বিনয়বাবু কাগজখানার ওপরে চোখ বুলিয়েই সহজ স্বরে বললেন, এ তো দেখছি ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা!
কুমার লাফিয়ে উঠে বললে, ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা? অর্থাৎ যে পদ্ধতিতে অন্ধেরা লেখাপড়া করে?
হ্যাঁ, এই পদ্ধতিতে এক থেকে ছয়টি মাত্র বিন্দুকে নানাভাবে সাজিয়ে বর্ণমালা প্রভৃতির সমস্ত কাজ সারা যায়। আমি অন্ধ না হলেও কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে এ-পদ্ধতিটা শিখে নিয়েছি।
আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, তাহলে লেখাটা আপনি এখনি পড়তে পারবেন?
নিশ্চয়! খুব সহজেই!
কুমার আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে উঠল, জয় বিনয়বাবুর জয়!
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ । ছুন-ছিউ
আমরা সবাই কৌতূহলী চোখে বিনয়বাবুর মুখের পানে তাকিয়ে রইলুম।
ধুকধুকির ডালা খুলে বাঁ-হাতের ওপরে সেখান রেখে বিনয়বাবু আগে সেই emboss করা বিন্দুগুলোর ওপরে ডান হাতের আঙুল বুলিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, এর ওপরে ইংরেজি ভাষায় লেখা রয়েছে–শা-লোকা ও পশ্চিম দিক : ভাঙা মঠ ও কুবের মূর্তি ও গুপ্ত গুহা :–ব্যস, আর কিছু নেই!
আমি খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে কথাগুলো মনে-মনে নাড়াচাড়া করে দেখলুম, তারপর বললুম, বিনয়বাবু, আপনার মতে শা-লোকা, কি-পিন, কা-পিন, কপিশ বলতে এক জায়গাকেই বোঝায়?
আমার মত নয় বিমল, এ হচ্ছে ঐতিহাসিকদের মত।
ওখানে গুপ্তধন আছে, এটাও ঐতিহাসিক সত্য?
একে ঐতিহাসিক সত্য না বলে ঐতিহাসিক গল্প বলা উচিত। এ গল্প বলেছেন বিখ্যাত চৈনিক পরিব্রাজক হুয়েন সাং। ঐতিহাসিকরা গল্পটির উল্লেখ করেছেন মাত্র। অর্থাৎ এর সত্য মিথ্যার জন্যে ঐতিহাসিকরা দায়ী নন।
তাহলে শা-লোকা বা কপিশ মঠের কথাও গল্পের কথা?
না, কা-পিন, কি-পিন, শা-লোকা বা কপিশ–যে নামেই ডাক, ও মঠের ধ্বংসাবশেষ আজও আছে।
উত্তর পূর্ব আফগানিস্থানে
? হ্যাঁ। ও জায়গাটির আধুনিক নাম হচ্ছে কাফ্রিস্থান।
কুমার বললে, কাফ্রিস্থান? ও বাবা, সে যে হিন্দুকুশ পাহাড়ের ওপারে! সেখানেও বৌদ্ধ মঠ, হিন্দু দেবতা কুবের!
বিনয়বাবু বললেন, কুমার, আজকের দিনে ভারতবাসী পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষা পেয়ে নিজেকে সভ্যতায় অগ্রসর হয়েছে বলে মনে করে বটে, কিন্তু স্বদেশ আর স্বজাতি সম্বন্ধে হয়েছে রীতিমতো অন্ধ। তোমাদের শিক্ষাগুরু ইংরেজরা আফগানিস্থানের এপারেই ভারতের সীমারেখা টেনেছে বলে সেইটেকেই সত্য বলে মেনে নেওয়ার কারণ নেই। এক সময় ভারত সম্রাটের সাম্রাজ্য যতদুর বিস্তৃত ছিল ইংরেজরা আজও ততদুর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি। আফগানিস্থান নামে কোন দেশের নাম কেউ তখন স্বপ্নেও শোনেনি। মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত গ্রিকদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন হিন্দুকুশেরও ওপারে। আজ বিলাতি জিওগ্রাফি যাকে আফগানিস্থান বলে ডাকে, তখনকার পৃথিবী তাকে ভারতবর্ষ বলেই জানত, আর সেখানে বাস করত ভারতের হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈনরাই। ওখানে যে বৌদ্ধ মঠ আর হিন্দু দেবতা থাকবে, এ আর আশ্চর্য কথা কি? ভারতের গৌরবের দিনে উত্তরে চিনদেশে, দক্ষিণে জাভা, বালি, সুমাত্রা দ্বীপে আর পূর্বে কাম্বোডিয়া প্রভৃতি স্থানে হিন্দু দেবতাদের যাতায়াত ছিল। তোমরা সত্যিকার ভারতের ইতিহাস পড়ো ভাই, নিজেদের এমন ছোট করে দ্যাখো না!
আমি বললুম উত্তম! তাহলে দু-চার দিনের মধ্যেই আমরা কাফ্রিস্থানে ভারতের পূর্বগৌরব দেখবার জন্যে যাত্রা করব, আর আমাদের পথপ্রদর্শক হবেন আপনিই!
বিনয়বাবু সবিস্ময়ে আমার মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, তোমাদের এই আকস্মিক উৎসাহ অত্যন্ত সন্দেহজনক!
কেন?
বিমল ভায়া, আমাকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা কোরো না, আমি তোমাদের খুব ভালো করেই চিনি! ধুকধুকির ওপরে ব্রেল পদ্ধতিতে লেখা এই অদ্ভুত কথাগুলো আর কা-পিন, কি পিন বা কপিশ মঠ সম্বন্ধে তোমাদের আগ্রহ দেখেই বুঝতে পেরেছি, আবার তোমরা নতুন কোনও অ্যাডভেঞ্চার-এর গন্ধ পেয়েছ! আসল ব্যাপারটা কী বলো দেখি?
আমি তখন হাসতে হাসতে চিনে-হোটেলের ঘটনাটা বর্ণনা করলুম।
সমস্ত শুনে বিমলবাবু হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, বিমল! কুমার! তোমাদের মাথা নিশ্চয় খারাপ হয়ে গিয়েছে।
কেন?
কণিষ্ক ছিলেন দ্বিতীয় শতাব্দীর মানুষ। গুপ্তধনের কথা যদি সত্য বলে মেনে নেওয়াও যায়, তাহলেও আমি বলতে বাধ্য যে, এতকাল পরে সেখানে গিয়ে কিছু পাওয়া যাবে না।
কারণ?
কারণ, ঐতিহাসিক গল্পেই প্রকাশ, প্রাচীন কালেও ওই গুপ্তধনের কাহিনিটি ছিল অত্যন্ত বিখ্যাত, তাই আরও অনেকে তা লাভ করবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু সপ্তম শতাব্দীতেও হুয়েন সাং স্বচক্ষে সেই গুপ্তধন দেখেছিলেন। দ্বিতীয় শতাব্দী থেকে সপ্তম শতাব্দী বড় কম দিনের কথা নয়।
তারপর কত বিদেশি দস্যু দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে ঠিক ওই অঞ্চল দিয়েই ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে, এ কথা ভুলে যাচ্ছ কেন? তারা কি ওই গুপ্তধনের কথা শোনেনি?
না শোনাও আশ্চর্য নয়। তারপর ভারতে কতবার অন্ধযুগ এসেছে। বার বার কত রাজ্যের, কত ধর্মের উত্থানপতন হয়েছে। মঠ গেছে ভেঙে, সন্ন্যাসীরা গেছে পালিয়ে, বিপ্লবের পর বিপ্লবের মধ্যে পড়ে লোকে গুপ্তধনের কথা না ভুললেও ঠিকানা হয়তো ভুলে গিয়েছে। পৃথিবীতে এমন অনেক বিখ্যাত গুপ্তধনের গল্প শোনা যায়, যার কথা সকলেই জানে কিন্তু যার ঠিকানা কেউ জানে না!
