পৃথিবীর মতো মঙ্গলও সূর্যের চারদিকে ঘোরে এবং ঘোরা শেষ করতে সে পৃথিবীর চেয়ে দু-গুণ সময় নেয়,–অর্থাৎ ৬৮৭ দিন। সুতরাং আমাদের প্রায় দুই বৎসরে হয় তার এক বৎসর। এর দ্বারা আরও বোঝা যাবে মঙ্গল প্রতি দুই বৎসর দুই মাস অন্তরে একবার করে ঘুরতে ঘুরতে পৃথিবীর কাছে আসে। সে সময়ে প্রায় ছয় মাস কাল সে পৃথিবীর চোখের সামনে থাকে, তারপর আবার হাজার হাজার ক্রোশ দূরে, সূর্যের ওপারে অদৃশ্য হয়ে যায়। মঙ্গলের দিন আমাদের দিনের চেয়ে সাঁইত্রিশ মিনিটের চেয়ে কিছু বেশি।
কাল একটা ব্যাপার দেখে বিমল, কুমার আর কমল ভারি অবাক হয়ে গেছে। আমি কিন্তু মোটেই আশ্চর্য হইনি, কারণ ব্যাপারটা আমার আগে থেকেই জানা ছিল।
ব্যাপারটা এই মঙ্গল গ্রহে একজোড়া চাঁদ আছে। একটির নাম ফোবোস–মঙ্গলের ঠিক মাঝখান থেকে সে ৫,৮০০ মাইল দূরে থাকে। প্রতি সাত ঘণ্টা উনচল্লিশ মিনিটে সে একবার করে মঙ্গলের চারদিকে ঘুরে আসে–অর্থাৎ প্রতিদিনে তিনবার করে। ফোবোসের উদয় হয় পূর্বদিকে নয়, মঙ্গলের পশ্চিম দিকে এবং চার ঘণ্টা পরে পূর্বদিকে সে অস্ত যায়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই সে খণ্ড থেকে পূর্ণ বা পূর্ণ থেকে খণ্ড চাঁদের রূপ ধারণ করে।
আর এক চাঁদের নাম ডিমোস–মঙ্গল থেকে এর দূরত্ব আরও বেশি–১৪,৬০০ মাইল। প্রতি ত্রিশ ঘণ্টা আঠারো মিনিটে সে একবার করে মঙ্গলের চারিদিকে ঘুরে আসে। প্রতি তিন দিন অন্তর সে অস্ত যায় এবং এরই মধ্যে তার আকার খণ্ড থেকে পূর্ণ চাঁদের মতো হয়ে ওঠে। এর উদয় হয় পূর্বদিকেই।
ফোবোস আর ডিমোস আকারে পৃথিবীর চাঁদের চেয়ে ঢের বেশি ছোট। ডিমোসের চেয়ে ফোবোসের আকার কিছু বড়–তার আড়াআড়ি মাপ প্রায় সাত মাইল। ডিমোসের আড়াআড়ি মাপ পাঁচ কি ছয় মাইল। এই জোড়া চাঁদ কিন্তু মঙ্গলের রাত্রের অন্ধকারকে দূর করতে পারে না। কারণ আমাদের পৃথিবীর পূর্ণ চাঁদের ষাট ভাগের এক ভাগ আলো নিয়ে ফোবোসের কারবার, আর, ডিমোস দেয় তার বারোশো ভাগের এক ভাগ মাত্র আলো।
মঙ্গলের মেঘরাজ্য পার হয়ে আমরা আরও নীচে নেমে এসেছি–আমাদের চোখের উপরে জেগে উঠেছে এক কল্পনাতীত দৃশ্য।
পায়ের তলায় দেখা যাচ্ছে ধু-ধু মরুভূমি এবং তার উপর দিয়ে হু-হু করে বয়ে যাচ্ছে। রোদের তপ্ত রাঙা বালির ঝড়। সে ঝটিকাময়ী মরুভূমির যেন আদি অন্ত নেই। মরুভূমির বুক ভেদ করে সারি-সারি খাল, তাদের সংখ্যা গণনায় আসে না। স্থানে-স্থানে যেন খালের জাল। বোনা রয়েছে, কোথাও একটা খালের উপর দিয়ে আর একটা খাল আড়াআড়িভাবে কাটা হয়েছে, আবার কোথাও বা জোড়া-জোড়া খাল পাশাপাশি চলে গেছে–আকার দেখলে বেশ অনুমান করা যায় যে, লম্বায় কোনও কোনও খাল তিন-চার হাজার মাইলের কম নয়। সোজাসুজিভাবে এতগুলো সুদীর্ঘ খাল কাটা যে কীরকম পরিশ্রম-সাধ্য ব্যাপার তা ভাবলেও স্তম্ভিত হতে হয়। আর এ কাজ হচ্ছে, ওই বামন জীবদের। ধন্য তাদের বুদ্ধি, ধন্য তাদের শক্তি!
যেখান দিয়েই খাল গিয়েছে, সেইখানেই তার দুই পাশে, শ্যামল বনের রেখা। উড়োজাহাজ আরও নীচে নামলে পর দেখলুম, স্থানে স্থানে অনেক ঘরবাড়ি রয়েছে, নিশ্চয়ই সেগুলো নগর। মাঝে মাঝে ছোট-বড় পাহাড়ও চোখে পড়ল।
খানিক পরেই উড়োজাহাজ একটা বড় শহরের উপরে এসে ঘুরে ঘুরে নামতে লাগল। নীচের শহর থেকে ঘন ঘন ঘণ্টা ও ভেরির ধ্বনি ও বহু কণ্ঠের চিৎকার শুনতে পেলুম,– চেয়ে দেখলুম, শহরের প্রত্যেক বাড়ির ছাদের উপরে ও পথে পথে বামনদের জনতা। হঠাৎ শহর থেকে আরও কুড়ি-পঁচিশখানা ছোট ছোট উড়োজাহাজ আমাদের দিকে উড়ে এল,–আগ বাড়িয়ে নিয়ে যাবার জন্যে।
আমি ফিরে বললুম, বিমল, তোমরা সব প্রস্তুত হও, এইবারে আমাদের নামতে হবে।
বিমল বন্দুকটা একবার নেড়ে-চেড়ে পরখ করে, কাঁধের উপরে রেখে বললে, আমি প্রস্তুত।*
(*বিনয়বাবু স্বয়ং মঙ্গল গ্রহের যে বর্ণনা লিখেছেন, আমাদের কথার চেয়ে তা বেশি চিত্তাকর্ষক হবে বলে আমরা এবার থেকে তাঁর ডায়ারির লেখাই তুলে দেব। বিনয়বাবুর ডায়ারিতে মঙ্গল গ্রহের যেসব অদ্ভুত তথ্য আছে, তার অধিকাংশই প্রমাণিত সত্য, যাঁদের বিশ্বাস হবে না, তাঁরা এ সম্বন্ধে সিয়াপ্যারেলি, লাওয়েল, গান, স্ট্যানলি উইলিয়স ও শ্লামেরিয়ন প্রভৃতি বিখ্যাত পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের মতামত পড়ে দেখতে পারেন। ইতি লেখক।)
.
এক লাফে সাগর পার
উড়োজাহাজ একটা শহরের প্রান্তে এসে নামল।
সঙ্গে-সঙ্গে শহরের ভিতর থেকে কাতারে কাতারে বামন এসে উড়োজাহাজের চারিদিক ঘিরে ফেললে। তাদের গোল-গোল ভাঁটার মতো চোখগুলো আগ্রহে ও বিস্ময়ে আরও বিস্ফারিত হয়ে উঠল এবং তাদের সকলেরই মুখে একই জয়ধ্বনি–হংচা হংহংচা হং!
উড়োজাহাজের একদিককার প্রধান দেওয়ালটা অনেকখানি সরে গেল এবং সেইখানে একদল বামন-সেপাই বর্শা তুলে দুইধারে সার বেঁধে দাঁড়াল–যাতে বাইরের বামনরা হুড়মুড় করে ভিতরে না ঢুকে পড়তে পারে।
কেবল একজন বামন–বোধহয় সে উড়োজাহাজের কর্তা–এগিয়ে গিয়ে নীচে নেমে পড়ল। বাইরে জনতার ভিতর থেকেও তিনজন জমকালো পোশাক-পরা বামন বেরিয়ে এসে দাঁড়াল।
আমরা সবাই এক জায়গায় দল বেঁধে দাঁড়িয়ে বামনদের কাণ্ড দেখতে লাগলুম।
বিমল বললে, দেখুন বিনয়বাবু, ওরা কথা কইতে কইতে ক্রমাগত আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখছে।
