সোয়াট আর ডির দেশের মধ্যে মারামারি হানাহানি লেগেই আছে। লড়তে মারতে ও মরতে তারা ভালোবাসে রক্ত ও মৃত্যু যেন তাদের প্রিয় বন্ধু!
একদিন যেতে-যেতে দেখি এক জায়গায় দুই দল করছে মারামারি। বন্দুক গর্জন করছে, বনবন লাঠি ঘুরছে আর ঝকমক জ্বলছে তরবারি! দস্তুরমতো যুদ্ধ। মাটিতে পড়ে কয়েকটা আহত দেহ ছটফট করছে এবং কয়েকটা দেহ একেবারে নিস্পন্দ–অর্থাৎ এ জীবনে তারা আর নড়বে না।
কিন্তু তাদের কেউ তখন বিধর্মী বধ করে স্বর্গের রাস্তা পরিষ্কার করবার জন্যে আগ্রহ। দেখালে না, বরং আমাদের দেখে অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আমাদের গাইড ভয়েভয়ে তাদের কাছে এগিয়ে গেল। তারপর ছুটে এসে বললে, বাবুজি, এখান থেকে চলে আসুন। পাছে আমরা জখম হই, তাই ওরা লড়াই করতে পারছে না।
মনে-মনে ওদের সুবুদ্ধিকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা তাড়াতাড়ি এগিয়ে চললুম। তারপর রাস্তার মোড় ফিরে একটা পাহাড়ের আড়ালে গিয়ে হইচই শুনেই বুঝলুম, ওদের যুদ্ধ আবার আরম্ভ হয়েছে।
কুমার বললে, এরা লড়াই করছে কেন?
গাইড বললে, এক পয়সার পেঁয়াজের জন্যে!
চিত্রলের পরেই হচ্ছে কাফ্রিস্থান। এদেশটি এখন আফগানিস্থানের আমিরের শাসনাধীন হয়ে মুসলমান প্রধান হয়ে পড়েছে বটে, কিন্তু এখানকার মুসলমানরা খুব বেশি গোঁড়াও নয়, তাদের আচার-ব্যবহারও একেবারে অন্যরকম। কিন্তু এখনও এদেশে পুরোনো কাফিদের এমন এক সম্প্রদায় বাস করে, যারা পৈতৃক রীতিনীতি ও পৌত্তলিকতা বর্জন করেনি। নানান দেবতার কাঠের মূর্তি গড়ে তারা পূজা করে এবং তাদের প্রধান-প্রধান দেবতার নাম হচ্ছে : ইস্র, মণি, গিষ, বাগিষ্ট, আরম, সানরু, সাতারাম বা সুদারাম। ওঁরা হচ্ছেন পুরুষ-দেবতা। দেবীদের নাম দিয়েছে ওরা সঞ্জীরক্তী, দিজোন, নির্মলী ও সুমাই প্রভৃতি। অনুমানে বেশ বোঝা যায়, এদের দেব-দেবী হচ্ছেন প্রাচীন হিন্দু দেব-দেবীরই রূপান্তর।
কাফ্রিস্থান বলতে বুঝায় কাফির অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের দেশ। বলা বাহুল্য, এ নামটি মুসলমানদের দেওয়া। হিন্দুদের পরে একসময়ে এখানে ছিল চিনাদের প্রভুত্ব। তার কিছু কিছু চিহ্ন আজও পাওয়া যায়। আমাদের চোখের সামনে নাচছে যে গুপ্তধনের স্বপ্ন, তারও মালিক ছিলেন এক চিনা রাজপুত্র। সেই গুপ্তধন আছে এক বৌদ্ধ মঠের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে। সুতরাং এ-অঞ্চলে আগে বৌদ্ধদেরও প্রাধান্য ছিল। তারপর মুসলমানরা বারেবারে আক্রমণ করেছিল কাফ্রিস্থানকে। চেঙ্গিস খাঁ ও তৈমুর লং প্রভৃতি দিগ্বিজয়ীরাও নাকি এদিকে দৃষ্টি দিয়েছিলেন, কিন্তু তাদের কারুর প্রাধান্যই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নিজের চারিদিকে মুসলমান প্রতিবেশী নিয়েও গত শতাব্দী পর্যন্ত কাফ্রিস্থান আপন স্বাতন্ত্র রক্ষা করতে পেরেছিল।
কাফিররা দেখতে সুন্দর। তাদের গায়ের রং প্রায় গৌর, দেহ লম্বা, মুখ চওড়া, চোখ গ্রিকদের মতো। শীতপ্রধান দেশের বাসিন্দা বলে তারা স্নান করতে একেবারেই নারাজ। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হলে তাদের চেহারা যে আরও চমৎকার হত, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই!
কি মুসলমান ও কি পৌত্তলিক কাফির প্রত্যেকেই পরিবারের কেউ মারা পড়লে, গাঁয়ের প্রান্তে নির্দিষ্ট এক ঢালু পাহাড়ের গায়ে উঠে চার পায়াওয়ালা বড় সিন্দুকের ভেতরে মৃতদেহ রেখে আসে। তারা শবদেহ গোর দেয় না। এক-একটি পারিবারিক সিন্দুকের ভেতরে পরে পরে দুটো, তিনটে বা চারটে মৃতদেহও রাখা হয়।
কাফিররা স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে অত্যন্ত নাচের ভক্ত। সামাজিক বা ধর্মসংক্রান্ত যে-কোনও অনুষ্ঠানে তারা নাচের আসর বসায় এবং মেয়ে ও পুরুষরা একসঙ্গে দল বেঁধে সারা রাত ধরে নাচের আমোদে মেতে থাকে। সঙ্গে-সঙ্গে চলে গান ও দামামা। অনেকে দুই আঙুল মুখে পুরে তীব্র স্বরে শিস দেয়। পরিদের ওপরে এদের অগাধ বিশ্বাস। নাচতে নাচতে কেউ-কেউ পরি দেখে দশা পায়। তখন তারা নাকি ভাববাণী ও ভবিষ্যবাণী বলতে পারে! সবাই তাদের কাছে গিয়ে আগ্রহ ভরে এইরকম সব প্রশ্ন করে–এবারে কীরকম ফসল হবে?–এ বছরে গাঁয়ে মড়ক হবে কিনা? –আমার খোকা হবে না খুকি হবে?
পৌত্তলিক কাফিররা মুসলমানদের বিষম শত্রু। এর কারণ বোঝাও কঠিন নয়। মুসলমানরা–অর্থাৎ আফগান প্রভৃতি জাতের লোকেরা চিরদিনই তাদের ওপরে অমানুষিক অত্যাচার করে এসেছে, কাফিররাও তাই সুযোগ পেলেই ছলে-বলে-কৌশলে মুসলমানদের হত্যা করে। কেউ লুকিয়ে গিয়ে ঘুমন্ত মুসলমানকে বধ করতে পারলে কাফির-সমাজে বীর বলে গণ্য হয়। তাদের মাথার পাগড়িতে গোঁজা পালকের সংখ্যা দেখেই বলে দেওয়া যায়, কে কয়জন মুসলমানকে হত্যা করেছে। আমরা যখন কাফ্রিস্থানে গিয়েছিলুম তখনই এ-শ্রেণির মুসলমান। বিদ্বেষী কাফিররা দলে যথেষ্ট হালকা হয়ে পড়েছিল। আজ তাদের সংখ্যা বোধহয় নগণ্য, কারণ ওদেশে মুসলমান ধর্মের প্রভুত্ব বেড়ে উঠেছে অত্যন্ত তাড়াতাড়ি।
কাফিরদের প্রত্যেক গ্রামেই স্থানীয় মৃত ব্যক্তিদের অশ্বারোহী কাঠের প্রতিমূর্তি দেখা যায়। পৌত্তলিক হোক, মুসলমান হোক, পূর্বপুরুষদের প্রতিমূর্তি স্থাপন করা প্রত্যেক কাফিরই কর্তব্য বলে মনে করে। যার যেমন সঙ্গতি, সে তত বড় মূর্তি গড়ায়। কিন্তু এসব হচ্ছে নামেই প্রতিমূর্তি, কারণ দেখতে সব মূর্তিই অবিকল একরকম!
