টেবিলের তলায় স্থির হয়ে বসে আছে বাঘা। অন্য কোন কুকুর হলে এতক্ষণে নিশ্চয় গর্জন করে তেড়ে যেত। কিন্তু রিভলভারের সামনে গর্জন করলে বা তেড়ে গেলে যে মহা বিপদের সম্ভাবনা, এটা বুঝতে তার দেরি লাগল না–এমনি শিক্ষিত কুকুর সে!
ছুন-ছিউ হাসতে হাসতে বললে, বাবু কী দেখছ, কী ভাবছ? বুঝতে পারছ তো এ বাড়ির মালিক হচ্ছি এখন আমি?
হতভাগার বাঁদুরে মুখে হাসি দেখে গা যেন জ্বলে গেল। বললুম, ছুন-ছিউ, তোমার রিভলভার নামাও। তুমি ভুলে যাচ্ছ এটা চিনদেশ নয়।
ছুন-ছিউ বললে, না বাবু, ভুলিনি। আমি জানি এটা বাংলাদেশ, আর এখানে বাস করে কাপুরুষ বাঙালিরা।
আমরাও সশস্ত্র হলে একথা বলার সাহস তোমার হত না।
চুপ করো বাবু! তোমার সঙ্গে আমি গল্প করতে আসিনি। কাল হোটেল থেকে তোমরা একটা লকেট চুরি করে এনেছ। ভালো চাও তো সেখানা ফিরিয়ে দাও।
ছুন-ছিউ, তুমি চণ্ডু খেয়ে স্বপ্ন দেখছ। লকেট! সে আবার কী?
আকাশ থেকে খসে পড়বার চেষ্টা কোরো না বাবু! তুমি কি বলতে চাও তোমার কাছে একখানা রূপোর লকেট নেই?
আমার যুক্তি হচ্ছে, চোর ডাকাত খুনেকে ঠকাবার দরকার হলে মিথ্যে কথা বললে পাপ হয় না। অতএব কোনওরকম দ্বিধা না করে বললুম, না। সোনার বা রূপোর বা পিতলের কোনওরকম লকেট-ফকেটের ধার আমি ধারি না।
কুমার মস্ত একটা হাই তুলে বললে, ওহে ছুন-ছিউ, তোমার ছাতা-পড়া দাঁতগুলো দেখে আমার গা বমি-বমি করছে। তুমি দাঁত বার করে আর না হাসলেই বাধিত হব।
বিনয়বাবু টেবিলের ওপর থেকে একখানা বই তুলে নিয়ে খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়তে শুরু করে দিলেন।
কমলও কম দুষ্ট নয়। বললে, ছুন-ছিউ, তুমি একটা লক্ষৌ ঠুংরি শুনবে?
বাঘা যেন নাচারের মতন লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ে সামনের দিকে দুই থাবা বাড়িয়ে দিয়ে তার ওপরে নিজের মুখ স্থাপন করলে কিন্তু তার দৃষ্টি রইল চিনেম্যানদের দিকেই।
ছুন-ছিউ বললে, ওহে বাবু, আমার সঙ্গে রসিকতা করা নিরাপদ নয়। মানুষ খুন করতে আমি ভালোবাসি, চোখে দেখবার আগেই আমি মানুষ খুন করে বসি।
আমি বললুম, কিন্তু চোখে দেখেও তুমি দয়া করে আমাদের খুন করছ না কেন শুনি!
লকেটখানা কোথায় রেখেছ এখনও টের পাইনি বলে।
তাহলে লকেটখানা পেলেই তোমরা আমাদের খুন করবে?
না। তোমরা ভদ্র ব্যবহার করো, আমরাও ভদ্র ব্যবহার করব।
ধন্যবাদ। কিন্তু লকেট আমাদের কাছে নেই।
নেই নাকি? কিন্তু হোটেলে কাল তুমি যখন মরোমরো বুড়ো চ্যাংয়ের গলা থেকে লকেটখানা খুলে নিচ্ছিলে, আমাদের লোক তা দেখেছিল। তারপর তোমাদের পিছু ধরে এসে। আমাদের লোক এই বাড়িখানাও দেখে গিয়েছে। বুঝেছ? আমরা বুনো হাঁসের পিছনে ছুটে এখানে আসিনি!
ঠিক সেই সময়ে দেখলুম, দরজার বাইরে রামহরির মুখ একবার উঁকি মেরেই সাঁৎ করে সরে গেল! আগেই বলেছি, দরজার দিকে পিছু ফিরে তিনটে চিনেম্যান এক সারে দাঁড়িয়েছিল এবং তাদের দিকে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল ছুন-ছিউ। সুতরাং তারা কেউ এই দৃশ্যটা দেখতে পেলে না।
আমি অত্যন্ত আশ্বস্ত হলুম–এবং কুমার ও কমলের মুখ দেখে বুঝলুম, তারাও দেখেছে এই দৃশ্যটা।
বিনয়বাবু হঠাৎ হাতের বইখানা টেবিলের ওপরে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। তাঁর গোঁফদাড়ির ফাঁকে একটুখানি হাসির ঝিলিক ফুটেই মিলিয়ে গেল। হুঁ, বিনয়বাবু তাহলে বই পড়তে-পড়তে চোরা চোখে তাকাতে পারেন।
বাঘা টপ করে উঠে পড়ে একটা ডন দিয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়াল এবং ঘন-ঘন নাড়তে লাগল তার ল্যাজটা।
ছুন-ছিউ আশ্চর্য হয়ে বললে, আরে, আরে, কুকুরটা খামোকা দাঁড়িয়ে উঠে ল্যাজ নাড়তে শুরু করে দিলে কেন?
আমি বললুম, এতক্ষণ পরে ও তোমাকে বন্ধু বলে চিনে ফেলেছে।
ছুন-ছিউ চট করে একবার পিছনদিকটা দেখে নিয়ে বললে, আমার কেমন সন্দেহ হচ্ছে! আমি বিপদের গন্ধ পাচ্ছি! না, আর দেরি নয়! হয় লকেট দাও, নয় মরো! সে রিভলভারটা বাগিয়ে ধরে দুই পা এগিয়ে এল।
কুমার বললে, অতটা এগিয়ে এস না ছুন-ছিউ, অতটা এগিয়ে এস না! তাহলে আমি খপ করে হাত বাড়িয়ে রিভলভারটা কেড়ে নিতে পারি!
ছুন-ছিউ আবার পিছিয়ে পড়ে বললে, কেড়ে নিবি? দানব-মানব, ভগবান-শয়তান– ছুন-ছিউর হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নেবে কে? ওরে, এই বাঙালি-বাবুদের কেউ একটা আঙুল নাড়লেই তোরা গুলি করে তার খুলি উড়িয়ে দিবি, বুঝেছিস?
তারা চারজনে আমাদের এক-একজনের দিকে লক্ষ স্থির করে রিভলভার তুলে ধরলে।
এইবারে সত্য-সত্যই ছুন-ছিউর দুই চক্ষে ফুটে উঠল হত্যাকারীর জ্বলন্ত দৃষ্টি! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে সে বললে, এই আমি তিন গুণছি। এরমধ্যে লকেট না দিলে আর তোদের রক্ষে নেই!..এক..দুই।
ছুন-ছিউ দুই গোনবার সঙ্গে-সঙ্গে দ্বারপথে আবার রামহরির আবির্ভাব। পা টিপে টিপে সে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল–এক গাছা লম্বা, মোটা দড়ির দুই মুখ দুই হাতে ধরে! তারপর সে গাছাকে স্কিপিং দড়ির মতন শূন্যে তুলেই সে একসঙ্গে তিন চিনে-মুর্তির মাথার ওপর দিয়ে ফেলে খুব জোরে মারলে এক প্রচণ্ড হ্যাঁচকা টান! বয়সে রামহরি পঞ্চান্ন পার হলেও এখনও সে শক্তিহীন হয়নি–পরমুহূর্তেই তিন চিনেমূর্তি একসঙ্গে ঠিকরে প্রপাত ধরণীতলে! বিনয়বাবুর সঙ্গে কুমার ও কমলও সেই মুহূর্তেই এক-এক লাফে সেই ভূপতিত দেহ তিনটের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল!
