রাত্রে খাওয়াদাওয়া সেরে গল্প করতে করতে আমরা ঘুমিয়ে পড়লুম। জেগে রইল কেবল রামহরি। রেলগাড়িতে তার ঘুম হয় না।
কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলুম জানি না, আচম্বিতে জেগে উঠেই অনুভব করলুম বিষম এক বেদনা। তারপরেই বুঝলুম, বিছানার ওপর থেকে ছিটকে নীচে পড়ে গিয়েছি।
রামহরি, কুমার, কমল ও বিনয়বাবুর দেহও নীচে পড়ে ছটফট করছে এবং বাঘা করছে প্রাণপণে চিৎকার!
হতভম্বের মতো উঠে বসেই আর এক সত্য উপলব্ধি করলুম। ট্রেন চলছে না–ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে বাইরের দৃশ্য বিলুপ্ত। সঙ্গে সঙ্গে শুনতে পেলুম বহুলোকের চিৎকার।
বিনয়বাবু চেঁচিয়ে বললেন–অ্যাক্সিডেন্ট, অ্যাক্সিডেন্ট!
রামহরি চাঁচাল, হে মা কালী, হে বাবা মহাদেব!
কুমার বললে, বিমল, বিমল, তোমার কপাল দিয়ে রক্ত পড়ছে।
আমি তাড়াতাড়ি জানলার কাছে গিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, ঝুপ-ঝাঁপ করে বৃষ্টি পড়ছে এবং গাড়ি যেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পাশেই আবছায়ার মধ্যে দেখা যায় একটা উঁচু পাহাড়।
দূরে গাড়ির বাইরে ছুটোছুটি করছে কতকগুলো আলো–গোলমাল আসছে সেইদিক থেকেই।
তারপরেই কামরার পর কামরার দরজাগুলো দুমদাম করে খুলে রেলপথের ওপরে নেমে পড়তে লাগল দলে দলে যাত্রী!
ব্যাপার কী?
.
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ । বিপদগ্রস্ত পৈতৃক প্রাণ
এই অস্থানে কেন হঠাৎ গাড়ি থামল? আলো নিয়ে জলে ভিজেই বা অত লোক কেন ছুটোছুটি করছে?
পৃথিবীকে সশব্দ করে অন্ধকার আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরছিল হুড়হুড় এবং কামরার জানলা দিয়ে বেরিয়ে পড়া আলোকরেখার মধ্যে এসে সেই ঝরা জল উঠছিল চকচক করে। কিন্তু দেখতে-দেখতে বৃষ্টির তোড় এল কমে।
আমি তাড়াতাড়ি বর্ষাতি বার করে পরতে লাগলুম।
বিনয়বাবু শুধোলেন, বিমল, তুমি কি বাইরে যাচ্ছ?
হ্যাঁ, আপনারাও আসুন। কামরায় কেবল রামহরি থাক। বলেই আমি রিভলভারটাও বার করে পকেটের ভেতরে রাখলুম।
ও কি, ওটা নিয়ে আবার কী হবে?
সাবধানের মার নেই।
কুমার জিজ্ঞাসা করলে, বাঘা আমাদের সাজগোছ দেখে কীরকম উত্তেজিত হয়েছে দ্যাখো! ওকেও সঙ্গে নেব নাকি?
নিতে চাও, নাও।
সবাই সশস্ত্র হয়ে কামরা ছেড়ে বাইরে গিয়ে যখন দাঁড়ালুম, তখন ট্রেনের প্রত্যেক কামরা থেকে ভীত যাত্রীরা বেরিয়ে এসে প্রকাণ্ড জনতা সৃষ্টি করেছে। ট্রেনের অনেক কামরার ভেতর থেকে আর্তনাদ ও শিশুদের কান্নাও শোনা যাচ্ছে; অত্যন্ত আচমকা ট্রেনের গতি রুদ্ধ হওয়াতে হয়তো বহু লোক চোট খেয়েছে অল্পবিস্তর।
দূরের আলোকগুলো লক্ষ করে ভিড় ঠেলে আমরা দ্রুতপদে এগুতে লাগলুম। যথাস্থানে উপস্থিত হয়ে দেখলুম ট্রেনের ড্রাইভার, গার্ড ও আরও কয়েকজন কর্মচারী রেললাইনের ওপরে হেঁট হয়ে দাঁড়িয়ে কী পরীক্ষা করছে।
সেই সময়ে এক সাহেব যাত্রী এসে প্রশ্ন করাতে গার্ড বললে, কারা এখানে গাড়ি উলটে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এই দেখুন, লাইনের দুখানা রেল একেবারে খুলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে! ভাগ্যে ড্রাইভার সতর্ক ছিল, তাই ব্রেক কষে কোনওরকমে শেষ মুহূর্তে গাড়ি থামিয়ে ফেলতে পেরেছে!
রেলপথের দিকে তাকিয়ে দেখে গা শিউরে উঠল! ট্রেন থেমে পড়েছে লাইনের ভাঙা অংশের মাত্র হাত কয়েক আগে! চালক যদি দেখতে না পেত বা একটু অন্যমনস্ক থাকত, তাহলে এই শত-শত পুরুষ, স্ত্রী ও শিশুতে পরিপূর্ণ দ্রুতগামী মেল ট্রেনের অবস্থা যে কী ভয়ানক হত, সেটা ভাবলেও স্তম্ভিত হয়ে যায় বুক!
অনেকে কৃতজ্ঞতায় উচ্ছ্বসিত হয়ে ছুটে গিয়ে সাদরে ড্রাইভারের করমর্দন করে তাকে ধন্যবাদ দিতে লাগল!
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সে ধন্যবাদের পাত্র! তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ না হলে এতক্ষণে হয়তো আমাদের সমস্ত সম্পর্ক লুপ্ত হয়ে যেত মাটির পৃথিবীর সঙ্গে। বেঁচে থাকলেও হয়তো হাত বা পা হারিয়ে চিরজীবনের মতো পঙ্গু হয়ে দিন কাটাতুম–মৃত্যুর চেয়ে সে অবস্থা ভয়ংকর।
কুমার বললে, বিমল এ কাজ কার? এর মধ্যে ছুন-ছিউর হাত নেই তো?
গোলমালে ছুন-ছিউর কথা ভুলে গিয়েছিলুম, কুমারের মুখে তার নাম শোনাবামাত্র আমার সারা মন চমকে উঠল।
বিনয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, না, না, অসম্ভব!
কুমার বললে, অসম্ভব কেন? সে যে আমাদের ভোলেনি, গেল কালই তার প্রমাণ পেয়েছি! কে বলতে পারে, আমাদের গতিবিধির ওপরে সে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখেনি? হয়তো কাল যখন আমরা গাড়ি রিজার্ভ করতে স্টেশনে এসেছিলুম, তখনও তার চর ছিল আমাদের পিছনে পিছনে। টিকিটঘর থেকেই আমাদের গন্তব্যস্থানের খোঁজ নেওয়া কিছুই অসম্ভব নয়। হয়তো ছুন-ছিউ ভেবেছিল, ট্রেন দুর্ঘটনায় গাড়িশুদ্ধ নোক যখন হত বা আহত হবে, চারিদিকে যখন ভীষণ বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হবে, তখন সে সদলবলে সেই গোলে-হরিবোলে এসে আবার লকেটখানা উদ্ধার করবে!
বিনয়বাবু বললেন, তোমার আজগুবি কল্পনাকে সংযত করো! তুচ্ছ একখানা লকেটের লোভে ছুন-ছিউর এতখানি বুকের পাটা কিছুতেই হতে পারে না।
কেন হতে পারে না? ছুন-ছিউ কত বড় গোঁয়ার, ভেবে দেখুন দেখি! কলকাতার জনতায় ভরা হোটেলে মানুষ খুন করতে তার হাত কাঁপে না, কলকাতার মতো শহরে দিনের বেলায় আমাদের বাড়ি আক্রমণ করতে সে পিছপা হয়নি, কলকাতার পুলিশ-কোর্ট থেকে সতর্ক পাহারা এড়িয়ে সে লম্বা দিয়েছিল–এমন সব দুঃসাহসের কাহিনি আর কখনও শুনেছেন? অদ্ভুত এই চিনে দস্যু! আমার বিশ্বাস সে সব করতে পারে!
