কুমার বললে, তারপর আরও একটা কথা ভেবে দেখুন, বিনয়বাবু! আপনি ইতিহাসের যে গল্পটা বললেন আমরা কেউই তা জানতুম না। কিন্তু সেই হতভাগ্য চিনেম্যানের কাছ থেকে আমরা যে ধুকধুকিটা পেয়েছি, তার সঙ্গে ওই গল্পের প্রধান কথাগুলো অবিকল মিলে যাচ্ছে। যেমন শা-লোকা, ভাঙা মঠ, কুবের মূর্তি। আপনি বলেছেন, শা-লোকা বা কপিশ মঠ ছিল পাহাড়ের উপত্যকায়, ধুকধুকির লেখাতেও রয়েছে গুপ্তগুহার কথা, আর গুহা থাকে পাহাড়েই। তারপর সেই চিনাম্যান মরবার আগে কি-পিন-এরও নাম করেছিল। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে, যেমন করেই হোক একালের কেউ-কেউ ওই প্রাচীন ঐতিহাসিক গুপ্তধনেরই ঠিকানা জানতে পেরেছে।
বিনয়বাবু ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন, না ভায়া, আমি তোমাদের পথপ্রদর্শক হতে পারব না। তোমরা যতই যুক্তি দেখাও, বুনো হাঁসের পিছনে ছোটবার বয়স আর আমার নেই। তারপর অত লোভও ভালো নয়। ভগবান আমাদের যা দিয়েছেন তাই যথেষ্ট। আবার গুপ্তধনের উদ্দেশে দেশ-দেশান্তরে ছুটাছুটি করা কেন?
বিনয়বাবু আমাদের ভুল বুঝেছেন দেখে আমি আহত স্বরে বললুম, বিনয়বাবু, আপনি তো জানেন, টাকাই আমাদের ধ্যানজ্ঞান নয়! এ-গুপ্তধন হচ্ছে আমাদের ঘর ছেড়ে পথে বেরুবার একটা ওজর বা উপলক্ষ্য মাত্র। গেল জন্মে আমি আর কুমার নিশ্চয়ই বেদুইন ছিলুম শান্ত শ্যামলতার সুখ-স্বপ্নের চেয়ে অশান্ত মরুভূমির বিভীষিকাই আমাদের কাছে লাগে ভালো। দখিন বাতাসের চেয়ে কালবৈশাখীর ঝড়ই আমরা বেশি পছন্দ করি।
এমন সময়ে রামহরি ঘরের ভেতর ঢুকে বললে, খোকাবাবু, চারটে চিনেম্যান এসেছে। এ-বাড়ির বাবুর সঙ্গে দেখা করতে।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, চিনেম্যান? আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়?
কুমার চিন্তিত স্বরে বললে, চিনে হোটেলের কর্তারা নয়তো? হয়তো পুলিশ-হাঙ্গামে পড়ে আমাদের সাক্ষী মানতে এসেছে।
আমি বলুলম, অসম্ভব। তারা আমার ঠিকানা জানবে কেমন করে?
কুমার বললে, তাও বটে!
তাই তো, কে এরা? কেন আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়? কলকাতায় ভদ্র-অভদ্র কোনও চিনেমানের সঙ্গেই তো আমার আলাপ-পরিচয় নেই!
রামহরি বললে, কী গো, ওদের কী বলব?
এখানে আসতে বলল।
রামহরি চলে গেল। ধুকধুকিটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে নিয়ে আমি জামার পকেটে রেখে দিলুম।
ঘরের ভেতরে প্রথমেই যে মূর্তিটা এসে দাঁড়াল তাকে দেখেই চিনতে আমার একটুকুও বিলম্ব হল না। কাল রাত্রে হোটেলে এই লোকটাই ছোরা হাতে করে সেই চিনে বুড়োকে মারাত্মক আক্রমণ করেছিল।
আমি হতভম্বের মতো তার দিকে তাকিয়ে আছি দেখে সে একগাল হেসে ইংরেজিতে বললে, কী বাবু, তুমি কি আমাকে চিনে ফেলেছ? হা-হা-হা-হা–আমরা পুরোনো বন্ধু, কী বলো?
আমি রুক্ষস্বরে বললুম, এখানে তোমার কী দরকার?
বলছি। আগে ভালো করে একটু বসি। তারপর আমার সম্মতির অপেক্ষা না রেখেই সে একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ল। এবং তার আরও তিনজন সঙ্গীও ঘরের ভেতরে ঢুকে দাঁড়িয়ে রইল ঠিক তিনটে পাথরের মূর্তির মতো।
কুমার ক্রুদ্ধস্বরে বললে, তোমরা হচ্ছ হত্যাকারী। এখনি পুলিশে খবর দেব।
প্রথম চিনেম্যানটা আবার একগাল হেসে বললে, বেশ বাবু, তাই দিও। কিন্তু এতটা তাড়াতাড়ি কেন? আগে আমার কথাই শোনো।
আমি বসে-বসে লোকটাকে ভালো করে লক্ষ করতে লাগলুম। আগেও দেখেছিলুম এখনও দেখলুম, মাথায় সে পাঁচ ফুট উঁচু হবে না, কিন্তু তার দেহটা চওড়ায় সাধারণ মানুষের দ্বিগুণ। অসম্ভব চওড়া দেহের ওপরে মঙ্গোলীয় ছাঁচে গড়া মুখ–আমার সামনে বসে আছে যেন মানুষের ছদ্মবেশে বীভৎস একটা ওরাং-উটান!
সে হাসতে হাসতে বললে, বাবু, হোটেলে কাল তুমি আমার মুখের ওপরে যে ঘুসিটা চালিয়েছিলে, আমি এখনও তা ভুলিনি!
আমি বললুম, ও, সেইজন্যেই কি তুমি আজ প্রতিশোধ নিতে এসেছ?
মোটেই নয় বাবু, মোটেই নয়! আমি তোমার ঘুসির তারিফ করি!
জবাব না দিয়ে ভাবতে লাগলুম, লোকটার উদ্দেশ্য কী?
সে বললে, ভগবান আমাকে ঢ্যাঙা করেননি, কিন্তু আমার গায়ে শক্তি দিয়েছেন। এজন্যে ভগবানকে ধন্যবাদ। একহাতে আমি তিন মণ মাল মাথার ওপরে তুলে ষোলো হাত দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারি! কিন্তু আমার মতন লোককেও তুমি এক ঘুসিতে কাবু করেছ! যদিও আমি তোমার জন্যে প্রস্তুত থাকলে এমন অঘটন ঘটত না, তবু তুমি বাহাদুর!
তোমার নাম কি ছুন-ছিউ?
সে চমকে উঠল। তারপর বললে, তাহলে তুমি আমার নাম পর্যন্ত আদায় করেছ? ভালো কথা নয় ভালো কথা নয় বলতে বলতে ধাঁ করে পকেটের ভেতরে হাত চালিয়ে দিয়ে বার করলে একটা রিভলভার।
তার পিছনের তিন মূর্তিও সঙ্গে-সঙ্গেই এক-একটা রিভলভার বার করে ফেললে।
আমাদের চোখের সামনে স্থির হয়ে রইল চার-চারটে রিভলভারের চকচকে নলচে!
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ। রামহরির ভীমরতি হয়নি
ছুন-ছিউ-র রিভলভারটার লক্ষ ঠিক আমার দিকেই!
এভাবে চোখের সামনে রিভলভার তুললে কারুরই মনে স্বস্তি হয় না, আমারও হল না।
কুমার, বিনয়বাবু ও কমলের মুখের পানে একবার আড়চোখে চেয়ে দেখলুম। রিভলভারের মহিমায় তাদের কারুরই ভাবান্তর হয়নি দেখে বিস্মিত হলুম না। আমরা সকলেই একই বিপদ পাঠশালার পাঠ গ্রহণ করেছি বহুবার, রিভলভার দেখেই আর্তনাদ করবার অভ্যাস আমাদের নেই।
ঘরের এদিকে-ওদিকেও একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম। আমাদের পিছনে ঘরের দেওয়াল। আমার ডানপাশে কুমার, বাঁ-পাশে বিনয়বাবু, তার পাশে কমল বসে আছে। আমার সামনেই একটা গোল মার্বেলের টেবিল। তার ওপাশে বসে ছুন-ছিউ এবং তার পিছনে এক সারে দাঁড়িয়ে আছে আর তিনটে চিনেম্যান। তাদের পিছনেই এ ঘর থেকে বেরুবার একমাত্র দরজা। পিছনে হটবার উপায় নেই, চিনেদের এড়িয়ে দরজার দিকে যাওয়াও অসম্ভব। নিজের ঘরেই ফঁদে পড়ে গিয়েছি, পালাবার পথ একবারে বন্ধ।
