আমি সানন্দে বললুম, তোমরা লক্ষ্যভেদ করেছ শাবাশ, শাবাশ! ওই শোনো, উড়োজাহাজের বায়ুহীন কামরার ভিতরে বাতাস ঢোকার শব্দ হচ্ছে।
বিমল ও কুমার উৎসাহিত হয়ে আবার বন্দুক ছুড়লে এবং বন্দুকের ধ্বনির প্রতিধ্বনি থামতে না থামতে আরও দুটো তীব্র কু শব্দ যেন আকাশের বক্ষ ভেদ করে বেরিয়ে আসতে লাগল।
উড়োজাহাজ দুখানা তাড়াতাড়ি উপরে উঠে তিরবেগে পলায়ন করলে।
বিমল আনন্দে লম্ফ ত্যাগ করে বললে, জয়, বন্দুকের জয়!
.
চতুষ্পদ পক্ষী
সূর্য অস্ত গেছে।
চারিধারে মরুভূমির রাঙা বালি, তারই মাঝখানে এই ছোট পাহাড়টি। ভাগ্যে মঙ্গলে আবহাওয়া পৃথিবীর চেয়ে অনেক ঠান্ডা, নইলে আজ সারাদিনে আমাদের অবস্থা নিশ্চয়ই বিষম শোচনীয় হয়ে উঠত। তবুও তাপ যা পাচ্ছি, তাও বড় সামান্য নয়।
মঙ্গলের এই মরুভূমির আর এক বিশেষত্ব, এখানে জলের জন্যে একটুও ভাবতে হচ্ছে। না। কারণ মরুভূমির বুক চিরে খালের পর খাল চলে গেছে, তাদের কানায় কানায় পরিষ্কার স্বচ্ছ জল টলমল করছে। পাহাড় থেকে প্রায় আধ মাইল তফাতেই একটি খাল,–আমরা মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে জলপান করে আসছি। আমাদের সঙ্গে জল রাখবার পাত্র থাকলে বারবার আনাগোনা করতেও হত না। তবে, এখানে আধ মাইল পথ যেতে বেশিক্ষণ লাগে না, কারণ এখন আমরা এক-এক লাফে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারি কিনা!
খালের ধারে ধারে বনজঙ্গল আর শস্যখেতের পর শস্যখেত। কিন্তু এখানকার গাছপালা সব ছোট ছোট বোধহয় মাটির গুণ। একরকম গাছ এখানে খুব বেশি রয়েছে–দেখতে অনেকটা খেজুর গাছের মতো এবং এইগুলোই এখানে সবচেয়ে বড় জাতের গাছ। বনজঙ্গলের মধ্যে তিন-চার রকম পাখিও দেখলুম, কিন্তু পৃথিবীর কোনও পাখির সঙ্গেই তাদের চেহারা মেলে না। একরকম পাখির আকার বড় অদ্ভুত। তাদের দেহ চিলের মতো বড়, কিন্তু গায়ের রং একেবারে বেগুনি। তাদের পা চারটে করে, আর ল্যাজও পাখির মতো নয়–হনুমানের মতো লম্বা, ডগায় তেমনি লোমের গোছা। এই আশ্চর্য চতুষ্পদ পাখিগুলো আমাদের দেখেই তাড়াতাড়ি উড়ে পালিয়ে যেতে লাগল।
রাত্রি এল। আকাশে উঠল চাঁদ–কিন্তু তাদের আলো এত কম যে, অন্ধকার দূর হয় না বললেই চলে।
আজ সারা দিন অনাহারে কেটে গেল। কালও যে খেতে পাব, তার কোন আশা দেখছি না। গুহার ভিতরে প্রায় সকলেই শ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কেবল আমি, বিমল, কুমার আর কমল অন্ধকারে জেগে বসে আছি।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, এখন উপায় কী? খালি জল আর হাওয়া খেয়ে তো প্রাণ। বাঁচবে না!
আমি বললুম, এক আত্মসমর্পণ ছাড়া আর তো কোনও উপায় দেখছি না। এখন মনে হচ্ছে, পালিয়ে এসে আমরা ভালো করিনি।
কুমার বললে, আর আত্মসমর্পণ করাও চলে না। এখন আমাদের হাতে পেলে বামনরা আমাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই ভালো ব্যবহার করবে না।
আমি বললুম, কিন্তু এখানে থাকলেও আমাদের তিলে তিলে শুকিয়ে মরতে হবে।
সকলেই স্তব্ধ হয়ে ভাবতে লাগল।
বাইরে রাত তখন থমথম করছে।
আচম্বিতে আমাদের সকলকেই স্তম্ভিত করে, মরুভূমির বুক থেকে এক বিকট চিৎকার জেগে উঠল–বাপ বাপ, বাপরে বাপ! বাপ বাপ, বাপরে বাপ! বাপ বাপ, বাপরে বাপ! তারপরেই আবার সব চুপচাপ।
বিমল চকিত স্বরে বললে, কে এখানে মানুষের ভাষায় আর্তনাদ করছে?
কুমার বললে, বামনরা কি কোনও মানুষকে হত্যা করছে?
আমি অবাক হয়ে ভাবতে লাগলুম–এ আবার কী ব্যাপার!
ফের সেই বিকট আর্তনাদ : বাপ্ বা, বাপরে বাপ! বাপ বা, বাপরে বাপ! বাপ্ বাপ, বাপরে বাপ!–আবার সব চুপ।
বিমল বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল। আমি তার হাত চেপে ধরে বললুম, যেও না।
বিমল বললে, কেন?
বুঝতে পারছ না, এ মানুষের গলার আওয়াজ নয়।
তবে এ কী?
কাল সকালে খোঁজ নিলেই চলবে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিমল আবার বসে পড়ল।
বাইরে, মরুভূমির ভয়-মাখানো আলো-আঁধারের দিকে তাকিয়ে আমি চুপ করে বসে রইলুম;–গভীর রাত্রে এমন নির্জন স্থানে এই রহস্যময় আর্তনাদের কারণ কী? এ আমাদের চির-চেনা পৃথিবীর নয়, এখানকার সমস্ত ব্যাপারই অপূর্ব, প্রত্যেক পদেই নব নব বিস্ময় আর বিপরীত কাণ্ড, কাজেই কোনও হদিস না পেয়ে সে-রাত্রের মতো আমি নিদ্রার আশ্রয় গ্রহণ। করলুম। ঘুমোবার আগে আর সেই নিশীথ রাতের ভীষণ আর্তনাদ শুনতে পাইনি।
পরদিন প্রভাতে বাইরে বেরিয়ে আমরা পাহাড়ের চূড়ায় বসে পরামর্শ করছি, এমন সময় কমল চেঁচিয়ে উঠল–দেখুন, দেখুন, কারা সব যাচ্ছে!
তাড়াতাড়ি পাহাড়ের ধারে গিয়ে দেখলুম, নিচ দিয়ে প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন বামন সারি সারি অগ্রসর হচ্ছে। তাদের অনেকেরই মাথার উপরে এক-একটা ঝকা বা মোট বা বড় বড় পাত্র, কেউ কেউ পৃথিবীর মতো বাঁকও বহন করছে। আঁকাগুলো নানারকম ফল-ফসলে পরিপূর্ণ। বোধহয় এরা দূর গ্রাম থেকে শহরের বাজারে মাল বিক্রি করতে চলেছে। আমাদের খবর নিশ্চয়ই এরা জানে না, তাহলে কখনওই এপথ মাড়াবার ভরসা করত না!
বিমল মহা উৎসাহে বলে উঠল, ভাইসব, সামনেই খানা তৈরি! এসো আমরা ওদের আক্রমণ করি। বলেই তো সে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে গেল, আমরাও তার পিছনে পিছনে চললুম।
পাহাড় থেকে নীচে নামবামাত্রই বামনরা বিমলকে দেখতে পেল। জীবনে এই প্রথম মানুষের চেহারা দেখে প্রথমটা তারা ভয়ানক হতভম্ব হয়ে গেল। তারপর বিমলের পিছনে আবার আমাদের সবাইকে দেখে তারা বিষম এক আর্তনাদ করে পালাবার উপক্রম করলে, অমনি বিমল দিলে এক তিন-তলা উঁচু লম্ফ, সঙ্গে সঙ্গে আমরাও লাফ মারলুম। চোখের নিমেষে আমরা তাদের মোটামাট সমস্তই কেড়ে নিলুম, তারা কোনওই বাধা দিলে না, প্রাণ নিয়ে প্রাণপণে তারা যে যেদিকে পারলে পলায়ন করলে।
