পাকা শিল্পী এতটুকু জায়গার মধ্যে অতি সূক্ষ্মরেখায় সম্পূর্ণ নিখুঁত পাকা মূর্তি এমন কায়দায় খুদে ফুটিয়ে তুলেছে যে, দেখলে অবাক হতে হয়। কিন্তু কী কুৎসিত মূর্তি! মস্ত ভুড়িওয়ালা মোটাসোটা এক চেহারা, দুই চোখ দিয়ে বেরুচ্ছে যেন ঐশ্বর্যের বা ক্ষমতার দর্প, মুখের ফাঁক দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে বড়-বড় আটটা দাঁত এবং পা রয়েছে তিনখানা!
বললুম, কুমার, এ হচ্ছে কোনও খেয়ালি শিল্পীর উদ্ভট কল্পনা, এর মধ্যে কিছু বস্তু নেই। এইবার ধুকধুকির ভেতরটা দেখা যাক।
আঙুলের চাপ দিতেই ধুকধুকির ডালা খুলে গেল। ভেতরে রয়েছে একখানা ভাঁজ করা খুব পুরু কাগজ–প্রায় কার্ড বললেও চলে।
কাগজখানা হাতে নিয়ে মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলুম না। যদিও তার ওপরে কোন লেখা নেই, তবু একটা নতুনত্ব আছে বটে!
চামড়ার বা ধাতুর চাদরের ওপরে যেমন নকশা emboss করা থাকে, এর ওপরেও রয়েছে তেমনি উঁচু করে তোলা কতকগুলো ডট বা বিন্দু। কোথাও একটা, কোথাও দুটো, কোথাও চারটে বা আরও বেশি বিন্দু।
কুমার বিস্মিত স্বরে বললে, ও বিমল, এ আবার কীরকম ধাঁধা হে?
চিনে ধাঁধা হওয়াই সম্ভব। বাঙালির মাথায় ঢুকবে না।
ধুকধুকির ভেতর থেকে আর কিছুই আবিষ্কার করা গেল না।
কিন্তু বিন্দুগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনও অর্থ আছে, নইলে এত যত্নে কেউ এই কাগজখানাকে ধুকধুকির ভেতরে পুরে রেখে দিত না। সেই মৃত চিনেম্যানটা মরবার আগে যে দু-তিনটে কথা বলে গিয়েছিল তার দ্বারা বেশ বোঝা যায় যে, ছুন-ছিউ নামে কোনও দুরাত্মা তাকে আক্রমণ করেছিল এই ধুকধুকির লোভেই। সে এমন ইঙ্গিতও দিয়ে গেছে, কি-পিন নামক স্থানে গেলে গুপ্তধন পাওয়া যাবে, আর তার রহস্য এই ধুকধুকির মধ্যেই লুকোনো আছে।
কুমার বললে, বিমল, প্রথমে যখন আমরা রূপনাথ গুহায় গুপ্তধন (আমার লেখা যকের ধন উপন্যাস দষ্ট্রব্য। ইতি-লেখক) আনতে যাই, তখন মড়ার মাথায় সাঙ্কেতিক লিপির পাঠ উদ্ধার করেছিলে তুমিই। এ বিষয়ে তোমার আশ্চর্য ক্ষমতা আছে। ভালো করে ভেবে দ্যাখো, এবারেও তুমি সফল হবে।
এক ঘণ্টা গেল, দু-ঘণ্টা গেল, বিন্দুগুলো নিয়ে অনেক নাড়াচাড়া করলুম, কিন্তু ব্যর্থ হল আমার সকল চেষ্টাই।
শেষটা সব চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে বললুম, চুলোয় যাক ধুকধুকির রহস্য! তার চেয়ে কি পিন কথাটা নিয়ে আলোচনা করি এসো। কি-পিন কোথায়?
কুমার বললে, কি-পিন হয়তো চিনে মুল্লুকের কোন জায়গা।
অসম্ভব। যাও তো কুমার, আমার লাইব্রেরি থেকে নিয়ে এসো এনসাইক্লোপিডিয়া আর গেজেটিয়ার!
কুমার তখনি ছুটে গেল আর বই নিয়ে ফিরে এল। দুজনে মিলে অনেক খোঁজাখুঁজি করলুম, কিন্তু কোনও ফলই হল না। কোথাও কি-পিন নামে কোনও দেশের কথাই লেখা নেই।
কুমার বললে, মরবার সময়ে সেই চিনে বুড়ো যে আমাদের সঙ্গে প্র্যাকটিক্যাল জোক করে গেছে, এ কথা বিশ্বাস হয় না! কি-পিন বলে কোনও জায়গা নিশ্চয়ই আছে।
আমি বললুম, থাকতে পারে। কিন্তু হয়তো সেটা তুচ্ছ গণ্ডগ্রাম। বাইরের কেউ তার কথা জানে না।
সেদিন এই পর্যন্ত। কুমার বাড়ি ফিরে গেল। আমিও খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়লুম। ঘুমের ঘোর এসে মুছে দিলে কি-পিন, ধুকধুকি আর গুপ্তধনের রহস্য!
.
পরের দিন সকালবেলা। আমি আর কুমার চা পান করছি, বাঘাও এসে টেবিলের তলায় আশ্রয় নিয়েছে তার প্রভাতী দুধের বাটির লোভে।
এমন সময়ে কমলকে নিয়ে বিনয়বাবু এলেন। যাঁরা আমাকে চেনেন এ দুজনের সঙ্গেও নিশ্চয়ই তাদের পরিচয় আছে। সকালবেলায় পরীক্ষা করতে করতে ধুকধুকিখানা চায়ের টেবিলের ওপরে রেখে দিয়েছিলুম, বিনয়বাবু এসেই সেখানা দেখতে পেয়ে বললেন, ওটা কিহে, বিমল?
সঙ্গে-সঙ্গে আমার মনে পড়ল বিনয়বাবুর অসাধারণ পাণ্ডিত্যের কথা। সারাজীবন ধরে তিনি জ্ঞানসমুদ্রের ডুবুরির কাজ করে আসছেন। আজ বয়সে পঞ্চাশ পার হয়েছেন, তবু বিদ্যাচর্চা ছাড়া আর কোনও আনন্দই তার নেই। তিনি হচ্ছেন আশ্চর্য এক বৃদ্ধ ছাত্র এবং এই বিশ্ব হচ্ছে তার কাছে বিদ্যালয়ের মতো। দর্শন, বিজ্ঞান, রসায়ন, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব–যে-কোনও বিষয়। নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করেছি, কখনও সঠিক উত্তরের অভাব হয়নি। কুমার তো তার নাম রেখেছে–
জীবন্ত অভিধান। কাজেই তাকে পেয়ে আশান্বিত হয়ে ধুকধুকিটা তাড়াতাড়ি তার হাতে তুলে দিলুম।
বিনয়বাবুর দুই চোখ ধুকধুকির দিকে চেয়েই কৌতূহলে প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। বললেন, আরে, এরকম লকেট তো কখনও দেখিনি। এটা তো এদেশে তৈরি নয়! হুঁ, চিনের জিনিস। কোথায় পেলে?
এক চিনেম্যানের দান। কিন্তু ওপরের ওই মূর্তিটা কি অদ্ভুত দেখেছেন?
অদ্ভুত? হা, মূর্তির মুখখানা চিনে ছাঁদের বটে, কিন্তু আসলে এ হচ্ছে আমাদেরই পৌরাণিক মূর্তি!
সবিস্ময়ে বিনয়বাবুর মুখের পানে তাকিয়ে রইলুম।
তিনি বললেন, এ হচ্ছে হিন্দু যক্ষরাজ কুবেরের চেহারা। অষ্টদন্ত, তিনপদ। উদ্ভট, কুৎসিত চেহারার জন্যেই যক্ষরাজের নাম হয়েছে কুবের। তবে ঐশ্বর্যের মহিমায় তাঁর শ্রীহীনতার দুঃখ বোধহয় দূর হয়েছে।
কুমার বললে, বিনয়বাবু, আপনি কুবেরকে তো চিনলেন। কিন্তু বলতে পারেন, কি পিন বলে কোনও জায়গা আছে কি না?
বিনয়বাবু ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, কি-পিন?…কি-পিন। হুঁ, নামটা শুনেছি বোধ হয়। বুড়ো হয়েছি, ফস করে সব কথা স্মরণ হয় না। রোসো ভায়া, মনে করবার জন্যে একটু সময় দাও।
