তা এখানটা পড়তে তোমাদের যতই ভালো লাগুক না কেন, ব্যাপারটা তখন আমার মোটেই ভালো লাগছিল না। লণ্ঠনটা মাটির ওপরে রাখলুম। টর্চটা কোমরবন্ধ থেকে খুলে পথের দু-পাশের ঝোপঝাড়ের ওপরে আলো ফেলে পরীক্ষা করতে লাগলুম। হঠাৎ এক জায়গায় টর্চের আলো পড়তেই আমি চমকে উঠলুম!
কী ও-দুটো? একটা আঁকড়া ঝোপের ভিতর থেকে দুটো অগ্নিময় গোলা আমার পানেই তাকিয়ে আছে! দুটো হিংসা ও ক্ষুধা ভরা জুলন্ত ও ভয়ানক চক্ষু!
ও-দুটো সিংহের, না ব্যাঘ্রের চক্ষু? যার চক্ষুই হোক, আমি আর এক মুহূর্তও নষ্ট করলুম না, তাড়াতাড়ি বন্দুক এগিয়ে বাগিয়ে ধরে সেই দুটো অগ্নিগোলকের দিকে উপর-উপরি দুইবার গুলি বৃষ্টি করলুম!
তার পরেই ভয়ংকর এক আর্তনাদ–পৃথিবীর কোনও সিংহ ব্যাঘ্রই সেরকম আর্তনাদ করতে পারে না। এবং পরমুহূর্তেই একটা অদ্ভুত শব্দ হল–যেন পিপের মতন কী একটা বড় জিনিস গড়গড় করে ক্রমেই দূরে চলে যাচ্ছে!
এবং সঙ্গে-সঙ্গেই জঙ্গলের ভিতর থেকে কারা যেন অসংখ্য কণ্ঠে অমানুষিক স্বরে চিৎকার করতে লাগল–সেই সমস্বরের অপার্থিব চিৎকার শুনলে অতিবড় সাহসীরও বুকের রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায়, মানুষের কান তেমন চিৎকার কোনওদিন শোনেনি!
কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতন ভাবছি,কারা ওরা, অমন চিৎকার করতে পারে এমন কোনও জীব এই পৃথিবীতে আছে?–ঠিক সেই সময়ে আবার যে কাণ্ডটা হল, তাতে আমার সমস্ত বুদ্ধি শুদ্ধি যেন একেবারেই লোপ পেয়ে গেল!
আমি দাঁড়িয়েছিলুম পথের মাঝখানে। সেখান থেকে সামনের জঙ্গল ছিল প্রায় দশ বারো হাত তফাতে। জঙ্গলের ভিতর থেকে যদি কোনও জন্তু আমাকে আক্রমণ করতে আসে, তবে তাকে এই দশ-বারো হাত জমি আমার চোখের সামনে পার হয়ে আসতে হবে!
কিন্তু হঠাৎ জঙ্গলের ভিতর থেকে মোটা সাপের মতন কী-একটা বিদ্যুদবেগে শূন্যপথে উড়ে আমার বাঁ-হাতের ওপরে এসে পড়ল, আমার বন্দুকটা তখনই সশব্দে পথের ওপরে ঠিকরে পড়ে গেল এবং তার পরেই কে যেন বজ্রমুষ্টিতে আমরা হাত চেপে ধরে আমাকে জঙ্গলের দিকে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যেতে লাগল!
প্রথমটা আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলুম! তারপর কতকটা সামলে নিয়ে সেই বজ্রমুষ্টি থেকে ছাড়ান পাবার চেষ্টা করলুম কিন্তু পারলুম না! তারপর প্রায় যখন জঙ্গলের কাছে গিয়ে পড়েছি, তখন আমার মাথায় বুদ্ধি জাগল! আমার ডান হাত তখনও মুক্ত ছিল, ক্ষিপ্র হাতে কোমরবন্ধ থেকে রিভলভারটা বার করে নিয়ে আবার বার-তিনেক গুলিবৃষ্টি করলুম এবং অমনি আমার বাঁ-হাতের ওপর থেকে সেই বজ্রমুষ্টির বাঁধনটা খুলে গেল!
অমন দশ-বারো হাত জমি পেরিয়ে সেটা যে কী এসে আমার হাত ধরলে ও ছেড়ে দিলে, কিছুই আমি ভালো করে বুঝতে বা দেখতে পেলুম না, কারণ তখন আমি বিস্ময়ে হতভম্ব ও আতঙ্কে অন্ধের মতন হয়ে গিয়েছি!
ভালো করে কিছু বোঝবার বা দেখবার ভরসাও আর হল না,–যে পথে এসেছিলুম। আবার তিরের মতন সেই পথেই ছুটতে লাগলুম আমার তাবুর দিকে! পিছনে তখনও বহু কণ্ঠে সেই অমানুষিক চিৎকার বনজঙ্গল, আকাশ-বাতাস কাঁপয়ে তুলছে!
সে চিৎকার বোধ হয় আমার তাবুর লোকেদেরও কানে গিয়েছিল কারণ উধ্বশ্বাসে ছুটতে ছুটতে তাবুর কাছে এসে দেখি, আমার কাফ্রিকুলিরা আগুনের চারিপাশে ভয়বিহ্বলের মতন দাঁড়িয়ে গোলমাল করছে!
আমাকে অমন ঝড়ের মতন বেগে ছুটে আসতে দেখে কুলিরা বোধহয় স্থির করলে যে, যাদের ভয়ে আমি পালিয়ে আসছি, তারাও হয়তো আমার পিছনে পিছনেই ছুটে আসছে! তারা কী ভাবলে ঠিক তা জানি না, তবে আমাকে দেখেই কুলিরা একসঙ্গে আর্তনাদ করে উঠে যে যেদিকে পারলে পলায়ন করলে! তারপর তাদের আর কারুরই দেখা পাইনি!
কুলিদের কাপুরুষ বলে দোষ দিতে পারি না। আমি আজ স্বচক্ষে যা দেখলুম হয়তো তারাও এর আগেই তার কিছু কিছু দেখেছে বা শুনেছে! সে রাতটা তাবুর ভিতরে বসে দুশ্চিন্তায়, আতঙ্কে ও অনিদ্রায় যেভাবে কেটে গেল, তা জানি খালি আমি এবং আমার ভগবানই! পরের দিন সকালেই এই অভিশপ্ত দেশ ত্যাগ করলুম। আমার দামি বন্দুক আর লণ্ঠনটা নদীর ধারে পথেই পড়ে রইল। দিনের আলোতেও এমন সাহস হল না যে, ঘটনাস্থলটা আর একবার পরীক্ষা করে নিজের জিনিস আবার কুড়িয়ে নিয়ে আসি! বিপদেই মানুষের চরিত্র বোঝা যায় বটে, কিন্তু বিপদেরও একটা সীমা আছে তো? বিপদকে ভালোবাসলেও সাঁতার না জেনে কে জলে ঝাঁপ দিতে যায়?
ডায়ারিতে যা লেখা আছে, আমি এইখানে উদ্ধার করে দিলুম। কাহিনিটি তোমরাও শোনো। যদি বিশ্বাস করতে ইচ্ছা না হয়, তবে অবিশ্বাস কোরো।
ডায়ারির লেখক তার গল্পটিকে বেশ গুছিয়ে বলেছেন। আমি তার কোনও কথাই বাদ দিইনি, কেবল সকলের সুবিধার জন্যে গল্পটিকে কয়েকটি পরিচ্ছেদে ভাগ করে দিলুম।
.
পঞ্চম। ডায়ারির গল্প শুরু হল
কুলিদের কথা যে সত্য, সে বিষয়ে আর কোনওই সন্দেহ নেই।
অসম্ভবও যে সম্ভব হয়, স্বচক্ষে আমি তা দেখেছি। আমার যদি যথেষ্ট মনের জোর থাকত না, তাহলে এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমি বদ্ধপাগল হয়ে যেতুম।
সময়ে-সময়ে নিজেরই সন্দেহ হয়েছে যে, আমি কোনও বিদঘুঁটে স্বপ্ন দেখছি না তো? কিন্তু সেই অদ্ভুত দেশে গিয়ে আমি যে সব ছবি এঁকেছিলুম, সেগুলো এখনও আমার কাছে রয়েছে। ছবিগুলো তো আর স্বপ্ন হতে পারে না!
