আমি এ তর্কে যোগ দিলুম না। আমি তখন ভাবছিলুম, ঘটনাস্থলে অদৃশ্য অপরাধী কোনও চিহ্ন রেখে গেছে কি না? বিজলিমশালের আলো ফেলে রেলপথটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগলুম। সেখানে পাথর-ভাঙা নুড়িগুলোর ওপরে কোনও চিহ্নই নেই! উঁচু বাঁধের ঢালু গায়ে রয়েছে ঘাসের আগাছার আবরণ। সেখানেও কিছু পেলাম না। আঁধার রাত্রি তখনও টিপটিপ করে বৃষ্টি বর্ষণ করছিল বাঁধের তলায় দেখলুম কর্দমাক্ত জমি। অপরাধীরা নিশ্চয়ই পাখি হয়ে উড়ে পালায়নি। বাঁধের এপাশে কি ওপাশে মাটির ওপরে তাদের কোনও চিহ্নই কি পাওয়া যাবে না? ভাবতে ভাবতে নীচে নামতে লাগলুম। বাঘা আমার অনুসরণ করলে। এরকম কাজ পেলে সে ভারী খুশি হয়, ল্যাজ নেড়ে নেড়ে সেইটেই বোধ করি আমাকে জানিয়ে দিতে চাইলে!
বিনয়বাবু চেঁচিয়ে বললেন, ওকী হে, ওদিকে কোথায় নামছ? শেষটা সাপের কামড়ে মারা পড়বে?
কোনও জবাব দিলুম না। একেবারে সামনের দিকে চেয়ে দেখলুম। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, গোঁ-গোঁ করে ঝড় ডাকছে, অন্ধকার কুঁড়ে দূর অরণ্যের কোলাহল ভেসে আসছে! অদৃশ্য কালো মেঘকে দৃশ্যমান করে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে মাঝে-মাঝে। খানিক তফাতে আঁধারপটে আরও আঁধার রং দিয়ে আঁকা রয়েছে একটা ছোট বন, নীচের দিকে কালি-মাখা ঝোপঝাপ, ওপর দিকে টলোমলো গাছ–যেন কতকগুলো শিকলে বাঁধা দানব মুক্তিলাভের চেষ্টায় ছটফট করছে।
বাঁধের তলাতেই পেলুম আমি যা খুঁজছিলাম! কুমারকে ডাকতেই সে ছুটে নেমে এল।
সে বললে, এ যে অনেকগুলো লোকের পায়ের দাগ! দাগ দেখে মনে হচ্ছে লোকগুলো মাঠের দিকে গিয়েছে!
বাঘা গম্ভীরভাবে সশব্দে মাটি শুঁকতে লাগল! তারপর চাপা গলায় গর্জন করে বোধ করি পলাতক শত্রুদেরই ধমক দিলে।
বাঁধের ওপর থেকে কৌতূহলী গার্ডও নেমে এসে বললে, বাবু, তোমরা কী করছ?
আমি অঙ্গুলিনির্দেশে মাটির দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলুম।
গার্ড খানিকক্ষণ নীরবে দাগগুলো পরীক্ষা করে বললে, দেখছি টাটকা পায়ের দাগ!
বললুম, হ্যাঁ, এদের বয়স বেশিক্ষণ নয়। সেইজন্যেই মনে হচ্ছে এই দাগগুলো অপরাধীদেরই পায়ের। কারণ, এমন দুর্যোগে এতগুলো লোক নিশ্চয়ই এখানে ফুর্তি করে হাওয়া খেতে আসেনি।
গার্ড বললে, বাবু, ওই কুকুরটা মাটির ওপরে কী শুঁকতে-শুঁকতে এগিয়ে যাচ্ছে।
পায়ের চিহ্নর ভেতরে ও শত্রুদের গন্ধ আবিষ্কার করেছে।
গার্ড বিস্মিতস্বরে বললে, ওটা তো দেখছি, দেশি কুকুর, ও আবার পায়ের দাগের কী মর্ম বুঝবে?
কুমার বললে, যত্ন আর শিক্ষা পেলে আমাদের দেশি কুকুর তোমাদের বিলিতি হাউন্ডের চেয়ে কম কাজ করে না। বাঘা শত্রুদের গন্ধ চেনে।
বাঘার সঙ্গে-সঙ্গে আমরাও রেলপথের তারের বেড়া পার হয়ে অগ্রসর হতে লাগলুম। আমাদের পিছনে-পিছনে আসতে লাগল আরও অনেক কৌতূহলী লোক–তাদের ভেতরে সাহেব আছে, বাঙালি আছে, হিন্দুস্থানি আছে।
খানিক পরে একটা ঝোপ। গার্ডকে ডেকে বললুম, এইবারে দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে দ্যাখো।
কী দেখব?
খানিক আগে মুশলধারে বৃষ্টি পড়ছিল বলে পায়ের ছাঁচগুলো ছিল জলে ভরতি! কিন্তু এখানকার পায়ের ছাঁচ ভিজে হলেও জলে ভরতি নয়।
তাতে কী বোঝায়?
এই বোঝায় যে অপরাধীরা একটু আগেই ঝোপের আড়ালে ছিল দাঁড়িয়ে। বোধ হয়। অপেক্ষা করছিল ট্রেনখানা ওলটাবার জন্যে। কিন্তু ট্রেন রক্ষা পেয়েছে আর আমরা আসছি দেখে তারা চটপট সরে পড়েছে।
বাবু, তোমার যুক্তি বুঝলুম না।
মুশলধারার পর যখন টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয় অপরাধীরা তখনই এখান থেকে পালিয়েছে। তাই এখান থেকে যেসব পায়ের ছাপ শুরু হয়েছে তাদের ভেতরটা এখনও জলে পূর্ণ হওয়ার সময় পায়নি।
গার্ড বললে বাবু, তুমি কি পুলিশে কাজ করো?
না।
তবে তুমি এমন তীক্ষ্ণদৃষ্টি পেলে কেমন করে?
ভগবান দিয়েছেন বলে। ভগবান সবাইকে চক্ষু দেন বটে, কিন্তু সকলকেই তীক্ষ্ণদৃষ্টি দেন না।
গার্ড বললে, ঠিক বাবু, তোমার কথা আমি স্বীকার করি। পায়ের দাগগুলো আমিও দেখেছি, কিন্তু বুঝতে পারিনি। অথচ এখন তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, এটুকু আমার অনায়াসেই বোঝা উচিত ছিল। বাবু, তুমি আর কিছু বুঝতে পেরেছ?
এখান থেকে প্রায় দুশো গজ তফাতে একটা জঙ্গলের আবছায়া দেখা যাচ্ছে। পায়ের দাগগুলো ওইদিকেই গিয়েছে। অপরাধীরা নিশ্চয় ওই জঙ্গলের ভেতরে লুকিয়ে আছে।
কুমার বললে, এখন আমরা কী করব? ওইদিকে যাব?
গার্ড বললে, না, এখন আমাদের ফিরতে হবে।
কেন?
আমার ওপরে রয়েছে অপরাধী গ্রেপ্তার করার চেয়েও বড় কর্তব্যের ভার। রেললাইন ভেঙেছে, এই খবর দেওয়ার জন্যে আমাকে এখন গাড়ি নিয়ে পিছনের স্টেশনে ফিরে যেতে হবে। নইলে কোনও ডাউন-ট্রেন এসে পড়লে বিষম দুর্ঘটনার সম্ভাবনা, আর সেজন্যে দায়ী হব আমিই।
গার্ডের কথা সত্য। তার ওপরে আমরা ঠিক প্রস্তুত হয়েও আসিনি, সঙ্গে যে লোকেরা রয়েছে তারা হয়তো এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ওই অচেনা জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতে ভরসা করবে না। আর এমন রাতে অপরাধীদের খুঁজতে যাওয়াও হবে হয়তো বুনো হাঁসের পিছনে এলোমেলো ছুটোছুটি করার মতো। খুব সম্ভব তাদের খুঁজে পাব না, আর খুঁজে পেলেও ছুন-ছিউ ও তার দলবলকে গ্রেপ্তার করা বড় চারটি খানিক কথা নয়! হয়তো তারা দলে ভারী আর সশস্ত্র।
বিনয়বাবু বললেন, ওহে বাপু বিমল! চুপ করে ভাবছ কী? গোঁয়ারতুমি করবার ইচ্ছে হচ্ছে বুঝি?
