না হয় নেপোলিয়নের মতন মহামানুষ ও দিগ্বিজয়ী সম্রাটের কথা ছেড়ে দি, কারণ তাঁর জীবনে ঘটনা ঘটবার স্বাভাবিক সুযোগ ছিল প্রচুর। তার বদলে আমি মধ্যযুগের এক শিল্পীর কথা উল্লেখ করতে চাই। তাঁর নাম বেভেনুতো শেলিনি। তিনি ছিলেন ইতালির এক বিখ্যাত ভাস্কর ও ওস্তাদ স্বর্ণকার। তিনি একখানি প্রসিদ্ধ আত্মচরিতও লিখে গেছেন। সাধারণত শিল্পীদের জীবনের সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার-এর সম্পর্ক থাকে না বললেই চলে। কিন্তু বেভেনুতোর ঘটনাবহুল জীবনকাহিনি জোগাতে পারে বহু বিস্ময়কর, রোমাঞ্চকর ও প্রায় অসম্ভব উপন্যাসের উপকরণ। এজন্যে তাঁর আত্মচরিতকে অস্বাভাবিক বলে অভিযোগ করা চলে না। কারণ, তাঁর জীবনের ঘটনাবলি সত্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।
এক-একজন মানুষের জীবনই হচ্ছে এমনি বিচিত্র! হয় ঘটনাপ্রবাহ আকর্ষণ করে তাদের জীবনকে, নয় তাদের জীবনই আকর্ষণ করে ঘটনাপ্রবাহকে।
.
বরাবরই লক্ষ করে দেখছি, আমি স্বেচ্ছায় কোনও রোমাঞ্চকর আবহ সৃষ্টি করতে না চাইলেও, কোথা থেকে আচম্বিতে আমার জীবনের ওপরে এসে ভেঙে পড়েছে অদ্ভুত সব ঘটনার প্রবাহ। আমার বন্ধু কুমার হয়তো এসব ঘটনাচক্রের বাইরেই পড়ে থাকত, কিন্তু সে হচ্ছে আমার নিত্যসঙ্গী, তার সঙ্গে আমার অচ্ছেদ্য সম্পর্ক, কাজেই তাকেও জড়িয়ে পড়তে হয় এইসব ঘটনার পাকে-পাকে। অর্থাৎ প্রবাদে যাকে বলে–পড়েছ মোগলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে।
এবারেও কেমন করে আমরা নিজেদের অজান্তেই হঠাৎ এক আশ্চর্য ঘটনাপ্রবাহের দ্বারা আক্রান্ত হলুম, এইখানে সেই কথাই লিখে রাখছি?
সেদিন সন্ধ্যায় কুমার এসে বললে, কী সব বাজে বই নিয়ে মেতে আছ? চলো, আজ কোনও হোটেলের দিকে যাত্রা করি।
বই মুড়ে বললুম, আপত্তি নেই। কিন্তু কোন হোটেলে?
সেটা তুমিই স্থির করো।
চৌরঙ্গির দিশি আর বিলিতি হোটেলে খেয়ে-খেয়ে অরুচি হয়ে গেছে। চল আজ ছাতাওয়ালা গলির চিনে-পাড়ায়।
ন্যানকিনে? সেও তো বিলিতির নকল।
না-হে-না, আমরা যাব খাঁটি চিনে হোটেলে, খাঁটি চিনে খানা খেতে।
উত্তম প্রস্তাব। রাজি!
বাইরে বেরুবার জামাকাপড় পরছি দেখে বাঘাও গাত্রোত্থান করে গৃহত্যাগের জন্যে প্রস্তুত হল।
কুমার বললে, ওরে বাঘা, আজ আর তুই সঙ্গে আসিস নে। হোটেলওয়ালারা বদ রসিক রে, কুকুর-খদ্দের হয়তো পছন্দ করবে না!
কিন্তু বাঘা মানা মানতে রাজি নয় দেখে রামহরিকে স্মরণ করলুম।
রামহরি এসে বললে, দুই স্যাঙাতে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?
চিনে হোটেলে খানা খেতে।
সর্বনাশ! চিনেরা তো তেলাপোকা খায়! তোমাদেরও খাবার শখ হয়েছে নাকি?
রামহরি, চিনেম্যানদের নামে ও-অপবাদটা একেবারেই মিথ্যে। তারা তেলাপোকা খায় না, তবে পাখির বাসার ঝোল খায় বটে!
রাম-রাম! পাখির বাসাও আবার খাবার জিনিস নাকি?
তবু তুমি তাদের আর একটা খানার নাম শোনোনি। তারা পঞ্চাশ, ষাট, আশি, একশো বছরের পুরোনো ডিম খেতে ভারি ভালোবাসে।
ওয়াক! ও খোকাবাবু, শুনেই যে আমার নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত উঠে আসছে। ওয়াক!
হাঙরও তাদের কাছে সুখাদ্য।
পায়ে পড়ি খোকাবাবু, আর বোলো না! ছি-ছি, ওইসব ছিষ্টিছাড়া খাবার তোমরা খেতে চাও?
না রামহরি, হাঙর বা একশো বছরের পচা ডিম খাবার সৎসাহস আজও আমাদের হয়নি। তবে বাঘা বোধহয় হাঙর পেলে ছাড়বে না, ওকে তুমি সামলাও।
আমি আর কুমার বেরিয়ে পড়লুম।
.
চিনে-পাড়ার খাঁটি চিনে-হোটেলে বাঙালির দেখা পাওয়া যায় না। আর কিছুই নয়, রামহরির মতন অধিকাংশ বাঙালিরই আসল চিনে হোটেল সম্বন্ধে ভয়াবহ কুসংস্কার আছে– তাই তাদের দৌড় বড়জোর ন্যানকিন বা চাঙ্গুয়া পর্যন্ত।
কিন্তু আমরা যে চিনে-হোটেলে গেলুম সেখানে ভয় পাওয়ার বা বমন ওঠবার মতন কিছুই ছিল না। চারিধার সাজানো-গোছানো, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খাবারগুলিও সুস্বাদু–যদিও আমাদের দেশি-বিলাতি খাবারের সঙ্গে তাদের কিছুই মিল নেই। পরিবেশন করছিল একটি চিনে মেয়ে।
সর্বশেষে মেয়েটি নিয়ে এল চিনে চা। এ চা তৈরি করবার পদ্ধতিও অন্যরকম। মেয়েটি দুটি কাচের বা পোর্সিলিনের বাটি আনলে। একটি বাটিতে গরম জল ঢেলে তাতে শুকনো বা পাকানো একখণ্ড চায়ের পাতা দিয়ে ওপরে দ্বিতীয় বাটিটি চাপা দিয়ে চলে গেল। মিনিট তিন-চার পরে সে ফিরে এসে উপুড় করা বাটিটি নামিয়ে দিতেই দেখি, সেই গুটান চায়ের পাতাখানি সমস্ত বাটি ভরে ছড়িয়ে পড়ে জলের ওপরে ভাসছে। ব্যস, চা প্রস্তুত–এখন খালি চিনি মেশাও আর চুমুক দাও। কিন্তু এ চায়ের স্বাদ অধিকাংশ বাঙালিরই ধাতে সইবে না।
কুমার চায়ের পেয়ালা তুলে বললে, বিমল, চিনে-হোটেলের ভেতর বসে চিনে খানা খেতে-খেতে আর চুং চাংচুং চিং কথা শুনতে-শুনতে মনে হচ্ছে, আমরা যেন আরব্য উপন্যাসের মায়া-গালিচায় চেপে হঠাৎ বাংলা ছেড়ে চিনদেশেই এসে পড়েছি। ও পাশের ঘরে ওই চিনেম্যানদের দেখছ? ওরা খাচ্ছে-দাচ্ছে কথাবার্তা কইছে বটে, কিন্তু ওদের মুখে কোনও ভাবের ছাপ নেই–ওরা যেন, রহস্যময় মূর্তি।
কুমারের কথা ফুরুতে-ফুরুতেই আমার মন অন্যদিকে আকৃষ্ট হল।
ঠিক আমাদের পাশের ঘরেই জাগল হঠাৎ এক ক্রুদ্ধ গর্জনসঙ্গে-সঙ্গে বিষম হুড়োহুড়ি ও চেয়ার-টেবিল উলটে পড়ার শব্দ। তারপরেই এক আর্তনাদ!
রাত্রিবেলায় এই চিনে-পাড়া মারামারি হানাহানির জন্যে বিখ্যাত। পাছে অন্যের হাঙ্গামের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে হয় সেই ভয়ে আমরা দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম।
