কিন্তু আমরা পুলিশের কাছে লকেটের কথা অস্বীকার করেছি। বলেছি, আমরা লকেট ফকেটের ধার ধারি নাছুন-ছিউ ভুল সন্দেহ করেছে।
তার এই লুকোচুরির মানে বোঝা যায়। ফাঁসিকাঠের ছায়ায় দাঁড়িয়েও সে আজ পর্যন্ত লকেটের আশা ছাড়তে পারেনি। তার বিশ্বাস, লকেটের লেখা ও তার মর্ম এখনও কারুর কাছে ধরা পড়েনি।
বিচার যেভাবে চলছে তাতে বেশ বলা যায় যে ছুন-ছিউর প্রাণদণ্ডই হবে।
এদিকে আমাদের থাকতে হয়েছে অতি সাবধানে। অনুমান করতে পেরেছি, ছুন-ছিউ হাজতে বাস করছে বটে, কিন্তু তার দলের লোকেরা আমাদের ওপরে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখতে ভোলেনি। কেননা আমাদের এ পাড়ায় আজকাল চিনেম্যানদের আনাগোনা হঠাৎ বেড়ে উঠেছে। কেউ খেলনা, কেউ চেয়ার, কেউ কাপড়ের বস্তা বেচতে এসে আমার বাড়ির কড়া নাড়তে থাকে, কিছু কিনব না বললেও সহজে নড়তে চায় না। একদিন একটা চিনেজোঁক চিনেম্যানকে তাড়াবার জন্যে বাঘাকে লেলিয়েও দিতে হয়েছিল! এইসব শুনে পুলিশ আমার বাড়ির দরজায় একজন পাহারাওয়ালা রাখবার ব্যবস্থা করেছে।
হঠাৎ বিনয়বাবু একদিন এলেন অদ্ভুত একটা সংবাদ নিয়ে।
উত্তেজিত মুখে ঘরে ঢুকেই তিনি বললেন, ও হে, আজকের কাগজ পড়েছ?
না।
ছুন-ছিউ হাজত থেকে পালিয়েছে!
বিস্মিত হয়ে বললুম, সে কী! কেমন করে?
কাল আদালত থেকে তাকে হাজতে পাঠাবার জন্যে যখন নীচে নামিয়ে আনা হচ্ছিল, তখন হঠাৎ সে চেষ্টা দৌড় মারে। প্রহরীরা পিছনে তাড়া করে। পথে অপেক্ষা করছিল খুব দ্রুতগামী একখানা বড় মোটর। সে লাফ মেরে তার ওপরে গিয়ে ওঠে, আর গাড়িখানা যেন হাওয়ার আগে উড়ে চলে যায়। পুলিশ তখন অন্য গাড়িতে উঠে পিছনে অনুসরণ করে। খানিকক্ষণ এ-রাস্তায় ও-রাস্তায় ছোটাছুটির পর ছুন-ছিউর গাড়িখানা ধরা পড়ে। তার মধ্যে দুটো চিনেম্যান ছিল, কিন্তু ছুন-ছিউ ছিল না। সে কোন ফাঁকে কোথায় নেমে পড়ে পুলিশের চোখে বেমালুম ধুলো দিয়েছে!
কুমার বললে, এ তো ভারী বিপদের কথা!
বিনয়বাবু বললেন, বিপদ? হুঁ, সমূহ বিপদের সম্ভাবনা। ছুন-ছিউ হয়তো আবার লকেট উদ্ধারের চেষ্টা করবে। সাবধান বিমল, সাবধান!
আমি বললুম, ছুন-ছিউর সঙ্গে আমাদের দেখা হওয়ার সুযোগ হবে, এটাও আমি অনুমান করতে পারছি।
বিনয়বাবু বললেন, লকেটখানা পুলিশের হাতে সমর্পণ করো, সব ঝাট চুকে যাক।
লকেটের কথা অস্বীকার করবার পর আর তা করা চলে না। আমাদের সামনে এখন। খোলা আছে একমাত্র পথ।
কী পথ?
কাফ্রিস্থানে যাত্রা করবার পথ। ছুন-ছিউকে আমরা প্রস্তুত হওয়ার অবসর দেব না। কালকেই আমরা বেরিয়ে পড়ব। ছুন-ছিউ এসে দেখবে, খাঁচা খালি, পাখি নেই।
কুমার উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, ঠিক, ঠিক! উত্তম প্রস্তাব।
বিনয়বাবু বললেন, যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব বটে। কিন্তু তুমি কি মনে করো বিমল, ছুন ছিউ আমাদের সঙ্গ নিতে পারবে না?
জবাব দিতে যাবহঠাৎ ঝনঝন করে জানলায় একখানা শার্সি ভেঙে গেল এবং ঘরের মেঝের ওপর সশব্দে এসে পড়ল একখণ্ড পাথর, তার সঙ্গে সুতো দিয়ে বাঁধা একখানা কাগজ।
সবিস্ময়ে তাকিয়ে আছি, কুমার ছুটে গিয়ে কাগজশুদ্ধ পাথরখানা কুড়িয়ে নিল। তারপর কাগজখানার দিকে চেয়েই বলে উঠল, বন্ধুবর, ছুন-ছিউর চিঠি। ইংরেজিতে লেখা।
এখনও লকেট ফিরিয়ে দাও। নইলে মৃত্যু অনিবার্য!–ছুন-ছি।
কুমার দ্রুতপদে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারপর ফিরে এসে বললে, না রাস্তায় কেউ কোথাও নেই। পাহারাওলা বললে, এখানে সে কোনও চিনেম্যানকে দেখেনি।
আমি বললুম, ছুন-ছিউ এরই মধ্যে আবার জাল ফেলেছে! বেশ আমরাও অপ্রস্তুত নই। কালই আমাদের যাত্রার দিন।
রামহরি নিশ্চয় ঘরের বাহির থেকে সমস্ত শুনছিল। সে চিৎকার করে উঠল, হে মা কালী! হে মা দুর্গে! ও বাবা মহাদেব! খোকাবাবুর দিকে কৃপা কটাক্ষে একটু নিরীক্ষণ কোরো!
বোধ হয় রামহরির বিশ্বাস, খুব জোরে চেঁচিয়ে না ডাকলে সুদুর স্বর্গের দেবদেবীরা মানুষের প্রার্থনা শুনতে পান না!
পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আয়োজন করতে করতে কেটে গেল। এর মধ্যে শত্রুপক্ষ আর কোনও সজাগতার লক্ষণ প্রকাশ করেনি। এমনকী পথের চিনে-জনতা পর্যন্ত একেবারে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে।
বিনয়বাবু বললেন, এ হচ্ছে ঝড়ের আগেকার শান্তি!
কমল বললে, ঝড় উঠলেই বজ্রনাদ করবার জন্যে আমাদের বন্দুকগুলো তৈরি আছে!
বিনয়বাবু বললে, থামো ফাজিল ছোকরা! একফেঁটা মুখে অত বড়-বড় বুলি ভালো শোনায় না।
সন্ধ্যার সময় স্টেশনে যাত্রা করা গেল। আমরা ফার্স্টক্লাস কামরা রিজার্ভ করেছি। মেল ট্রেন। পথে বা স্টেশনে একবারও সন্দেহ হল না যে, আমাদের গতিবিধি কেউ লক্ষ করেছে। স্টেশনের ভিড়ের মধ্যে একখানাও মঙ্গোলীয় ছাঁচের হলদে মুখ নজরে ঠেকল না। গাড়ির প্রত্যেক কামরায় উঁকি মেরে এসেছি। কোথাও সন্দেহজনক কিছুই নেই। আপাতত ছুন। ছিউকে ফাঁকি দিতে পেরেছি ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলুম।
ঘণ্টা দিলে। ট্রেন ছাড়ল।
কুমার বললে, অজানার অভিমুখে আবার হল অভিযান শুরু! সুদূরের যাত্রী আমরা, অদৃষ্ট আমাদের জন্যে আবার কী নতুন উত্তেজনা সঞ্চয় করে রেখেছে, মনে-মনে সেইটেই আন্দাজ করবার চেষ্টা করছি।
কমল আইসক্রিম চুষতে চুষতে বললে, এবারে আমরা অদৃষ্টের ভাণ্ডার লুণ্ঠন করব!
বিনয়বাবু কটমট করে তার দিকে তাকালেন।
