ঘণ্টা-আড়াই পরে দূর থেকে বামনদের শহর আবছায়ার মতো দেখা গেল। শহরটা দেখেই বাঘা রেগে গরর-গরর করে উঠল, কিন্তু কুমার তখনি তার মাথায় এক চড় বসিয়ে দিয়ে বললে, খবরদার বাঘা চুপ করে থাক! বাঘা একেবারে চুপ হয়ে গেল, তারপর একবারও সে টু শব্দটি পর্যন্ত করলে না। আশ্চর্য কুকুর!
শহরের ভিতরে মাঝে মাঝে আলো দেখা যাচ্ছে বটে কিন্তু জনপ্রাণীর সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বামনরা বোধহয় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আচম্বিতে বিমল ও কুমার থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি বললুম, ব্যাপার কী?
বিমল সামনের দিকে আঙুল তুলে দেখালে।
তাই তো, প্রকাণ্ড একটা ছায়ার মতো, অনেকখানি জায়গা জুড়ে কী ওটা পড়ে রয়েছে?
বিমল চুপি-চুপি বললে, বিনয়বাবু, উড়োজাহাজ!
কুমার বললে, বোধহয় এইখানাই আমাদের পৃথিবীতে গিয়েছিল।
আমি বললুম, হু, এর আকার দেখে তাই মনে হচ্ছে বটে। এখানা নিশ্চয় পৃথিবী আক্রমণ করতে যাবে বলে বিশেষভাবে তৈরি হয়েছিল, কারণ মঙ্গলের আর যত উড়োজাহাজ দেখেছি সবই ছোট ছোট। কিন্তু এখানা এমন খোলা জায়গায় পড়ে কেন?
বিমল বললে, বোধহয় শহরের ভিতরে এতবড় উড়োজাহাজ রাখবার জায়গা নেই।
বিমলের অনুমান সত্য বলেই মনে হল। আমি নীরবে ভাবতে লাগলুম।
বিমল বললে, এখন আমাদের কী করা কর্তব্য?
ধাঁ করে আমার মাথায় এক ফন্দি জুটে গেল।–এর আগে এমন ফন্দি আমার মাথায় ঢোকেনি কেন, পরে তাই ভেবে আমি নিজের বুদ্ধিকে যথেষ্ট ধিক্কার দিয়েছি, কারণ তাহলে আজ আমাদের মঙ্গল গ্রহে হয়তো আসতেই হত না। আমি বিমলকে বললুম, দেখো এই উড়োজাহাজখানা আমরা যদি আক্রমণ করি তাহলে কী হয়?
বিমল বললে, এ প্রস্তাব মন্দ নয়। উড়োজাহাজের ভিতরে হয়তো অনেক রসদ আছে। তাতে আমাদের পেটের ভাবনা দূর হতে পারে।
আমি বললুম, কিন্তু খুব চুপি-চুপি কাজ সারতে হবে। কারণ শহরের লোক জানতে পারলে আমাদের পক্ষে আত্মরক্ষা করা শক্ত হয়ে উঠবে।
বিমল বললে, দাঁড়ান, আগে আমি দেখে আসি।
বিমল হামাগুড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। আমরা স্তব্ধ হয়ে সেইখানে দাঁড়িয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলুম।
খানিক পরে বিমল ফিরে এসে বললে,আক্রমণের কোনও বাধা নেই। উড়োজাহাজের প্রধান দরজাটা খোলা রয়েছে। সিঁড়ির উপরে বসে একজন বামন-সেপাই ঢুলছে, আমি এখনি এমনভাবে চেপে ধরব, যাতে সে কোনও গোলমাল করতে পারবে না। আপনারা চুপি-চুপি আমার পিছনে আসুন।
বিমল আবার হামাগুড়ি দিয়ে অগ্রসর হল, আমরা সকলেও ঠিক সেইভাবেই তার পিছু নিলুম।
খানিক দূর অগ্রসর হয়েই দেখলুম, উড়োজাহাজের ভিতর থেকে খোলা দরজা দিয়ে একটা আলোর রেখা বাইরে এসে পড়েছে। দরজার তলাতেই নীচে নামবার জন্যে সিঁড়ি, ঠিক তার উপর-ধাপে পা ঝুলিয়ে এবং উড়োজাহাজের গায়ে ঠেসান দিয়ে বসে আছে এক বামন সেপাই।
আমাদের অপেক্ষা করতে বলে বিমল বুকে হেঁটে আরও খানিক এগিয়ে গেল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে মারলে এক লাফ এবং সিঁড়ি টপকে পড়ল গিয়ে একেবারে সেই বামন-সেপাইয়ের বুকের উপরে। তারপর কী হল তা জানি না, কিন্তু বামনটার মুখ থেকে কোনওরকম আর্তনাদই আমাদের কানে বাজল না। অল্পক্ষণ পরেই বিমল উঠে দাঁড়াল এবং হাতছানি দিয়ে আমাদের অগ্রসর হতে বললে।
.
জয়, জয়, জয়
বামনদের বাগে আনতে আমাদের বেশি বেগ পেতে হল না। একেই তো তারা নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোচ্ছিল, তার উপরে তারা অস্ত্র ধরবার সময় পর্যন্ত পেলে না। অস্ত্রগুলো আমরা আগেই কেড়ে নিলুম, তারপর তাদের সবাইকে ভেড়ার পালের মতো তাড়িয়ে একটা ঘরের ভিতরে পুরে ফেললুম এবং ইশারায় জানিয়ে দিলুম যে, দুষ্টুমি করলে তারা কেউ প্রাণে বাঁচবে না।
বামনদের দলে লোক ছিল মোট আশি জন। মানুষের তুলনায় তারা এত দুর্বল যে, আমরা ইচ্ছা করলেই তাদের সবাইকে টিপে মেরে ফেলতে পারতুম।
একটা বামন চেঁচিয়ে গোলমাল করে উঠেছিল। কিন্তু কুমার তখনি তাকে খেলার পুতুলের। মতো মাটি থেকে তুলে মারলে এক আছাড়। তাকে হত্যা করবার ইচ্ছা কুমারের মোটেই ছিল না, কিন্তু সেই এক আছাড়েই বেচারির ভবের লীলাখেলা সাঙ্গ হয়ে গেল একেবারে। লঘু পাপে গুরু দণ্ড।
আমরা দুঃখিত হলুম, কিন্তু হাতে হাতে এই কঠোর শাস্তি দেখে অন্যান্য বামনরা দস্তুরমতো ঢিট হয়ে গেল–সবাই বোবার মতো চুপ করে রইল।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, এইবারে এদের ভাড়ার ঘরে ঢুকে রসদ-সদ যা আছে লুটপাট করে নেওয়া যাক।
আমি বললুম, না, এইবারে আবার পৃথিবীর দিকে যাত্রা করা যাক।
বিমল, কুমার ও কমল একসঙ্গে বললে–পৃথিবীর দিকে যাত্রা।
রামহরি এত আশ্চর্য হয়ে গেল যে, প্রকাণ্ড হাঁ করে আমার মুখের পানে শুধু তাকিয়ে রইল–একটা কথা পর্যন্ত কইতে পারলে না।
আমি বললুম, হ্যাঁ, এইবারে আমাদের পৃথিবীতে ফিরতে হবে, নইলে শীঘ্র আর ফেরবার সময় পাওয়া যাবে না; কারণ এখনও মঙ্গল গ্রহ পৃথিবীর কাছেই রয়েছে–যতই দেখি করব, ততই সে দূরে চলে যাবে।
কমল বললে, কিন্তু যাব কী করে? আমাদের তো ডানা নেই! আমি বললুম, যেমন করে এসেছি, তেমনি করেই যাব–অর্থাৎ এই উড়োজাহাজে চড়ে।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, আপনি বোধহয় মনের খুশিতে ভুলে গেছেন যে আমরা কেউই এ উড়োজাহাজ চালাতে জানি না।
