কিন্তু এত বিপদেও আমার মনে আনন্দ হচ্ছে। যে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে আমি আজীবন আলোচনা করে আসছি, যার জন্যে পৃথিবীর সর্বত্র কত তর্ক, কত সন্দেহ, কত জল্পনা কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে, এবারে আমি সশরীরে তারই মধ্যে গিয়ে বিচরণ করতে পারব! আমি কী ভাগ্যবান।
খুব শীঘ্রই আমরা যে গ্রহে গিয়ে অবতীর্ণ হব, তার পরিচয় জানি বলেই আমার বিশেষ কিছু ভয় হচ্ছে না। কিন্তু বিমল, কুমার ও কমল বোধহয় অত্যন্ত দুর্ভাবনায় পড়েছে। আর রামহরির তো কথাই নেই, সে সর্বদাই জড়ভরতের মতো এক কোণে বসে থাকে, কারুর সঙ্গে কথাবার্তা পর্যন্ত কইতে চায় না।
তাদের আশ্বস্ত করবার জন্যে সেদিন বললুম, আচ্ছা, তোমরা এতটা বিমর্ষ হয়ে আছ কেন বলো দেখি? তোমাদের বিশেষ ভয় পাবার কোনও কারণ তো দেখি না!
বিমল বললে, বিনয়বাবু, আমাদের মতো অবস্থায় পড়লে পাগল ছাড়া আর কেউ খুশি হতে পারে না। জলের মাছকে ডাঙায় তোলবার সময়ে মাছেরা কি খুশি হতে পারে? আমাদেরও অবস্থা কি অনেকটা সেইরকম হয়নি? আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি, কোন সৃষ্টিছাড়া বিপদের রাজ্যে, কে তা বলতে পারে?
আমি বললুম, আমরা যে মঙ্গল গ্রহে যাচ্ছি সে কথা তো আগেই তোমাদের বলেছি। মঙ্গল গ্রহে যখন জীবের বসতি আছে, তখন তোমাদের এতটা চিন্তিত হওয়ার কোনওই কারণ নেই। মঙ্গল গ্রহের ভিতরের অবস্থা অনেকটা পৃথিবীরই মতন। সেখানেও যে পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল আছে, তার অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে। মঙ্গল গ্রহে কুয়াশা আর মেঘ যখন আছে তখন পৃথিবীর জীবদের সব আগে যা দরকার সেই বায়ুমণ্ডলও নিশ্চয়ই আছে। সুতরাং জলের মাছের ডাঙার পড়ার মতো অবস্থা আমাদের কখনই হবে না, সে বিষয়ে তোমরা নিশ্চিত থাকো।
কমল বললে, কিন্তু মঙ্গল গ্রহের রং অমন রাঙা কেন?
আমি বললম, পণ্ডিতরা দেখেছেন মঙ্গলের পাঁচ ভাগের তিন ভাগই হচ্ছে মরুভূমি সেখানে জল বা ফল-ফসল কিছুই নেই, খালি ধু-ধু করছে লাল বালি আর লাল বালি। এই লাল বালির মরুভূমির জন্যেই মঙ্গলকে অমন রাঙা দেখায়।
আরও কতগুলো দিন একইভাবেই কেটে গেল।
এখন আমরা পৃথিবীর আকর্ষণের মধ্যেও নেই–এখন কেবল মঙ্গল আমাদের টানছে। মঙ্গলের আকারও মস্ত বড় হয়ে উঠেছে, আর এখন তাকে দেখতে হলে উপর দিকে নয়, নীচের দিকে তাকিয়ে দেখতে হয়।
সেদিন রাত্রে এক অপূর্ব দৃশ্য দেখলুম! দূরে, বহু দূরে–মাথার উপরে জেগে উঠল উজ্জ্বল পৃথিবী, যেন চাঁদের মতন! আমার মনে হল, মা যেমন কোলের ছেলের মুখের উপরে মুখ এনে নত নেত্রে চেয়ে রাত জেগে বসে থাকেন, পৃথিবীও আমাদের পানে ঠিক সেইভাবেই স্নেহমাখা দরদভরা চোখে নির্নিমেষে তাকিয়ে আছে।
উড়োজাহাজের সমস্ত বন্দিদের ডেকে সেই দৃশ্য দেখালুম। সকলেই দুঃখিতভাবে কাতর আগ্রহের সঙ্গে অথচ গভীর বিস্ময়ে মা পৃথিবীর উদ্দেশে ভক্তিভরে প্রণাম করল, কেউ কেউ আবার চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিলে–আমারও মনটা যেন কেমন কেমন করতে লাগল। হায়, আর কি ওই মায়ের কোলে গিয়ে উঠতে পারব?
.
জোড়া চাঁদের মুল্লুকে
ওই মঙ্গল গ্রহ! আগেকার চেয়ে অনেক কাছে, কিন্তু এখনও বহু দূরে!
বামনরা এখনও আমাদের কাছে ঘেঁষে না, আমরা তাদের সঙ্গে মেলামেশার অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু তাদের দিকে এগুলেই তারা পালিয়ে গিয়ে কোনও একটা কামরায় ঢুকে পড়ে, ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয়। অথচ আমাদের গতিবিধি লক্ষ করবার জন্যে এখন দুরে দুরে চারিদিকে সশস্ত্র পাহারারও অভাব নেই।
বিমল সেদিন দৈবগতিকে একটা বামনকে ধরে ফেলেছিল। কিন্তু ধরামাত্র বামনটা মহা আতঙ্কে বিকট এক চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ল। বিমল তখন বাধ্য হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে ফিরে এল।
আজ আমাদের এক পরামর্শসভা বসেছিল। বিমল, কুমার, কমল, রামহরি এবং অন্যান্য বন্দিদের ডেকে আমি বললাম, দেখো, শীঘ্রই আমরা মঙ্গল গ্রহে গিয়ে উপস্থিত হব। বামনরা এখন ভয়ে আমাদের কিছু বলছে না বটে, কিন্তু স্বদেশে গিয়ে তারা যে আমাদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করবে, তার কিছুই স্থিরতা নেই। তখন তারা দলে ভারী হবে, কেবলমাত্র দুটো বন্দুক দেখিয়ে আমরা বেশিদিন তাদের ভয় দেখাতেও পারব না। কাজেই তখন আমাদের প্রতি পদেই সাবধান হয়ে থাকতে হবে। মঙ্গল গ্রহে গিয়ে তোমরা কেউ যেন দলছাড়া হোয়ো না, সকলে সর্বদাই একসঙ্গে থেকো, একসঙ্গে ওঠা বসা চলা-ফেরা কোরো। যা করবে সকলকে জানিয়ে করবে। এ ছাড়া আমাদের আত্মরক্ষার আর কোনও উপায় নেই।
আরও কয়েকদিন গেল।
মঙ্গল গ্রহ এখন আমাদের চোখের উপরে বিরাট একখানা থালার মতন ভেসে উঠেছে। সেখানে পৌঁছতে বোধহয় আর একদিনও লাগবে না।
আজ সকালে উঠে দেখলুম, ঘন মেঘ ও কুয়াশার ঘোমটার মঙ্গল গ্রহের মুখ ঢাকা। মাঝে মাঝে সে ঘোমটা সরে যাচ্ছে, আর ভিতর থেকে লাল, সবুজ বা সাদা রঙের আভা ফুটে উঠছে। ওই লাল রং নিশ্চয় মরুভূমির, এবং সবুজ ও সাদা রং আসছে বোধহয় মঙ্গলের চাষ-কেত, অরণ্য ও মেরুদেশের তুষার-রাশি থেকে।
মঙ্গলের বয়স পৃথিবীর চেয়ে ঢের বেশি। তার ভিতরে যে-সব নদ-নদী সমুদ্র ছিল, তা এখন শুকিয়ে গেছে। পণ্ডিতদের মতে, একদিন পৃথিবীরও এই দশা হবে। জলের অভাবে জীব বাঁচতে পারে না সৃষ্টির প্রথম জীবের জন্ম হয়েছে জলের ভিতরেই। কাজেই মঙ্গলের বামনরা আত্মরক্ষার জন্যে শেষ একমাত্র উপায় অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছে। মঙ্গলেরও মেরু প্রদেশে পৃথিবীর মতো তুষারের রাজ্য আছে। মঙ্গলের বাসিন্দারা শত-শত ক্রোশ ব্যাপী খাল। কেটে সেই বরফ গলা জল নিয়ে এসে চাষ-আবাদ করে। এমন খাল তারা দুটো একটা নয়– কেটেছে অসংখ্য।
