তারা সকলেই একসঙ্গে বলে উঠল, আপনার কথায় আমরা প্রাণ পর্যন্ত দিতে রাজি আছি।
বিনয়বাবু বললেন, যাদের আশ্রয়ে আমরা থাকতে বাধ্য হয়েছি তারা এখন আমাদের পরম শত্রু। অথচ তারা অন্ন-জল না দিলে আমরা প্রাণে বাঁচব না। অতএব এখন আমাদের। প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, অন্ন-জলের ব্যবস্থা করা।
বিমল বললে, কিন্তু কী করে সে ব্যবস্থা হবে?
বিনয়বাবু বললেন, ওই দেখো, বামনরা সবাই দূর থেকে আমাদের ভাবভঙ্গি নিরীক্ষণ করছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে আমাদের বন্দুকের মহিমা দেখে ওরা বিলক্ষণ ভয় পেয়েছে, আর সেইজন্যেই এদিকে এগুতে সাহস করছে না। কিন্তু প্রবাদে যখন বলে যে, পর্বত মহম্মদের কাছে না এলে মহম্মদই পর্বতের কাছে যেতে পারেন তখন আমরাই বা ওদের কাছে যেতে পারব না কেন? তোমরা সবাই আমার সঙ্গে এসো। ভালো কথায় ওরা যদি আমাদের খাবার না দেয়, তাহলে আমরা আবার যুদ্ধ ঘোষণা করব।
সব আগে বিনয়বাবু, তার পিছনে বন্দুক বাগিয়ে বিমল আর কুমার, তার পরে বাকি সবাই দলে দলে অগ্রসর হল।
বামনরাও দলবদ্ধ হয়ে একদিকে দাঁড়িয়ে ভয় ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে সমস্ত দেখতে লাগল।
বিনয়বাবু দল ছেড়ে একটু এগিয়ে গিয়ে, পেটে ও মুখে হাত দিয়ে আহারের অভিনয় করে ইশারায় জানালেন যে তাঁরা সবাই ক্ষুধার্ত অবিলম্বেই খাদ্যদ্রব্য আনতে হবে। বামনরা খানিকক্ষণ ধরে পরস্পরের সঙ্গে কি পরামর্শ করলে। তারপর একজন বামন এগিয়ে এসে তেমনি ইশারায় বুঝিয়ে দিল যে, তারা শীঘ্রই সকলের জন্যে খাদ্যদ্রব্য পাঠিয়ে দেবে।
বিনয়বাবু আনন্দিত কণ্ঠে বললেন, যাক, খাবার চাইতে এসে এটাও বেশ বোঝা গেল যে, বামনরা আমাদের আর ঘাটাতে চায় না। এ অবস্থায় ওদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করতেও বিশেষ বেগ পেতে হবে না.., সকলেই শক্তের ভক্ত! এসো বিমল, আমরা সেই পুকুর চৌবাচ্চার ধারে, বটগাছের তলায় গিয়ে বিশ্রাম করি গে।
সকলে আবার অগ্রসর হলেন। খানিক দূরে যেতেই বিলাসপুরের বটগাছ পাওয়া গেল। তার ডালে বসে বানররা মানুষ দেখে আবার আনন্দে কলরব করে উঠল।
বিনয়বাবু চলতে চলতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়লেন। তারপর উড়োজাহাজের স্বচ্ছ আবরণের ভিতর দিয়ে একবার নীচের দিকে ও একবার উপর দিকে তাকিয়ে বললেন, বিমল, দেখো!
কী বিনয়বাবু?
নীচের দিকে কী দেখছ?
ধু-ধু শূন্য!
এই শূন্যতার অর্থ বুঝতে পারছ কি? পৃথিবী আর দেখা যাচ্ছে না, আমরা এখন অন্য গ্রহে যাচ্ছি। উড়োজাহাজ স্বদেশে ফিরছে।
বিমল স্তম্ভিত ও স্তব্ধভাবে নীচের সেই বিরাট শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইল–যে শূন্যতার মাঝখানে তাদের সকলকার মা, পৃথিবীর শ্যামল মুখ হারিয়ে গেছে, হয়তো এ জীবনের মতো!
বিনয়বাবু আবার বললেন, উপর পানে তাকিয়ে দেখো!
বিমল মাথা তুলে দেখে বললে, উপরেও তো দেখছি শুধুই শূন্যতা!…না, না, একটা রাঙা বড় তারা জ্বলজ্বল করছে!
হ্যাঁ, ওই হচ্ছে মঙ্গল গ্রহ। ওর ওই রাঙা রং, দেখেই ইউরোপে সেকালের লোকেরা মঙ্গলকে যুদ্ধ-দেবতার পদে অভিষিক্ত করেছিল। মঙ্গল গ্রহ আকারে খুব ছোট, পণ্ডিতরা হিসাব করে বলেছেন, মঙ্গলের আড়াআড়ি মাপ চার হাজার আটশো মাইলের বেশি নয়, ওর উপরটা পৃথিবীর চার ভাগের এক ভাগের চেয়ে কিছু বেশি মাত্র।
অনেক ঊর্ধ্বে সীমাহীন রহস্যের মায়া-রাজ্যে সেই রক্ত-তারকা এক বিপুল দানবের ক্রুদ্ধ। নেত্রের মতো জ্বলতে লাগল–সকলে বিস্মিতভাবে তার পানে নীরবে তাকিয়ে রইল।
.
বিনয়বাবুর ডায়েরি
কদিন কেটে গেল,–ঠিক কয় দিন, তার কোনও হিসাব আমি রাখিনি। এই কদিন ধরে উড়োজাহাজের একটু বিশ্রাম নেই–সে হু-হু করে শূন্যের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত ভেসে চলেছে– মিনিটে কত মাইল করে তাও জানবার কোনও উপায় নেই। তবে এটা বেশ স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে মঙ্গল গ্রহের এই বিচিত্র উড়োজাহাজের গতি পৃথিবীর যে-কোনও উড়োজাহাজের চেয়ে ঢের বেশি কারণ মাথার উপরকার ওই রক্ত-তারাটি ক্রমেই দেখতে বড় হয়ে উঠছে।
বামনরা আমাদের সঙ্গে আর কোনও গোলমাল করেনি, তারা রোজ খাবারের যোগান দিয়ে যাচ্ছে এবং আমরাও নির্বিবাদে তার সদ্ব্যবহার করছি। তবে, তারা আর আমাদের কাছে ঘেঁষতে সাহস করে না, খাবারের পাত্রগুলো খুব তফাতে রেখেই আস্তে আস্তে সরে পড়ে। বেশ বোঝা যাচ্ছে, আমাদের বন্দুকের শক্তি দেখে তারা রীতিমতো শায়েস্তা হয়ে গেছে। তারা আমাদের উপরে পাহারা দেয় বটে, কিন্তু তাও খুব দূর থেকে, লুকিয়ে লুকিয়ে।
এরা যে এত শীঘ্র পৃথিবীর আবহাওয়া ছেড়ে পিঠটান দিচ্ছে, তারও কারণ বোধহয় আমাদের বিদ্রোহ। আমাদের বন্দুকের গুলিতে উড়োজাহাজ ফুটো হয়ে যাওয়াতেই নিশ্চয় তারা এতটা ভয় পেয়েছে। পাছে আমরা কোনও নতুন বিপদ ঘটাই, সেই ভয়েই বামনরা আজকাল চুপচাপ আছে বটে, কিন্তু মঙ্গল গ্রহে ফিরে যাবার পর এরা যে আমাদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করবে, তা ভগবানই জানেন!
এ জীবনে হয়তো আর পৃথিবীতে ফিরতে পারব না। সেইজন্যেই এই ডায়েরি লিখতে শুরু করেছি। আমাদের জীবনের উপর দিয়ে কী আশ্চর্য ঘটনার প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে, তার একটা লিখিত ইতিহাস থাকা নিতান্ত দরকার। যদিও সেটা সম্ভব নয়,তবুও আমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনওগতিকে আবার পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারে, তাহলে আমার এই ইতিহাস মানুষের অনেক উপকারে লাগবে।
