আমরা উঠে আবার এক-এক লাফ মারলুম–আবার অনেকটা তফাতে গিয়ে পড়লুম। তার পরেই দেখি, সামনে একটা চওড়া খাল–যার জল আসছে সুদূর মেরুর তুষার-সাগর থেকে! পৃথিবীতে থাকলে এ খাল পার হতে গেলে সাঁতার দিতে হত, আজ কিন্তু এক এক লাফে খুব সহজেই আমরা খাল পার হয়ে গেলুম।
বিমল যাচ্ছিল আমাদের আগে, লাফের পর লাফ দিতে-দিতে। এইভাবে অতি শীঘ্রই আমরা শত্রুদের কাছ থেকে প্রায় তিন মাইল তফাতে গিয়ে পড়লুম। তারপর লাফ মারা বন্ধ করে বিমল বললে, বিনয়বাবু, এইবার বিশ্রাম করা যাক, বড় হাঁপ ধরছে।
পিছনে চেয়ে দেখলুম, কোনওদিকে শত্রুর চিহ্ন নেই–কেবল আমাদের সঙ্গীরা মস্ত মস্ত লাফ মেরে এগিয়ে আসছে।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে বললুম, বিমল ভায়া, এখনি বিশ্রাম করলে তো চলবে না! বামনরা যদি উড়োজাহাজ নিয়ে আমাদের আক্রমণ করে, তাহলে আমরা এই খোলা জায়গায় কিছুতেই আত্মরক্ষা করতে পারব না!
বিমল হতাশভাবে বললে, তাহলে উপায়?
রামহরি বললে, খোকাবাবু, খানিক তফাতে ওই একটা ছোট পাহাড় রয়েছে, ওখানে হয়তো লুকোবার ঠাঁই পাওয়া যেতে পারে।
রামহরি বড় মন্দ কথা বলেনি। আমরা আবার কয় লাফে সেই পাহাড়ের কাছে গিয়ে হাজির হলুম। রামহরি মানুষ ক্যাঙারুর মতন লাফাতে লাফাতে পাহাড়ের উপরে উঠে অদৃশ্য হয়ে গেল। মিনিট-পাঁচেক পর ফিরে এসে সে জানালে, পাহাড়ের ভিতরে খুব বড় একটা গুহা আছে–সেখানে আমাদের সকলের স্থান-সঙ্কুলান হতে পারে।
ঠিক সেই সময়েই আকাশে কীসের একটা শব্দ উঠল। মুখ তুলে চেয়ে দেখি, বামনদের উড়োজাহাজ। একখানা নয়, দুখানা নয়, একেবারে বিশ-পঁচিশখানা!
আমি চেঁচিয়ে বললুম, চলো চলো, গুহায় চলো।
.
আবার উড়োজাহাজ
পাহাড়টা বেশি উঁচু নয়–বড় জোর দুশো ফুট। তার গায়ে কোথাও গাছপালার চিহ্ন নেই। আমরা সকলে সেই কালো, ন্যাড়া পাহাড়ের অলিগলি পথ দিয়ে লাফাতে লাফাতে উপরে উঠে একটা জায়গায় গিয়ে দেখলুম, সামনেই একটা মস্ত গুহ্যাঁ।
সব আগে আমি ভিতরে গিয়ে ঢুকলুম। গুহাটির মুখ ছোট বটে, কিন্তু ভিতরটা বেশ লম্বা-চওড়া–সেখানে অন্তত একশো জন লোক অনায়াসেই হাত-পা ছড়িয়ে বাস করতে পারে।
গুহার ভিতর থেকে সবাইকে আমি চেঁচিয়ে ডাকলুম।
সকলে একে-একে গুহার ভিতরে এসে ঢুকল।
আমি বললুম, এখন আমরা কতকটা নিরাপদ হলুম।
কমল বললে, কিন্তু আমরা খাব কী? মানুষ তো আর না খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে না!
আমি বললুম, আগে উপস্থিত বিপদ থেকে রক্ষা পাই, তারপর পেটের কথা ভাবা যাবে-অখন।
বামনদের উড়োজাহাজগুলোর শব্দ তখন খুব কাছে এসে পড়েছে। গুহার মুখ থেকে আকাশের দিকে উঁকি মেরে আমি দেখলুম, অধিকাংশ উড়োজাহাজ নানাদিকে ছড়িয়ে পড়ে উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু দু-খানা উড়োজাহাজ এই পাহাড়ের ঠিক উপরেই ঘুরছে, ফিরছে-দানব-দেশের বিপুল দুটো ডানা-ছড়ানো চিলের মতো। এরা বোধহয় বুঝতে পেরেছে যে, আমরা এই পাহাড়ের ভিতরেই লুকিয়ে আছি।
হঠাৎ আবার সেই ভীষণ শব্দ জেগে উঠল–যেন হাজার-হাজার শ্লেটের উপরে কারা হাজার-হাজার পেনসিল ঘর্ষণ করছে।
আমি চেঁচিয়ে বললুম, সাবধান, কেউ গুহার বাইরে যেও না! বামনরা আবার শোষক অস্ত্র ব্যবহার করছে!
একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাঁপটা গুহার ভিতরে ঢুকে সকলকে কাঁপিয়ে দিলে। আমি গুহার মুখ ছেড়ে কয়েক পা পিছিয়ে এসে দাঁড়ালুম কী জানি বলা তো যায় না!
শব্দ আরও বেড়ে উঠল। গুহার ভিতর থেকেই দেখা গেল, পাহাড়ের গা থেকে একরাশি নুড়ি ও কতকগুলো ছোট-বড় পাথর সেই শোষক-যন্ত্রের বিষম টানে হু-হু করে শূন্যে উঠে গেল।
বিমল সভয়ে বললে, বাইরে থাকলে এতক্ষণে আমাদেরও ওই দশা হত।
আচম্বিতে শব্দটা আবার থেমে গেল–ঠান্ডা হাওয়াও আর বইছে না।
আমি আবার ধীরে-ধীরে গুহার মুখে এগিয়ে গেলুম। মাথা বাড়িয়ে উপর পানে তাকাতেই দেখলুম, উড়োজাহাজ দুখানা ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের দিকে নেমে আসছে।
সকলেই তখন গুহাতলে শুয়ে বা বসে বিশ্রাম করছিল, আমার কথা শুনে সকলেই আবার লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠল।
বিমল শুষ্ক স্বরে বললে, আসুক ওরা। আমরা যুদ্ধ করতে করতে প্রাণ দেব, তবু ওদের হাতে আর বন্দি হব না।
অন্য সকলে উচ্চস্বরে বললে, হ্যাঁ, আমরা প্রাণ দিতে প্রস্তুত!
আমি বললুম, তোমরা ঠান্ডা হয়ে আমার কথা শোনো। আপাতত বোধহয় কারুকে প্রাণ দিতে হবে না। তোমাদের মনে আছে তো, এদের উড়োজাহাজ এমন জিনিস দিয়ে তৈরি, যা বন্দুকের গুলি সইতে পারে না। বিমল আর কুমার বন্দুক ছুড়লেই উড়োজাহাজ দু-খানা নিশ্চয়ই জখম হয়ে পালিয়ে যাবে।
বিমল বললে, ঠিক কথা! কুমার, শিগগির বাইরে এসো!
বিমল আর কুমার বন্দুক নিয়ে গুহার মুখে গিয়ে দাঁড়াল।
আমি বললুম, তোমরা কিন্তু গুহার মুখ ছেড়ে এগিয়ে যেও না–ওরা আবার শোষক যন্ত্র ব্যবহার করতে পারে।
আমিও গুহার মুখে গিয়ে দেখলুম, উড়োজাহাজ দুখানা খুব কাছে নেমে এসেছে। বন্দুকের লক্ষ্যের মধ্যে না আসা পর্যন্ত বিমল ও কুমার অপেক্ষা করতে লাগল।
উড়োজাহাজ আরও নীচে এলক্রমে আরও, আরও নীচে।
বিমল লক্ষ্য স্থির করতে বললে, কুমার, সময় হয়েছে। যে উড়োজাহাজখানা বেশি নীচে নেমেছে, ওরই ওপরে গুলি চালাও।
দুজনেই পরে পরে বন্দুক ছুড়লে। সঙ্গে সঙ্গে উপর থেকে দুটো উচ্চ ও তীক্ষ্ণ শব্দ শোনা গেল ইঞ্জিনের কু দেওয়ার মতো।
