আগ্রহভরে অপেক্ষা করতে লাগলুম।
মিনিট তিনেক পরেই সমুজ্জ্বল মুখে বিনয়বাবু বললেন, মনে পড়েছে, মনে পড়েছে! কিন্তু কি-পিন নিয়ে তোমাদের এমন আশ্চর্য মাথাব্যথা কেন? তোমরা কি আজকাল ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছ?
কি-পিন বা কা-পিন হচ্ছে অনেক শতাব্দী আগেকার নাম। নামটি দিশিও নয়, চিনে। সপ্তম শতাব্দীতে কি-পিন বলতে বোঝাত উত্তর পূর্ব আফগানিস্তানের কপিশ নামে জায়গাকে। তার আগে আর-এক সময়ে ভারত সীমান্তের গান্ধার প্রদেশকেও কি-পিন বলে ডাকা হত। চিনে লেখকরা ভারতের আরও কোন-কোন দেশকে কি-পিন বা কা-পিন নামে জানতেন। তোমরা কোন কি-পিনের কথা জানতে চাও বুঝতে পারছি না। তবে সপ্তম শতাব্দীর কি-পিন সম্বন্ধে বড়-বড় ঐতিহাসিক একটি অদ্ভুত গল্প বলেছেন, তোমাদের ধুকধুকির ওপরে কুবেরের মূর্তি দেখে সেটা আমার মনে পড়ছে।
আমি বললুম, আচ্ছা বিনয়বাবু, আগে গল্পটাই শুনি।
বিনয়বাবু চেয়ারের ওপরে হেলে পড়ে বলতে লাগলেন, এই ঐতিহাসিক গল্প নিয়েও অল্পবিস্তর মতান্তর আছে, ও সব গোলমালের মধ্যে ঢুকে দরকার নেই। চিনা পর্যটক হুয়েন। সাংয়ের ভ্রমণ আর জীবনকাহিনিতে যে গল্পটি আছে, সেইটিই তোমাদের কাছে বলব। ভিনসেন্ট এ, স্মিতের Early History of India নামে বিখ্যাত ইতিহাসেও (২৭৯ পৃ.) এ গল্পটি পাবে। কিন্তু গল্পটি বলবার আগে আমাকে আরও কয়-শতাব্দী পিছিয়ে যেতে হবে।
শক জাতীয় কণিষ্ক তখন ভারত সম্রাট। দ্বিতীয় শতাব্দীর কথা। তখন সারা এশিয়ায় চিনাদের বড় প্রভুত্ব। শকেরা ভারত দখল করেও চিনাদের কর দিতে বাধ্য ছিল। দু-একবার বিদ্রোহ প্রকাশ করেও চিনাদের কাছে তারা সুবিধা করে উঠতে পারেনি। সম্রাট কণিষ্কই সর্বপ্রথমে চিনাদের জাঁক ভেঙে দিলেন। তিনি কেবল কর দেওয়াই বন্ধ করলেন না, তিব্বত ছাড়িয়ে চিনা সাম্রাজ্যের ভেতরে ঢুকে পড়ে দেশের পর দেশ জিতে তবে ফিরে এলেন এবং আসবার সময়ে জামিন স্বরূপ সঙ্গে করে নিয়ে এলেন চিনাদের কয়েকজন রাজপুত্রকে–কেউ-কেউ বলেন, তাদের মধ্যে চিন-সম্রাটের এক ছেলে ছিলেন।
আফগানিস্থানকে সে সময়ে ভারতেরই এক প্রদেশ বলে ধরা হত। চিন রাজপুত্ররা শীতের সময়ে পাঞ্জাবে থাকতেন, আর গরমের সময়ে থাকতেন আফগানিস্থানে, শা–লো– কা নামে বৌদ্ধ হীনযান সম্প্রদায়ের এক মঠে। এই মঠটি ছিল কপিশ পাহাড়ের এক ঠান্ডা উপত্যকায়। একথা বোধহয় না বললেও চলবে যে, তখন পৃথিবীতে মুসলমান ধর্মের সৃষ্টি হয়নি। আফগানিস্থানে তখন বাস করতে হিন্দু আর বৌদ্ধরাই। আজও আফগানিস্থানের চারিদিকে তখনকার বৌদ্ধমঠের বহু ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়।
কিছুকাল পরে চিন-রাজপুত্রদের দেশে ফিরে যেতে দেওয়া হল। যাওয়ার সময়ে তারা শালোকা বা কপিশ মঠকে দান করে গেলেন বিপুল বিত্ত, তাল-তাল সোনা, কাঁড়ি কড়ি মণিমুক্তা! সেকালের সেই ঐশ্বর্যের পরিমাণ একালে হয়তো হবে কোটি-কোটি টাকা! চিন-রাজপুত্ররা কেবল টাকা দিয়েই গেলেন না, ভারতকে শিখিয়ে গেলেন নাসপাতি ও পিচফল খেতেও। তারা আসবার আগে এ অঞ্চলে ও দুটি ফলের ফসল ফলত না।
এইবার হুয়েন সাংয়ের কথা। তিনি ভারতে বেড়াতে এসেছিলেন সপ্তম শতাব্দীতে। শালোকা বা কপিশ মঠে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে গিয়ে বর্ষাকালটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন। অত দিন পরেও মঠের বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা দ্বিতীয় শতাব্দীর সেই চিন-রাজপুত্রদের অসাধারণ দানের কথা নিয়ে হুয়েন সাংয়ের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভোলেননি।
সন্ন্যাসীরা আর-এক বিষয় নিয়ে হুয়েন সাংয়ের কাছে ধরনা দিলেন। সন্ন্যাসীরা বললেন, কপিশ মঠে যক্ষরাজ কুবেরের প্রকাণ্ড এক পাথরের মূর্তি আছে। এবং তারই পায়ের তলায় পোঁতা আছে চিন-রাজপুত্রদের দেওয়া অগাধ ঐশ্বর্য।
সেই ঐশ্বর্য উদ্ধার করবার জন্যে হুয়েন সাংকে অনুরোধ করা হল। হুয়েন সাং জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা যখন গুপ্তধনের সন্ধান জানেন, তখন আমাকে অনুরোধ করছেন কেন? সন্ন্যাসীরা জানালেন, ভয়াবহ যকেরা ওই গুপ্তধনের ওপরে পাহারা দেয় দিন-রাত! একবার এক অধার্মিক রাজা গুপ্তধন অধিকার করতে যান। কিন্তু যকেরা এমন উৎপাত শুরু করে। যে রাজা প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। আমরাও যতবার গুপ্তধন নেওয়ার চেষ্টা করেছি। ততবারই ভৌতিক উৎপাত হয়েছে। রাজপুত্ররা অর্থ দিয়েছিলেন মঠের উন্নতির জন্যে। কিন্তু সংস্কারের অভাবে মঠের আজ অতি দুর্দশা হলেও ধনভাণ্ডারে হাত দেওয়ার উপায় নেই। আপনি সাধু ব্যক্তি। আপনার ওপরে হয়তো যকেরা অত্যাচার করবে না।
হুয়েন সাং রাজি হয়ে ধূপ-ধুনো জ্বেলে উপাসনা করে যক্ষদের উদ্দেশ্য করে বললেন, হে যক্ষ, হে গুপ্তধনের রক্ষক! আমার ওপরে প্রসন্ন হও! আমি মন্দির মঠের মেরামতির জন্যে যে অর্থের দরকার কেবল তাই নিয়ে বাকি সব ঐশ্বর্য যথাস্থানে রেখে দেব!
যকেরা হুয়েন সাংকে বাধা দিলে না। গুপ্তধনের অধিকাংশই হয়তো এখনও মাটির তলায় লুকোনো আছে। আমার গল্প ফুরুল।
আমি বললুম, কিন্তু আমাদের গল্প এইবার শুরু হবে।
বিনয়বাবু জিজ্ঞাসু চোখে আমার পানে তাকিয়ে বললেন, তার মানে?
পরে সব বলছি। আপনার এই ঐতিহাসিক গল্পটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। অন্ধকারের মধ্যে একটু-একটু আলো দেখতে পেয়েছি বটে, কিন্তু সেইটুকুই যথেষ্ট নয়। ধাঁধায় পড়ে আছি এই কাগজখানা নিয়ে। এর রহস্য উদ্ধার করতে পারেন কি? বলেই আমি ধুকধুকির ভেতর থেকে পুরু কাগজখানা বার করে তার হাতে দিলুম।
