পর মুহূর্তেই একটা মাঝবয়সি রক্তাক্ত চিনেম্যানের মূর্তি টলতে টলতে আমাদের কামরার কাছ বরাবর এসে হেলে পড়ে গেল এবং তার দেহটা এসে পড়ল কামরার ভেতরে একেবারে কুমারের বুকের ওপরে।
তারপরেই দেখলুম আমাদের কামরার সামনে এসে ভিড় করে দাঁড়াল প্রায় আট-দশজন। চিনেম্যান–তাদের চেহারা দেখলে ভালোমানুষের প্রাণ ধড়ফড় করে উঠবে। কিন্তু আমরা দুজনেই ভালোমানুষ নই।
সব আগে রয়েছে, লম্বায় না হোক চওড়ায় মস্ত বড় এক মূর্তি, তার ডানহাতে একখানা আধ হাত লম্বা রক্তমাখা ছোরা। সেইখানা উঁচিয়ে সে আমাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়বার উপক্রম করলে!
মারলুম এক ঘুসি ঠিক চোয়ালের ওপরে–আমার গায়ের সব শক্তি ছিল সেই মুষ্টির পিছনে। কারণ, আমি জানি, মারামারির সময়ে দরদ করে মারলে ঠকতে হয় নিজেকেই।
লোকটা ঠিকরে পড়ে গেল ঠিক বজ্রাহতের মতোই।
তারপরেই শুনলুম অনেকগুলো ভারী-ভারী জুতোর দ্রুত শব্দ! চোখের পলক পড়তে না-পড়তেই আমাদের ঘরের সামনে থেকে সমস্ত জনতা হল অদৃশ্য! কিন্তু পরমুহূর্তেই হোটেলের অন্যদিকে আবার নতুন গোলমাল উঠল কাদের সঙ্গে আবার কাদের মারামারি ঝটাপটি চলছে! খুব সম্ভব পুলিশ এসে পড়েছে।
এতক্ষণে কামরার ভেতরে নজর দেওয়ার সময় হল।
কুমার তখন আহত লোকটাকে মাটির ওপরে শুইয়ে দিয়েছে।
কিন্তু তার দিকে একবার তাকিয়েই বুঝলুম, আর কোনও আশা নেই।
লোকটাও বুঝেছিল। তবু সেই অবস্থাতেও সে চোখ নেড়ে আমাকে তার কাছে যাওয়ার জন্যে ইশারা করলে। আমি তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে তার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলুম।
নিশ্বাস টানতে টানতে অস্ফুট স্বরে ইংরেজিতে সে বললে, আমি আর বাঁচব না। আমার জামার বোতাম খুলে ফ্যালো।
তাই করলুম।
আমার গলায় ঝুলছে একখানা লকেট। সেটা তাড়াতাড়ি বার করে নাও।
লকেটখানা বার করতেই সে বললে, লুকিয়ে রাখো! ছুন-ছিউ দেখতে পেলে তুমিও বাঁচবে না।
ছুন-ছিউ কে?
সে প্রথমটা উত্তর দিতে পারলে না, কেবল হাঁপাতে লাগল। তারপর অনেক কষ্টে থেমে থেমে বললে, যে আমাকে মেরেছে।…কিন্তু আমি যখন মরবই…গুপ্তধন তাকেও ভোগ করতে দেব না…হ্যাঁ, এই আমার প্রতিশোধ..মাটির ভেতরে… গুপ্তধন তার কথা বন্ধ হল, সে চোখ মুদলে।
ভাবলুম, লোকটা বোধহয় এ জন্মের মতন আর কথা কইতে পারবে না। কুমার বললে, এ কী বলছে, বিমল? কিছুই তো বোঝা গেল না! গুপ্তধন কোথায় আছে?
লোকটা আবার চোখ খুললে। অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে টেনে-টেনে বললে, কি-পিন..কি পিন…সেখানে যেও..কি-পিন। হঠাৎ তার বাক্যরোধ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল এক ঝলক রক্ত এবং সঙ্গে-সঙ্গে তার চোখ কপালে উঠে স্থির হয়ে গেল!…
বুকে হাত দিয়ে দেখলুম, তার হৃৎপিণ্ড আর নড়ছে না।
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ । কি-পিন কাহিনি
খুনোখুনি, হানাহানি বা কোনওরকম রোমাঞ্চকর কাণ্ডের কথা পর্যন্ত আমি ভাবিনি, কিন্তু দ্যাখো একবার ব্যাপারখানা! এখানেও ছোরাছুরি, প্রাণ নিয়ে টানাটানি? আবার গুপ্তধন–আবার দুর্বোধ্য হেঁয়ালি, কি-পিন? আবার বুঝি আমার চির-চঞ্চল দুষ্টগ্রহটি সজাগ হয়ে উঠেছেন কলুর বলদের মতো আমাদের নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়ে মারবার জন্যে?
কুমার ব্যস্তভাবে বললে, চটপট সরে পড়ি চল ভায়া। নইলে পুলিশ হাঙ্গামে জড়িয়ে পড়তে হবে।
হোটেলের একদিক থেকে তখনও আসছিল প্রচণ্ড ছুটোছুটি হুড়োহুড়ির শব্দ, নিশ্চয় গুণ্ডাদের সঙ্গে চলছে পুলিশের দাঙ্গা।
সেই ফাঁকে আমরা সরে পড়লুম। সদর দরজার কাছেও পুলিশের লোক ছিল, বোধহয় আমাদের বাঙালি দেখেই বাধা দিল না।
একেবারে সিধে বাড়িতে এসে উঠলুম।
হতভাগা রামহরি বুড়ো হয়েছে, তবু তার চোখের জেল্লা কি কম? আমাদের দেখেই বললে, কার সঙ্গে মারামারি করে আসা হল শুনি?
কে বললে আমরা মারামারি করেছি?
থামো খোকাবাবু, মিছে কথা বলে আর পাপ বাড়িও না। নিজেদের জামাকাপড়ের দিকে একবার চেয়ে দ্যাখো দেখি। ও আবার কি? কুমারের জামায় যে রক্তের দাগ!
কুমার হেসে বললে, ধন্যি তুমি রামহরি! পাহারাওয়ালার চোখকে ফাঁকি দিয়ে এলুম, কিন্তু।
কী সর্বনাশ! এর মধ্যে আবার পাহারাওয়ালাও আছে? এই বুঝি তোমাদের খেতে যাওয়া? এমন সব খুনে ডাকাত নিয়ে আর যে পারা যায় না। হাড় যে ভাজা-ভাজা হয়ে গেল। জামা-টামা খুলে ফ্যালো, দেখি কোথায় লাগল?
বাঘাও ঘরের কোণে বসে আমাদের লক্ষ করছিল। রামহরির কথাবার্তা শুনে ও হাবভাব দেখে তারও মনে বোধহয় কেমন সন্দেহ জাগল, তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে আমাদের জামাকাপড় শুঁকতে শুরু করে দিলে।
কোনগতিকে মানুষ রামহরি ও পশু বাঘার কবল ছাড়িয়ে, জামাকাপড় বদলে বাইরের ঘরে গিয়ে বসলুম।
কুমার বললে, এইবার ধুকধুকিখানা বের করো দেখি।
কুমারের মুখের কথা বেরুতে-না-বেরুতেই হোটেলের সেই হতভাগ্য চিনেম্যানের দেওয়া লকেটখানা আমি বার করে ফেললুম–সেখানাকে ভালো করে পরীক্ষা করবার জন্যে আমারও মনের কৌতূহল রীতিমতো অশান্ত হয়ে উঠেছিল। সাধারণত ধুকধুকি বা লকেটের আকার যেরকম হয়, এখানা তার চেয়েও বড়। রূপোয় তৈরি এই ধুকধুকির ওপরকার কারুকার্য দেখলেই বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, এ হচ্ছে বিখ্যাত হুনুরি চিনে কারিগরের কীর্তি!
কারিকুরির মধ্যে মাঝখানে একটি মূর্তি আঁকা রয়েছে। মূর্তিটি এত ছোট যে, ভালো করে দেখবার জন্যে অণুবীক্ষণের সাহায্য নিতে হল।
