রামহরি এক গাল হেসে বললে, খোকাবাবু, তোমরা একেলে ছেলে, ভগবান মানো না, কিন্তু এই দেখো, জীব দিয়েছেন যিনি আহার দিলেন তিনি!
.
অবাক কারখানা
আহারাদির পরে সবাইকে ডেকে আমি বললুম, দেখো, এরকম করে তো আর বেশিদিন চলবে, এখন আমাদের কর্তব্য স্থির করতে হবে। নইলে কাল থেকে আবার অনাহার ছাড়া আর কোনও উপায় তো আমি দেখছি না।
কুমার বললে, হ্যাঁ, এপথ দিয়ে ভবিষ্যতে আর যে বামনের দল ফল-ফসল নিয়ে যাতায়াত করবে, তাও তো আমার মনে হয় না।
বিমল একটু ভেবে বললে, আজ রাত্রে একবার শহরের দিকে লুকিয়ে গেলে হয় না?
আমি বললুম, কেন?
বিমল বললে, বামনরা নিশ্চয়ই চুপ করে বসে নেই, আমাদের বন্দি করবার জন্যে তারা নিশ্চয়ই কোনও উদ্যোগ-আয়োজন করছে। তারা কী করছে আগে থাকতে জানতে না পারলে পরে আমরা আত্মরক্ষা করতে পারব না।
আমি বললুম, তোমার পরামর্শ মন্দ নয়। সুবিধে পেলে শহর থেকে কিছু খাদ্যদ্রব্য লুঠ করে আনা যাবে, কী বলো?
বিমল হেসে বললে, নিশ্চয়ই! দলে আমরাও তো কম ভারী নই, আমরা প্রত্যেকেই শুধু হাতে আট-দশ জন বামনকে অনায়াসে বধ করতে পারি। বামনরা আমাদের মতো লাফাতেও পারে না, বেগতিক দেখলে লাফিয়ে লম্বা দিলেই চলবে।
হঠাৎ বাইরে থেকে শব্দ এল–বাপ বাপ, বাপরে বাপ। বাপ বাপ, বাপরে বাপ! বাপ বাপ, বাপরে বাপ!
এ সেই কালকের রাতের আর্তনাদ।
আমরা সবাই তাড়াতাড়ি বাইরে ছুটে গেলুম, কিন্তু পাহাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে মরুভূমির চারিধারে চেয়েও কোথাও জনপ্রাণীকে দেখতে পেলুম না।
রামহরি বললে, ঠিক দুপুর বেলা, ভূতে মারে ঢেলা,–খোকাবাবু এসব ভূতুড়ে ব্যাপার। তার পরেই দূর থেকে আর এক চিৎকার শোনা গেল–ঘেউ, ঘেউ, ঘেউ।
এ আবার কি, এ যে কুকুরের চিৎকার!
রামহরি চোখ পাখিয়ে বললে, এ ভূত না হয়ে যায় না কখনও মানুষের মতো, কখনও কুকুরের মতো চেঁচাচ্ছে। এসো বাবুরা, পালিয়ে এসো।
দূর থেকে কুকুরের চিৎকারের সঙ্গে-সঙ্গে খুব কাছে, একেবারে আমাদের মাথার উপর থেকে আবার সেই আর্তনাদ শোনা গেল-বাপ বাপ, বারে বাপ! বাপ বাপ, বারে বাপ! বাপ বাপ, বাপরে বাপ!
চমকে উপরে তাকিয়ে দেখি, পাহাড়ের টঙে হনুমানের মতো ল্যাজওয়ালা সেই আশ্চর্য চতুষ্পদ পক্ষী বসে আছে। সেই পাখিটাই অমন বিকট স্বরে ডাকছে।
কমল বললে, পাখির ডাক মানুষের শব্দের মতো। অবাক কারখানা!
কিন্তু দূরে কুকুরের চিৎকার তখনও থামেনি। আমরা চারিদিকে তাকাতে-তাকাতে হঠাৎ দেখলুম, খালের জল থেকে ডাঙায় উঠে একটা মিশমিশে কালো মস্ত জানোয়ার বেগে ছুটতে শুরু করলে। খানিক পরেই জানোয়ারটা পাহাড়ের কাছে এসে পড়ল–সেটা কুকুরই বটে!
কুমার বলে উঠল, নিশ্চয়ই আমার বাঘা! বলেই সে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে গেল, আমরাও তার পিছনে-পিছনে চললুম।
কুমার চেঁচিয়ে ডাক দিলে, বাঘা, বাঘা, বাঘা!
কুকুর পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঘেঁষে অন্যদিকে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু কুমারের ডাক শুনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপরে খুব জোরে চিৎকার করতে করতে তিরের মতন বেগে আমাদের দিকে ছুটে আসতে লাগল। হ্যাঁ, এ যে বাঘা, তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই।
বাঘা ছুটে এসে একেবারে কুমারের পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল, কুমার মহানন্দে তাকে নিজের কোলের ভিতরে টেনে নিলে।
আমি দেখলুম, বাঘার গলা থেকে একগাছা সোনার শিকলের আধখানা ঝুলছে। বাঘা নিশ্চয়ই শিকল ছিঁড়ে পালিয়ে এসেছে।
বাঘা তারপর বিমল, রামহরি, কমল ও আমার কাছেও এসে ল্যাজ নেড়ে মনের খুশি জানালে ও আমাদের গা চেটে দিয়ে বাঁ পায়ের কাছে চিত হয়ে শুয়ে পড়ে সকলকে বুঝিয়ে দিলে যে, তার নতুন আর পুরাতন কোনও বন্ধুকেই সে ভুলে যায়নি।
বাঘাকে ফিরে পেয়ে আমাদেরও কম আনন্দ হল না। এই নতুন জগতে এসে পৃথিবীর সমস্তই আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠছে, কুকুর বলে বাঘাকে আর ছোট ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে। না। উড়োজাহাজে যে বানরদের দেখেছিলুম, তারাও যদি কোনও গতিকে আসতে পারে, তাহলে তাদেরও আমি আদর করে আশ্রয় দিতে নারাজ হই না! তারাও যে পৃথিবীর জীব, আমাদের প্রাণের সঙ্গে তাদেরও যে যোগ আছে!
.
বামনদের আস্তানায়
সন্ধ্যা উতরে গেছে। আকাশের দুই চাঁদ যেন পরস্পরকে দেখে হাসতে শুরু করে দিয়েছে– যদিও তাদের হাসির ক্ষীণ আলো চারিদিকের আবছায়া দূর করতে পারছে না।
আমরা একে একে পাহাড় থেকে মরুভূমিতে এসে নামলুম, তারপর সকলে মিলে যাত্রা করলুম বামনদের শহরের দিকে। সব আগে রইল বন্দুক নিয়ে বিমল ও কুমার, তারপর আমি, কমল ও রামহরি, তারপর আর সকলে। বিমল ও কুমারের পকেটে দুখানা বড় ছোরা ছিল, আমি আর কমল সে দুখানা চেয়ে নিলুম। অন্য সকলে বন থেকে গাছের এক-একটা মোটা ডাল ভেঙে নিয়ে–দরকার হলে তা নিয়ে বামন বধ করা কিছুমাত্র শক্ত হবে না। মানুষের হাতের অমন লম্বা ও মোটা ডালগুলোর কাছে বামনদের খুদে তরোয়ালগুলো একেবারেই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
এক-এক লাফে আমরা খাল পার হয়ে গেলুম। আমাদের দেখাদেখি বাঘাও লাফিয়ে খাল পার হল–মঙ্গলে এসে তারও লাফ মারবার ক্ষমতা আশ্চর্যরকম বেড়ে গেছে।
বারবার লাফ মেরে অগ্রসর হলে পাছে হাঁপিয়ে পড়ি, সেই ভয়ে আমরা পায়ে হেঁটেই এগুতে লাগলুম। আর বেশি তাড়া করবারই বা দরকার কী, আমাদের সামনে এখন সারা রাত্রিটাই পড়ে রয়েছে।
