আমরা পৃথিবীর কোন দেশে গিয়ে নামব, তা জানি না। কিন্তু যেখানেই নামি, আমাদের ইতিহাস নিয়ে যে সারা পৃথিবীতে একটা মহা আন্দোলনের সূত্রপাত হবে, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। আমাদের মুখের কথায় নিশ্চয়ই কেউ বিশ্বাস করত না; কিন্তু এই অদ্ভুত উড়োজাহাজ আর বামনদের স্বচক্ষে দেখলে আর কেউ সন্দেহ করবার ওজরটুকু পর্যন্ত তুলতে পারবে না।
বামনরা এসেছিল পৃথিবী থেকে নমুনা জোগাড় করতে। আমরাও আজ মঙ্গল থেকে অনেক বিচিত্র নমুনা নিয়ে ফিরে আসছি। শুধু নমুনা সংগ্রহ নয়, আমরা ফিরছি মঙ্গলকে জয় করে। মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ জীব যে মঙ্গলে নেই, আমরা তা প্রমাণিত করেছি।
.
কিন্তু এ কী মুশকিল। শেষটা কি ঘাটে এসে নৌকা ডুববে? আমরা যখন পৃথিবীর খুব কাছে, আমাদের সকলেরই মুখে যখন নিশ্চিত হাসির লীলা, চোখে যখন নির্ভয় শান্তির আভাস, তখন চারিদিক আঁধার করে আচম্বিতে ঝড়ের এক ভৈরব মূর্তি জেগে উঠল।
তেমন ঝড় আমি জীবনে কখনও দেখিনি। আমাদের এমন যে প্রকাণ্ড উড়োজাহাজ, ঠিক যেন ছেঁড়া পাতার টুকরোর মতন ঝোড়ো হাওয়ার মুখে ঘুরতে ঘুরতে উড়ে চলল। কোনও রকমেই সে বাগ মানলে না। প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যু যেন আমাদের চোখের উপরে নৃত্য করতে লাগল।
প্রায় চার ঘণ্টা ধরে আমাদের উড়োজাহাজ নিয়ে দিকে দিকে ছোঁড়াছুড়ি করে ঝড়ের শখ যেন মিটল। ধীরে ধীরে বাতাসের দীর্ঘশ্বাস থেমে আসতে লাগল, কিন্তু চারিদিকের নিবিড় অন্ধকার তখনও একটুও কমল না। এ অন্ধকারে পৃথিবীতে নামাও নিরাপদ নয়।
অথচ আমরা নামতে না চাইলেও, উড়োজাহাজ যে ধীরে ধীরে নামছে, সেটা বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারলুম। বামনরা চেষ্টা করেও তাকে আর উপরে তুলতে পারছে না নিশ্চয়ই ঝড়ের দাপটে কোনও কলকবজা বিগড়ে গেছে।
তবে সৌভাগ্যের কথা এই যে, উড়োজাহাজখানা আস্তে আস্তে নামছে। নইলে পৃথিবীর উপরে আছড়ে পড়ে সে চুর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যেত, আমাদের আর কিছু আশা-ভরসা থাকত না।
কিন্তু কোথায় আমরা নামছি–জলে, না স্থলে? অন্ধকারে কিছুই বোঝবার জো নেই।
যেখানেই নামি, এ যে আমাদের নিজেদের পৃথিবী, তাতে আর কোনওই সন্দেহ নেই। এ একটা মস্ত সান্ত্বনা। মা-পৃথিবীর সবুজ বুক স্পর্শ করবার জন্যে প্রাণ আমার আনচান করতে লাগল।
হঠাৎ একটা ধাক্কা খেয়ে উড়োজাহাজ স্থির হয়ে দাঁড়াল।
আমরা আবার পৃথিবীতে ফিরে এসেছি!
আমরা সকলে মিলে আমি বাইরের দিকে তাকালাম। একে রাত্রি, তায় আকাশ মেঘে। ঢাকা। কাজেই দেখলুম, খালি অন্ধকার আর অন্ধকার আর অন্ধকার।
রাত না পোয়ালে কিছুই দেখবার উপায় নেই। আমরা সাগ্রহে প্রভাতের অপেক্ষায় বসে রইলুম। খোলা দরজা দিয়ে মাঝে-মাঝে দমকা বাতাস এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ করে যাচ্ছিল। এ বাতাসকে আমি চিনি। এ আমাদের পৃথিবীর বাতাস। তাকে কি ভোলা যায়?
ওই ফুটে উঠেছে ভোরের আলো–পূব আকাশের তলায় আশার একটি সাদা রেখার মতো। আকাশের বুকে তখনও রাতের কালো ছায়া ঘুমিয়ে আছে এবং সামনের দৃশ্য তখনও অন্ধকারের আস্তরণে ঢাকা। তবে, অন্ধকার এখন অনেকটা পাতলা হয়ে এসেছে বটে।
মুখ বাড়িয়ে দেখলুম, পৃথিবীর সমস্তই আবছায়ার মতন,–এখনও গাছপালার সবুজ রং চোখের উপরে ভেসে ওঠেনি।
বিমল, কুমার, কমল ও রামহরি আর থাকতে পারলে না, তারা তখনি উড়োজাহাজ ছেড়ে নেমে পড়ল। আমিও নীচে নামলুম বাঘাও আমাদের সঙ্গ ছাড়লে ।
আঃ, কী আরাম! এতকাল পরে পৃথিবীর প্রথম স্পর্শ, সে যে কী মিষ্টি! মাটিতে পা দিয়েই টের পেলুম, আমরা স্বদেশে ফিরে এসেছি।
কমল তড়াক করে এক লাফ মেরে বললে, হ্যাঁ, এ পৃথিবীই বটে! এক লাফ আমি আর তিন-তলার সমান উঁচু হতে পারলুম না তো!
খানিক তফাতে হঠাৎ কি একটা শব্দ হল–দুড়ুম, দুড়ুম, দুড়ুম! যেন ভীষণ ভারী পায়ের শব্দ।
আমরা সচমকে সামনের দিকে তাকালুম। অন্ধকারের আবরণ তখনও সরে যায়নি, তবে একটু দূরে প্রকাণ্ড একটা চলন্ত পাহাড়ের কালো ছায়ার মতো কি যেন চলে যাচ্ছে বলে মনে হল।
বাঘা ভয়ানক জোরে ডেকে উঠল, আমরা সবাই স্তম্ভিতের মতো দাঁড়িয়ে রইলুম।
নিজের চোখকে যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে বলতে পারি, আমাদের সুমুখ দিয়ে যে জীবটা চলে যাচ্ছে, সেটা তালগাছের চেয়ে কম উঁচু হবে না। তার পায়ের তালে, দেহের ভারে পৃথিবীর বুক ঘন-ঘন কেঁপে উঠছে।
মহাকায় জীবটা কোথায় মিলিয়ে গেল, কিন্তু তার চলার শব্দ তখনও শোনা যেতে লাগল–দুড়ুম, দুড়ুম, দুড়ুম।
বিমল শুষ্ক স্বরে বললে, বিনয়বাবু!
অ্যাঁ?
ওটা কী?
অন্ধকারে তো কিছুই দেখতে পেলুম না।
কিন্তু যেটুকু দেখলুম, তাই-ই কি ভয়ানক নয়? এ আমরা কোথায় এলুম?
পৃথিবীতে।
কিন্তু এইমাত্র যাকে দেখলুম, সে কি পৃথিবীর জীব? আমিও অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম। ওদিকে আকাশের কোলে শুয়ে ঊষার চোখ ক্রমেই ফুটে উঠতে লাগল।
যক্ষপতির রত্নপুরী (উপন্যাস)
প্রথম পরিচ্ছেদ। চিনে হোটেলে
অনেকে অভিযোগ করেন, আমার জীবন নাকি অস্বাভাবিক। তাঁদের মতে, স্বাভাবিক মানুষের জীবন এমন ঘটনাবহুল হতে পারে না।
যদিও নিজেকে আমি পাগল বা গণ্ডমূর্খের মতো নেপোলিয়নের সঙ্গে তুলনা করছি।, তবে তর্কের খাতিরে এখানে কেবল এই প্রশ্ন বোধহয় করতে পারি, নেপোলিয়ন কি স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না? তিনি মাত্র বাহান্ন বৎসর বেঁচে ছিলেন। তার ভেতর থেকে প্রথম পঁচিশ বৎসর অনায়াসেই বাদ দেওয়া যায়। কিন্তু বাকি মাত্র সাতাশ বৎসরের মধ্যে নেপোলিয়নের জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল যে ঘটনার-পর-ঘটনার প্রচণ্ড বন্যা, তাদের অবলম্বন করে কি অসংখ্য নাটক ও উপন্যাস রচনা করা চলে না?
