আমি হেসে বললুম, মোটেই নয়! গার্ড-সাহেবের পিছু পিছু আমি পলায়ন করতে চাই!
কুমার বললে, যঃ পলায়তি স জীবতি! সেকালে কোন বুদ্ধিমান বাঙালিও বলে গেছেন, আপনি বাঁচলে বাপের নাম। আমরা হচ্ছি পিতৃভক্ত পুত্র, বাপের নাম করবার সুযোগ পাব বলেই পৈত্রিক প্রাণটা রক্ষা করা দরকার।
আমি বললুম, কিন্তু কুমার, বাঘা বোধহয় পশু বলেই পৈতৃক প্রাণের মর্যাদা বোঝে না। ওই দ্যাখো, সে আবার বনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
বাঘা খালি এগুচ্ছে না, উচ্চস্বরে ঘেউ-ঘেউ চিৎকারও করছে। তার ওরকম চিৎকারের অর্থ আমরা বুঝি। মানুষের পক্ষে অসাধারণ বাঘার পশুদৃষ্টি তিমির-যবনিকা ভেদ করে নিশ্চয়ই কোন শত্রু আবিষ্কার করেছে।
বাঘা ফিরতে রাজি নয় দেখে কুমার দৌড়ে গিয়ে তার বকলস চেপে ধরলে। কিন্তু তবু সে বাগ মানতে চাইলে না বারবার জঙ্গলের দিকে ফিরে ফিরে দেখে আর কুমারের হাত ছাড়াবার জন্যে টানাহ্যাঁচড়া করে। তার ক্রুদ্ধ চোখদুটো জ্বলছে আগুনের ভাটার মতো।
ওদিকে তাকিয়ে আমি কিন্তু খালি দেখলুম, বৃহৎ বৃহৎ বৃক্ষ বাহু আকাশে আন্দোলিত করে জঙ্গলে করছে মর্মর-হাহাকার। তবে এ সন্দেহটা বারংবারই মনের মধ্যে জাগতে লাগল যে, ওই অন্ধকার কেল্লার ভেতরে যারা গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, আমাদের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তারা একটুও অচেতন নয়–ঝোপঝাড়ের ফাঁকে-ফাঁকে নিশ্চয়ই জাগ্রত হয়ে আছে তাদের হিংস্র চক্ষুগুলো।
গার্ড বললে, আর দেরি নয়, সবাই ফিরে চল!
কমল আপশোশ করে বললে, হায় রে হায়, একটা নতুন অ্যাডভেঞ্চার একেবারেই মাঠে মারা গেল!
খাপ্পা হয়ে বিনয়বাবু বললেন, চুপ, চুপ! একে মনসা, তায় ধুনোর গন্ধ!
হঠাৎ বাঘা জঙ্গলের দিকে চেয়ে একেবারে যেন হন্যে হয়ে চেঁচিয়ে উঠল–কুমার আর তাকে ধরে রাখতে পারে না!
গার্ড আশ্চর্য হয়ে বললে, কুকুরটা হঠাৎ এমন করছে কেন?
তার প্রশ্নের উত্তর এল জঙ্গলের দিক থেকে। আচম্বিতে অন্ধকার রাত্রিকে কাঁপিয়ে গুড়ুম গুডুম করে দুইবার বন্দুকের আওয়াজ হল–চোখের ওপরে জ্বলেই নিবে গেল দুটো বিদ্যুতের চমক!
যে কৌতূহলী যাত্রীগুলো আমাদের পিছু নিয়েছিল, তারা সভয়ে প্রাণপণে দৌড় মারলে রেলপথের দিকে, আমাদের চারজনের সঙ্গে দাঁড়িয়ে রইল খালি গার্ড ও একজন সাহেব।
আমি চেঁচিয়ে বললুম, ওই ঝোপের আড়ালে চল–ঝোপের আড়ালে চল!
ঝোপের পাশে গিয়ে গার্ড উত্তেজিত হয়ে বললে, বাবু, বাবু, ওরা কি আমাদের আক্রমণ করতে চায়?
কুমার বললে, করতে চায় কি, আক্রমণ করেছে। ওই দ্যাখো, জঙ্গলের দিক থেকে কতগুলো সাদা কাপড় পরা মূর্তি ছুটে আসছে!
আমি রিভলভার বার করে বললুম, দেখছেন বিনয়বাবু, সঙ্গে কেন যন্ত্র আনতে বলেছিলুম?
কুমার হাসতে-হাসতে বললে, ভাই বিমল, আমাদের পৈতৃক প্রাণগুলো এ যাত্রা শনির দৃষ্টি বুঝি আর এড়াতে পারলে না।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ । রামহরির ধূলিশয্যা
একটা ঝোড়ো দমকা হাওয়া আচমকা জেগে হুঙ্কার দিয়ে উঠলসঙ্গে-সঙ্গে টলোমলো গাছপালাগুলো কেঁদে উঠল আরও বেশি উচ্চস্বরে। তারপরেই আবার এল কেঁপে বৃষ্টি। গড়গড় গড়গড় বাজের ধমক–চকমক ঝকমক বিদ্যুৎ চমক!
একে মেঘে কাজলমাখা রাতের অন্ধকার, তার ওপরে সেই ঘন বৃষ্টিধারার পরদা। চোখ আর এদের ভেদ করে এগিয়ে যেতে পারল না। শত্রুরাও নিশ্চয় এখন আমাদের দেখতে পাচ্ছে না।
যে সাহেবটা শত্রুদের বন্দুকের ভয়ে পালায়নি সে বললে, বাবু, এখন আমাদের কর্তব্য কী?
আমি জিজ্ঞাসা করলুম, তুমি কি নিরস্ত্র?
না, আমার কাছে রিভলভার আছে।
তাহলে এই ঝোপের আড়ালে আমাদের মতো হাঁটু গেড়ে বসে পড়ো। শত্রুদের আমাদের রিভলভারের নাগালের ভেতরে আসতে দাও। তাদের বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে, আমরা নিতান্ত অসহায় নই।
গার্ড বললে, কিন্তু শত্রুদের কারুকেই তো দেখা যাচ্ছে না! তারা–
তার মুখের কথা শেষ হতে-না-হতেই আবার শোনা গেল দুটো বন্দুকের শব্দ! কিন্তু সে হচ্ছে লক্ষ্যহীনের বন্দুক, গুলি যে কোন দিকে ছুটল আমরা তা টেরও পেলুম না।
কুমার বললে, বন্দুকের শব্দ খুব কাছে এসে পড়েছে! ওরা বন্দুক ছুঁড়ছে আমাদের ভয় দেখাবার জন্যে!
বিনয়বাবু বললেন, এই সুযোগে দৌড়ে আমাদের গাড়ির দিকে যাওয়া উচিত।
কুমার বললে, পিছনে সশস্ত্র শত্রু নিয়ে গাড়ির দিকে দৌড়োতে গেলে বিপদের সম্ভাবনা আছে।
অন্ধকার বিদীর্ণ করে আকাশের বুকে জ্বলে উঠল একটা সুদীর্ঘ বিদ্যুৎ এবং তারই আলোকে দেখা গেল, খানিক তফাতে একদল লোক দ্রুতপদে অগ্রসর হচ্ছে।
গার্ড এস্ত স্বরে বললে, ওরা ট্রেনের দিকে যাচ্ছে–ওরা ট্রেনের দিকে যাচ্ছে! ওরা ভেবেছে আমরা আর এখানে নেই!
বিনয়বাবু বললেন, কী সর্বনাশ! ওরা কি ট্রেন আক্রমণ করতে চায়?
কুমার বললে, বিমল, বিমল! ওদের দেখা যাচ্ছে! ওদের নাগালের মধ্যে পেয়েছি!
আমি বললুম, ছোড়ো রিভলভার!
প্রায় একসঙ্গে আমাদের পাঁচটা রিভলভার গর্জন করে উঠল–এবং পরমুহূর্তেই জাগল একটা বিকট আর্তনাদ!
আবার ডাকল বাজ–আবার জ্বলল বিদ্যুৎ-শিখা! এবং আবার গর্জন করলে আমাদের রিভলভারগুলো।
কমল চেঁচিয়ে উঠল, ওরা পালাচ্ছে–ওরা পালাচ্ছে।
আমি বললুম, আবার ছোড়ো রিভলভার!
আমাদের পাঁচটা রিভলভার আর একবার চিৎকার করে উঠল।
রাত্রের শরীরী অভিশাপের মতন অস্পষ্ট মূর্তিগুলো আবার মিলিয়ে গেল অন্ধকার ও বৃষ্টিধারার অন্তঃপুরে।
