বাঘার উৎসাহিত গর্জনে কান পাতা দায়! ভাগ্যে কুমার তাকে সজোরে নিজেরই দুই হাঁটুর ভেতরে চেপে, বাঁ হাতে তার বকলস টেনে ধরেছিল, নইলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে শত্রুদের মাঝখানে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত!
কমল আহ্লাদে নৃত্য করতে করতে বললে, জয়, আমাদের জয়! বৎসগণ! ভেবেছিলে ফাঁকতালে করবে কেল্লা ফতে? হু-হু, ঘুঘু দেখেছ ফঁদ তো দ্যাখোনি!
তখনি কমলের একখানা হাত ধরে বিনয়বাবু তার নৃত্যোচ্ছ্বাস থামিয়ে দিলেন।
আমি বললুম, এই হচ্ছে সরে পড়বার সুযোগ! ছোট সবাই ট্রেনের দিকে!
অন্ধকার আর বৃষ্টিধারা কেবল শত্রুদেরই ঢেকে রাখেনি, তাদের আশ্রয় পেয়ে আমরাও নিরাপদে ট্রেনের কাছে গিয়ে পড়লুম।
যাত্রীরা কেউ বাইরে ছিল না। বন্দুক আর রিভলভারের শব্দ লুপ্ত করে দিয়েছে তাদের সমস্ত কৌতূহল। প্রত্যেক কামরার দরজা ও খড়খড়িগুলো বন্ধ করে দিয়ে তারা হয়তো তখন ইষ্টদেবতার নাম জপ করছিল।
আমাদের সঙ্গের সাহেব বললে, ইন্ডিয়া কি ক্ৰমে আমেরিকা হয়ে উঠল! সশস্ত্র ডাকাত এসে ট্রেন আক্রমণ করে, এদেশে এমন কথা কে কবে শুনেছে?
গার্ড বললে, কামরায় গিয়ে ওসব কথা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে! ইঞ্জিন এখনি গাড়িকে পিছনের স্টেশনে নিয়ে যাবে! বলেই সে দ্রুতপদে চলে গেল।
এমন সময়ে হঠাৎ উপরি-উপরি আরও কয়েকবার বন্দুকের আওয়াজ শোনা গেল এবং কাঠফাটা শব্দ শুনে বুঝলুম, একটা গুলি ট্রেনের কোনও কামরার গায়ে এসে লাগল।
ডাকাতরা কি আমাদের উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছে? তারা কি আবার আমাদের আক্রমণ করতে আসছে?
অন্য ক্ষেত্র হলে আমরা এইখানেই দাঁড়িয়ে আবার তাদের উচিতমতো অভর্থনার ব্যবস্থা করতুম। কামরার ভেতরেই আছে আমাদের অটোমেটিক বন্দুকগুলো। তাদের প্রত্যেকটা মিনিটে পঁয়ত্রিশটা গুলি বৃষ্টি করতে পারে। সেগুলো হাতে থাকলে আমরা পাঁচজনে দুইশত শত্রুকেও বাধা দিতে পারি।
কিন্তু সে-সময় পেলুম না। দূর থেকে বেজে উঠল গার্ডের বাঁশি, গাড়ি ছাড়তে আর দেরি নেই! টর্চের আলো ফেলে তাড়াতাড়ি আমাদের কামরা আবিষ্কার করতে বাধ্য হলুম। কোনওরকমে গাড়িতে উঠে পড়বার সময় মাত্র পেলুম।
গাড়ি ছাড়বার সঙ্গে-সঙ্গেই মাঠের ভেতর থেকে ভেসে এল একটা উচ্চ কোলাহল। সে হচ্ছে মুখের গ্লাস পালিয়ে গেল দেখে ডাকাতদের হতাশার চিৎকার! হতভাগারা অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছিল, সমস্তই ব্যর্থ হল।
ট্রেন পিছু হেঁটে চলেছে–তার গতি খুব দ্রুত নয়। আমাদের কামরার ভেতরেও ঘুটঘুট করছে অন্ধকার।
কুমার বললে, ছি রামহরি, ছিঃ! তুমিও ভয়ে আলো নিবিয়ে অন্ধকারে ইঁদুরের মতন লুকিয়ে আছ!
রামহরি কেমন যেন শ্রান্তস্বরে বললে, মোটেই নয় কুমারবাবু, মোটেই নয়। একবার আলো জ্বেলে দ্যাখো না!
কমল আলো জ্বাললে।
বিপুল বিস্ময়ে দেখলুম, কামরার মেঝের ওপরে শুয়ে রয়েছে রামহরি, তার হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধা!
বিস্ফারিত চক্ষে তার দিকে তাকিয়ে বললুম, রামহরি, এ কী ব্যাপার!
ম্লান হাসি হেসে রামহরি বললে, খোকাবাবু, কামরা থেকে তোমরা বেরিয়ে যাওয়ার। পর আমি জানলায় মুখ বাড়িয়ে দাঁড়িয়েছিলুম। ওদিকের জানলা দিয়ে জন তিনেক লোক কখন যে নিঃশব্দে কামরায় ভেতরে ঢুকেছিল, আমি একটুও টের পাইনি। আমার অজান্তেই তারা আমাকে আক্রমণ করলে, আমি কোনওরকম বাধা দেওয়ার ফাঁক পর্যন্ত পেলুম না?
কে তারা? চিনেম্যান।
না, পশ্চিমের লোক, হিন্দুস্থানি।
তারপর?
একটা লোক ছোরা নিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললে, চাঁচালেই মরবি! আর দুটো লোক আমাদের মোটঘাট, সুটকেসগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে লাগল।
ফিরে চারিদিকে তাকিয়ে দেখলুম, আমাদের অধিকাংশ মোটই মেঝেময় ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। প্রত্যেক সুটকেসের তালা খোলা।
রামহরি বললে, ভয় নেই তোমাদের, তারা কিছু নিয়ে যায়নি। তাদের ভাব দেখে মনে হল, তারা যেন কোন বিশেষ জিনিসেরই সন্ধান করছে!
কুমার বললে, তবে কি তারা সাধারণ চোর নয়? তারা কি সেই ধুকধুকিখানার লোভেই কামরার ভেতরে ঢুকেছিল?
বিনয়বাবু বললেন, ধুকধুকিখানা তো চিনেম্যানদের সম্পত্তি। আর রামহরি বলছে যারা এসেছিল, তারা হচ্ছে হিন্দুস্থানি।
আমি রামহরির হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতে দিতে বললুম, বিনয়বাবু, এই চিনে ডাকাতেরা বড় সহজ লোক নয়। তারা বেশ জানে, ভারতে এসে কাজ হাসিল করতে গেলে এদেশি লোকের সাহায্য না নিলে চলবে না। কারণ, কোনও ছদ্মবেশই চিনেদের মঙ্গোলীয় ছাঁচ ঢাকতে পারবে না, ভারতীয় জনতার মধ্যে তাদের দেখলেই সকলে চিনে ফেলবে। কাজেই তারা এদেশি গুন্ডাদেরও সাহায্য নিয়েছে। তাদের দলের লোক নিশ্চয় ট্রেনের মধ্যে ছিল, আমরা কামরা ছাড়বার পরেই সুযোগ পেয়ে এসেছিল রামহরির সঙ্গে আলাপ করতে।
বিনয়বাবু বললেন, তাহলে বোঝা যাচ্ছে, এবার থেকে আমাদের দেশি-বিদেশি দুরকম শত্রুর সঙ্গেই যুঝতে হবে? ব্যাপারটা ক্রমেই সঙ্গিন হয়ে উঠছে যে!
কুমার বললে, উঠুক–আমরা থোড়াই কেয়ার করি। কিন্তু রামহরি, তোমার গল্পের শেষটা এখনও তো শোনা হয়নি।
রামহরি উঠে বসে গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললে, গল্পটা আরও কিছু বড় হতে পারত, কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ শেষ হয়ে গেল তোমাদের জন্যেই।
আমি বললুম, আমাদের জন্যেই?
হ্যাঁ গো খোকাবাবু, হ্যাঁ। কামরার আলো নিবিয়ে টর্চের আলোয় তারা একমনে খোঁজাখুঁজি করছে, এমন সময়ে বাইরে থেকে এল তোমাদের সাড়া। গার্ডের বাঁশিও শোনা গেল–সঙ্গে সঙ্গে কামরার ভেতর থেকে তারাও তাড়াতাড়ি সরে পড়ল। আর আমার কথাও ফুরোল।
