আমি বললুম, বোধহয় আমাদেরই কথা হচ্ছে। তোমরা কেউ ব্যস্ত হোয়ো না–শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরে দেখো, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়!
উড়োজাহাজের কর্তা হঠাৎ একটা ভেরিতে জোরে ফুঁ দিলে এবং বোধহয় তাহার উত্তরেই শহরের ভিতর থেকেও আর একটা ভেরির তীব্র আওয়াজ হল। তার একটু পরেই দেখা গেল শহর থেকে পঙ্গপালের মতন দলে দলে বামন-সেপাই বেগে বেরিয়ে আসছে।
কুমার সভয়ে বলে উঠল, এইবারে ওরা আমাদের আক্রমণ করবে!
আমি বললুম, আমরা যদি ওদের কথা শুনি, তাহলে ওরা নিশ্চয়ই আক্রমণ করবে ।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, দেখুন–দেখুন! সেপাইদের সঙ্গে প্রকাণ্ড কি একটা যন্ত্র আসছে! ওটা কি এদেশি কামান?
তাই তো, মস্তবড় একটা ঘণ্টার মতো কী ওটা? উঁচুতে সেটা পঞ্চাশ-ষাট ফুট ও চওড়ায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ ফুটের কম নয় এবং যন্ত্রটা টেনে আনছে কতকগুলো অদ্ভুত আকারের জন্তু। এ জন্তুগুলোকে দেখতে অনেকটা উটের মতো, তবে উটদের শিং থাকে না, কিন্তু এদের প্রত্যেকের মাথায় একটা করে খুব লম্বা শিং আছে। আর এদের আকারও উটের চেয়ে অনেক ছোট এবং গায়ের বর্ণও মিশমিশে কালো। এগুলো মঙ্গল গ্রহের গরু, না ঘোড়া?
উড়োজাহাজের কাছে এনে যন্ত্রটা দাঁড় করানো হল। দেখলুম তার তলায় চারখানা বড় বড় চাকা রয়েছে। পাশে দাঁড়িয়ে একজন বামন কি-একটা কল টিপে দিলে, অমনি সেই ঘণ্টার মতন যন্ত্রটা উপরপানে উঠে এমনভাবে কাত হয়ে রইল যে, তার গর্তের দিকটা এল উড়োজাহাজের দিকে।
ধাঁ করে আমার মাথায় একটা সন্দেহ জেগে উঠল। যেরকম শোষক-যন্ত্রের সাহায্যে বামনরা আমাদের পৃথিবী থেকে ধরে এনেছে, এটাও তারই রূপান্তর নয় তো? নিশ্চয়ই তাই!
বিমলকে বললুম, বিমল, তোমার বন্দুকের জারিজুরি আর খাটছে না। এরা আবার একটা নতুন রকম শোষক-যন্ত্র এনেছে।
বিমল বললে, কেন, কী মতলবে?
আমরা যদি ওদের কথামতো কাজ না করি, তাহলে ওরা ওই যন্ত্র দিয়ে আবার আমাদের শুষে নেবে। ও যন্ত্রের শক্তি দেখেছ তো?
বিমল বিষণ্ণভাবে মাথা নেড়ে বললে, তাহলে আপাতত বামনদের কথামতোই কাজ করা যাক কী বলেন?
নিশ্চয়ই। ওদের কথা শুনলে আমাদের লাভ বই লোকসানও তো নেই!
কিন্তু ওরা যদি আবার কুকুর-বিড়ালের মতো আমাদের বন্দি করে রাখবার চেষ্টা করে?
উপায় নেই।
বিমল ম্লানমুখে স্তব্ধ হয়ে রইল। ইতিমধ্যে একদল বামন-সেপাই ভয়ে-ভয়ে আমাদের দিকে খানিক এগিয়ে এল, তারপর তফাত থেকেই ইশারা করে আমাদের উড়োজাহাজ ছেড়ে নামতে বললে।
সকলের আগেই সুবোধ বালকের মতো বিমল অগ্রসর হল। বাইরে হাজার-হাজার বামন সেপাই হাজার-হাজার সোনার বর্শা তুলে প্রস্তুত হয়ে রইল–একটু বেগতিক দেখলেই আমাদের আক্রমণ করবে।
উড়োজাহাজ থেকে নামবার জন্যে এক জায়গায় প্রায় তিনফুট উঁচু একখানা মই লাগানো ছিল। বিমলের মাথায় কি খেয়াল হল, সে মই দিয়ে না নেমে, একটি লাফ মেরে নামতে গেল কিন্তু পরমুহূর্তেই তার দেহ মাটি থেকে প্রায় পনেরো হাত উঁচুতে গিয়ে উঠল এবং তারপর প্রায় ত্রিশ হাত তফাতে, বামন-সিপাইদের মাঝখানে ধুপ করে গিয়ে পড়ল।
বামনরা সবাই মহাবিস্ময়ে ও আতঙ্কে চিৎকার করে বিমলের কাছ থেকে দূরে সরে গেল। এমন ব্যাপার বোধহয় তারা জীবনে কখনও দেখেনি।
আমরাও সকলে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলুম–এ কী অমানুষিক কাণ্ড!
.
পলায়ন
বিস্ময়ের প্রথম চমকটা কেটে যাবার পরেই একটা মস্ত কথা আমার মনে পড়ে গেল– মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ হচ্ছে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের একশো ভাগের আটত্রিশ ভাগ মাত্র। অর্থাৎ পৃথিবীতে যার ওজন হবে একশো সের, মঙ্গলে তার ওজন আটত্রিশ সেরের চেয়ে বেশি হবে না। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের চাপও পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগের বেশি নয়।
বিমলের এই আশ্চর্য লত্যাগের গুপ্ত রহস্য আমি অল্প কথায় যারা বুঝতে পারলে তাদের বুঝিয়ে দিলুম।
এদিকে বামনরা সবাই মনে করলে, বিমল তাদের আক্রমণ করতে উদ্যত হয়েছে। তখনি একদল বামন বিমলের দিকে বেগে ছুটে গেল, আর একদল এগিয়ে এল সেই ভীষণ শোষক যন্ত্র নিয়ে আমাদের দিকে।
মনে-মনে আমি প্রমাদ গুনলুম। আবার ওই ভয়ানক যন্ত্র যদি আমাদের গ্রাস করে, তাহলে আমরা বাঁচব না। বাঁচলেও চিরকাল শিকল বাঁধা জন্তুর মতো কারাগারে বাস করতে হবে।
কুমার তার বন্দুক তুললে।
আমি বললুম, রাখো তোমার বন্দুক! যদি বাঁচতে চাও, পালাও।
পালাব? কোথায় পালাব?
বাইরে লাফ মারো।
বামনরাও তো আমাদের পিছনে আসবে।
এলেও ওরা আমাদের মতো লাফ মারতে পারবে না। দেখলে না, বিমলের লাফ মারবার ক্ষমতা দেখে ওরা কীরকম হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল! আর কথা নয়–দাও লাফ!
এই বলেই বাইরের দিকে আমি দিলুম এক লাফ। সেই এক লাফেই আমি একেবারে তিনতলার সমান উঁচুতে উঠে প্রায় চল্লিশ হাত জমি পার হয়ে গেলুম। নামবার সময় ভাবলুম, এত উঁচু থেকে পড়ে হয়তো আমার হাড়গোড় গুঁড়িয়ে ছাতু হয়ে যাবে। কিন্তু যখন ফের মাটিতে এসে অবতীর্ণ হলুম, তখন টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলুম বটে, কিন্তু দেহের কোথাও একটু চোট লাগল না। আমি মাটি থেকে উঠতে না উঠতেই আমার চারপাশে ধপাধপ করে আমার অন্যান্য সঙ্গীরা ঠিক ল্যাজকাটা হনুমানের মতন একে একে মাটির উপরে এসে পড়ে গড়াগড়ি দিতে লাগল। সে এক অবাক কাণ্ড! আমাদের কাছাকাছি যত বামন ছিল, তারা তো ভয়ে কোথায় চম্পট দিলে তার কোনও পাত্তা পাওয়া গেল না।
