্রায়ই পাহাড় ভেঙে পড়ে নাকি?
প্রায়ই। লোকজন হামেশাই মারা পড়ে। সময়ে-সময়ে গ্রামকে গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়।
এই হিংস্র পাহাড়ের দেশে মানুষদেরও প্রকৃতি রীতিমতো বন্য। আমরা যে সোয়াট ও ডির দেশ পিছনে ফেলে এসেছি, সেখানকার মুসলমানদের ধর্মোন্মাদ ভয়ংকর। বিধর্মীদের হত্যা করা বলতে তারা বোঝে, স্বর্গে যাওয়ার রাস্তা সাফ করা।
