এদিকে শব্দ শুনে চমকে ছুন-ছিউ যেই ভুলে মুখ ফিরিয়েছে, অমনি বাঘা তড়াক করে লাফ মেরে তার রিভলভারশুদু ডান হাতের কবজিতে কামড় মেরে ঝুলে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে আমি ধাক্কা মেরে সামনের টেবিলটা সরিয়ে ছুন-ছিউর চোয়ালের ওপরে দিলুম বিষম এক নক-আউট ব্লো! হঠাৎ গোড়াকাটা গাছের মতো ছুনছিউ সটান লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল ঘরের মেঝের ওপরে!
সমস্ত ব্যাপারটা বলতে এতগুলো লাইনের দরকার হল বটে, কিন্তু এগুলো ঘটতে এক সেকেন্ডের বেশি সময় লাগেনি!
হাতে মুষ্টিযুদ্ধের দস্তানা পরে চোয়ালের ঠিক জায়গায় ঘুসি মারতে পারলে প্রতিপক্ষ তখনি কিছুক্ষণের জন্যে অজ্ঞান হয়ে পড়বেই পড়বে! কিন্তু দস্তানাহীন হাতে চোয়ালের যথাস্থানে ঘুসি মারলেও প্রায়ই দেখা যায়, চোয়াল ভেঙে রক্তাক্ত হয়ে গেলেও এবং কাবু হয়ে পড়লেও প্রতিপক্ষ জ্ঞান হারায়নি!
ছুন-ছিউও জ্ঞান হারাল না। মাটিতে পড়েই সে আবার ওঠবার উপক্রম করছে দেখে আমি তারই হাত থেকে খসে পড়া রিভলভারটা তুলে নিয়ে ধমক দিয়ে বললুম, চুপ করে শুয়ে থাক চিনে-বাঁদর! নড়লেই মরবি–তোকে মারলে আমার ফাঁসি হবে না!
আচ্ছন্ন হতভম্বের মতো আমার হাতের রিভলভারের দিকে তাকিয়ে সে আড়ষ্ট হয়ে রইল।
ফিরে দেখি, বিনয়বাবু, কুমার ও কমলেরও হাতে গিয়ে উঠেছে তিন চিনেম্যানের তিন রিভলভার! রামহরি আনন্দে আটখানা হয়ে হাততালি দিচ্ছে এবং বাঘা ঘেউ-ঘেউ রবে ঘরময় ছুটে নৃত্য করে বেড়াচ্ছে!
বললুম, রামহরি, নিয়ে এসো আরও খানিকটা দড়ি! এই চার বেটার হাত-পা বেঁধে ফ্যালো!
রামহরি তখন আরও দড়ি নিয়ে এসে চিনেম্যানগুলোকে বাঁধতে বসল।
কুমার বললে, একেই ইংরেজিতে বলে টেবিল উলটান! চিনেদের হলদে হাতের রিভলভারগুলোই এসেছে এখন আমাদের বাদামি হাতে।
কমল বললে, দানব-মানব, ভগবান-শয়তান–ছুন-ছিউর হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নেবে কে?–কেড়ে নেবে আমাদের প্রিয়তম বাঘা! দানব-মানব, ভগবান-শয়তানের যা অসাধ্য কুকুর বাঘার এক কামড়ে তা সাধ্য হল!
ছুন-ছিউ রাগে ফুলতে-ফুলতে বললে, তোমরা এখন আমাদের নিয়ে কী করতে চাও?
আমি বলুলম, রামহরি, ও ঘরে গিয়ে থানায় ফোন করে দিয়ে এসো তো!
রামহরি বললে, খোকাবাবু, তুমি আমাকে মনে করো কী? বুড়ো হলেও এখনও ভীমরতি হয়নি–আর লেখাপড়া না জানলেও বুদ্ধিতে আমি তোমাদের কারুর চেয়ে কম নই! এই চার চিনে হনুমানের রকমসকম উঁকি মেরে দেখেই আমি খানিক আগে থানায় ফোন করে দিয়েছি– পুলিশ এসে পড়ল বলে!
বিনয়বাবু উচ্ছ্বসিত স্বরে বললেন, ধন্য রামহরি, ধন্য! আজকের এই নাট্যাভিনয়ে নায়কের ভূমিকায় তোমার কৃতিত্ব দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি।
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ । রাতের আঁধারে
এইবারে বিনয়বাবুকে রাজি করিয়েছি।
তার কাফ্রিস্থানে যেতে নারাজ হওয়ার প্রধান কারণই ছিল, প্রাচীন বৌদ্ধমঠের মধ্যে এখনও যে গুপ্তধন আছে এটা তিনি সত্য বলে মানতে পারছিলেন না। কিন্তু চিনেম্যানগুলোর কাণ্ড দেখে এখন তিনি মত বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। তিনি বুঝেছেন, গুপ্তধনের অস্তিত্ব সম্বন্ধে একেবারে নিশ্চিন্ত না হলে ওই চিনে দুরাত্মার দল এত মরিয়া হয়ে এমন সব সাংঘাতিক বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিতে পারত না।
এখন তিনি বলছেন, ওহে, ওই লকেটের পিছনে সত্যই কোন গুপ্তরহস্য আছে! গুপ্তধনের। লোভ আমি করি না, কিন্তু রহস্যটা কী জানবার জন্যে ভারী আগ্রহ হচ্ছে।
আগ্রহ নেই খালি রামহরির। সে থেকে থেকে বলে, ছি-ছি! বিনয়বাবু, এই বয়েসে কোথায় জপ-তপ আর হরিনাম নিয়ে থাকবেন, তা না করে আপনিও কিনা ওই গোঁয়ার ছোঁড়াগুলোর দলে গিয়ে ভিড়লেন।
বিনয়বাবু যুৎসই জবাব খুঁজে না পেয়ে অসহায়ভাবে ঘাড় নাড়তে থাকেন।
কুমার বলে, ভাংচি দিওনা রামহরি, দল ভাঙাবার চেষ্টা কোরো না। তোমার যদি এতই অমত, তবে থাক না তুমি কলকাতায় পড়ে। আমরা তো মাথার দিব্যি দিয়ে তোমাকে সাধাসাধি করছি না? কী বলিস রে বাঘা?
বাঘা বোধ করি সায় দেওয়ার জন্যেই একবার কুমার আর একবার রামহরির মুখের পানে তাকিয়ে ল্যাজ নাড়তে থাকে।
আরে সমালো, পাজি কুকুর! তুইও ওই দলে? রামহরি রেগে চড় মারতে যায়, বাঘা কুমারের পিছনে গিয়ে আত্মরক্ষা করে।
আমাদের যাত্রার তোড়জোড় চলছে। এতদিনে আমরা বেরিয়েও পড়তুম, কিন্তু যেতে পারছি না কেবল ওই হতভাগা ছুনছিউয়ের জন্যে। এখনও তার বিচার শেষ হয়নি, আর আমরা হচ্ছি সরকার পক্ষের প্রধান সাক্ষী।
পুলিশের তদারকে প্রকাশ পেয়েছে, ছুন-ছিউ হচ্ছে চিনদেশের এক বিখ্যাত ডাকাতসর্দার, তার দলের লোক অনেক। সে যে কবে চিন থেকে ভারতে হাজির হয়েছে এবং তার এই আসার উদ্দেশ্যই বা কী, পুলিশ এখনও তা জানতে পারেনি।
কিন্তু আমরা আন্দাজ করছি, তার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে গুপ্তধন।
পুলিশ আর একটা তথ্য সংগ্রহ করেছে। হোটেলে যে বুড়ো চিনেম্যানটা খুন হয়েছে, সেও নাকি আগে ছুন-ছিউর দলে ছিল। বোধহয় লকেটটা কোন রকমে হাতিয়ে সে দল ছেড়ে সরে পড়ে এবং তারপর ভারতে আসে। তাকে অনুসরণ করে এসেছে ছুন-ছিউ আর তার দলবল।
আমরা স্থির করেছি, ছুন-ছিউ যদি প্রকাশ না করে, তাহলে আমরাও আদালতে লকেটের কথা জাহির করব না।
এখন পর্যন্ত ছুন-ছিউ হাটে হাঁড়ি ভাঙেনি। কেবল এইটুকুই বলেছে, ওই লকেটখানা সে এত পবিত্র বলে মনে করে যে, ওর জন্যে একশোটা নরহত্যা করতেও তার আপত্তি নেই।
