আমি বললুম, না, আমি কিছুই ভুলিনি। উড়োজাহাজখানা দেখেই আমার মাথায় এই নতুন ফন্দি জুটেছে। আমরা পৃথিবীতেই যাব, আর এই উড়োজাহাজ চালিয়ে নিয়ে যাবে ওই বামনরাই।
বিমল সানন্দে এক লক্ষ ত্যাগ করে বললে, ঠিক, ঠিক! এতক্ষণে আমি বুঝেছি। বামনদের আমরা জোর করে আমাদের সারথি করব–কেমন, এই তো?
আমি বললুম, হ্যাঁ। বামনরা এখন দলে হালকা হয়ে পড়েছে, সেপাইরা সব শহরে আছে। এই হচ্ছে, শুভ মুহূর্ত প্রাণের ভয়ে ওরা নিশ্চয়ই আমাদের প্রস্তাবে রাজি হবে।
বিমল আনন্দে অধীর হয়ে বললে, জয়, বিনয়বাবুর বুদ্ধির জয়!
কুমার আমাকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে গদগদ স্বরে বললে, বিনয়বাবু, বিনয়বাবু, তাহলে আবার আমরা পৃথিবীতে ফিরতে পারব?
কমল আর রামহরি পরস্পরের হাত ধরে অপূর্ব এক নৃত্য শুরু করে দিলে। তাদের দেখাদেখি বাঘারও ফুর্তি বেড়ে উঠল, সে-ও লাফিয়ে লাফিয়ে হরেকরকম নাচের কায়দা দেখাতে লাগল, আর এত জোরে ল্যাজ নাড়তে লাগল যে, আমার মনে হল ল্যাজটা বুঝি এখনি ছিঁড়ে ঠিকরে পড়বে।
অন্যান্য সকলেও নানাভাবে ও নানা ভঙ্গিতে আপন-আপন মনের আনন্দ প্রকাশ করতে লাগল।
আমি বললুম, এখনি এতটা আহ্লাদ করে কোনও লাভ নেই। আগে দেখো আমরা সত্যিই পৃথিবীতে গিয়ে পৌঁছতে পারি কিনা। তার উপরে বামনরা উড়োজাহাজ চালাতে রাজি হবে কিনা, এখনও তাও আমরা জানি না।
বিমল চোখ পাকিয়ে বললে, কী! রাজি হবে না? তাহলে ওদের কারুকেই আমি আর আস্ত রাখব না! বলেই বন্দুক বাগিয়ে সে বামনদের দিকে অগ্রসর হল। আমরাও সদলবলে তার পিছনে পিছনে চললুম।
যে কয়জন বামন উড়োজাহাজের কলঘরে থাকত, পৃথিবী থেকে আসবার সময়ে আমরা তাদের অনেকবার দেখেছিলুম। তাদের পোশাক সেপাইদের পোশাকের মতন নয়। সেই পোশাক দেখেই বিমল তাদের একে-একে দল থেকে টেনে বার করলে। তারা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল।
উড়োজাহাজের কলঘর আমরা আগে থাকতেই জানতুম। বিমল ইঙ্গিতে তাদের সেদিকে অগ্রসর হতে বলল। তারা সুড়সুড় করে বিমলের আগে আগে চলতে লাগল।
কুমার ও আরও জন পনেরো লোককে বাকি বামনদের কাছে পাহারার নিযুক্ত রেখে আমিও কলঘরের দিকে চললুম। উড়োজাহাজের প্রধান দরজা অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া। হয়েছিল।
সবাই কলঘরে গিয়ে ঢুকলুম। মস্ত ঘর। চারিদিকে নানান রকম যন্ত্র রয়েছে–ছোট, বড়, মাঝারি। সমস্ত যন্ত্রই পাকা সোনার তৈরি।
কমল বললে, বিনয়বাবু, এই উড়োজাহাজে এত সোনা আছে যে, আমরা সবাই বড়লোক হয়ে যেতে পারি!
আমি বললুম, রও, আগে প্রাণে বেঁচে মানে মানে পৃথিবীতে ফিরে যাই, তারপর সোনাদানার কথা ভাবা যাবে-অখন! এখন এ সোনার কোনও দাম নেই।
বিমল কলের দিকে আঙুল দেখিয়ে ইশারায় বামনদের কল চালাতে বললে। বিমলের ইশারা ও উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে বামনদের মুখ শুকিয়ে গেল। তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়র মতো পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।
বিমল ক্রুদ্ধভাবে আবার ইশারা করলে।
কিন্তু বামনরা তবুও যন্ত্রের দিকে এগুল না।
বিমল তখন বন্দুকটা তুলে বামনদের দিকে এগিয়ে গেল।
বন্দুক দেখেই তারা আঁতকে উঠল, তারপর তিরের মতো ছুটে গেল যন্ত্রপাতির দিকে। আর কারুকে কিছু বলতে হল না। এমনি বন্দুকের মহিমা!
উড়োজাহাজ উপরে উঠতে লাগল ধীরে ধীরে, ধীরে।
বিপুল পুলকে আমিও আর চুপ করে থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে উঠলুম,–জয়, পৃথিবীর জয়!–আমার জয়নাদে অন্য সকলেও যোগ দিলে। সে যে কী আনন্দ, লিখে তা জানানো যায় না।
উড়োজাহাজ আরও উপরে উঠল–আরও–আরও উপরে।
স্বচ্ছ কক্ষতল দিয়ে দেখতে পেলুম, নীচে শহরের চারিদিকে বড় বড় আলো জ্বলে উঠছে। নিশ্চয়ই উড়োজাহাজের শব্দে শহরের ঘুম ভেঙে গেছে। হয়তো এখনি শতশত উড়োজাহাজ আমাদের আক্রমণ করতে আসবে।
বিমল ইশারায় বারংবার শাসিয়ে বলতে লাগল, উড়োজাহাজের গতি বাড়াবার জন্যে। বামনরা কল টিপে উড়োজাহাজখানাকে ঠিক উল্কার মতো বেগে চালিয়ে দিলে, দেখতে-দেখতে শহরের আলোগুলো ঝাপসা হয়ে এল। আমি অনেকটা নিশ্চিন্ত হলুম, কারণ শহরের উড়োজাহাজগুলো প্রস্তুত হবার আগেই আমরা বোধহয় নাগালের বাইরে চলে যেতে পারব। বিশেষ, আমাদের উড়োজাহাজের আকার যেরকম বিশাল, তাতে এর সঙ্গে আর কোনও উড়োজাহাজ পাল্লা দিতে পারবে বলে মনে হয় না!
শহরের খুব অস্পষ্ট আলোগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে-মনে আমি বললুম–বিদায় মঙ্গল গ্রহ, তোমার কাছ থেকে চিরবিদায়। তোমার রক্ত-মরুভূমির কাছ থেকে, তোমার যুগল চন্দ্রের কাছ থেকে, তোমার অপূর্ব জীব-রাজ্যের কাছ থেকে আজ আমরা চির-বিদায় গ্রহণ করলুম। তোমার অনেক রহস্যই হয়তো জানা হল না, কিন্তু যেটুকু দেখবার সুযোগ পেয়েছি, এ-জীবনের পক্ষে সেটুকুই যথেষ্ট, তোমাকে ভালো করে জানবার জন্যে আর আমার কোনওই আগ্রহ নেই। পৃথিবীর ডাক আমাদের কানে এসে পৌঁছেছে–বিদায় মঙ্গল গ্রহ, চিরবিদায়!
.
আবার পৃথিবীতে
সব কথা আর খুঁটিয়ে না বললেও ক্ষতি নেই। কারণ আসবার মুখে আজ পর্যন্ত আর কোনও উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেনি।
বামনদের উপরে আমরা পালা করে দিন-রাত পাহারা দিয়েছি, কাজেই তারাও বাধ্য হয়ে বরাবর উড়োজাহাজ চালিয়ে এসেছে।
সোনার পৃথিবী এখন আমাদের চোখের উপরে ছবির মতন ভাসছে। দেখতে-দেখতে আমাদের চোখ যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে।
