সেপাইদের দলপতি তাঁর গোল গোল ভাটার মতো চোখ আরও বিস্ফারিত করে বললে, ভিং ভং–ভংকা!
চোখের পলক না ফেলতে সেই শত শত বামন-সেপাই তাদের হাতের বর্শাগুলো মাথার উপরে তুলে ধরলে।
বিমল পিছু হটে গিয়ে এক মুহূর্তের মধ্যে হাতের শিকল ছিঁড়ে ফেললে। তারপর বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে বললে, বিদায় বিনয়বাবু, আমি মরব, তবু আর বন্দি হব না! কিন্তু মরবার আগে এই মর্কটগুলোকে আমি এমন শিক্ষা দিয়ে যাব যে, এরা জীবনে তা আর ভুলবে না!
রামহরিও একলাফে বিমলের সামনে এসে, তার দেহ ঢেকে দাঁড়িয়ে বললে, না, না! আগে আমাকে না মেরে এরা আমার খোকাবাবুকে মারতে পারবে না।
বর্শা উঁচিয়ে বামন-সেপাইরা বিমলের দিকে ছুটে এল।
.
বন্দুকের শক্তি
বর্শা উঁচিয়ে বামন-সেপাইরা বিমলের দিকে ছুটে এল।
কিন্তু রামহরি হঠাৎ বিমলের দেহ ঢেকে দাঁড়াল দেখে তারা একটু থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সেপাইদের দলপতি আবার ক্রুদ্ধ স্বরে বললে,–ভং ভং–ভংকা!
বামনরা আবার অগ্রসর হল!
রামহরিকে এক ধাক্কা মেরে বিমল বললে, সরে যাও রামহরি, আমার সামনেটা আড়াল করে দাঁড়িও না!
বিমলের ঠিক সুমুখে এসে বামনরা তাকে বর্শার খোঁচা মারতে উদ্যত হল।
বিমল এক লাফে এক পাশে সরে গেল সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের বন্দুকটা ভীষণ গর্জন করে অগ্নিশিখা উদ্গার করলে।
পরমুহূর্তে দুজন বামন চিৎকার করে গৃহতলে লুটিয়ে পড়ল, বন্দুকের গুলি নিশ্চয়। প্রথম বামনের দেহ ভেদ করে দ্বিতীয় বামনকেও আঘাত করেছে।
বিমল আবার বন্দুক ছুড়লে–আবার আর একজন বামনের পতন হল।
ব্যাপার দেখে আর সব বামন-সেপাই তাড়াতাড়ি পিছু হটে গেল,তাদের মুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে তারা ভয়ানক স্তম্ভিত হয়ে গেছে। বন্দুক যে কী সাংঘাতিক জিনিস, তারা তো তা জানে না!
এদিকে বিনয়বাবুও ততক্ষণে নিজের হাতের শিকল ভেঙে ফেলে কুমার আর কমলের শৃঙ্খলও খুলে দিয়েছেন এবং রামহরিও অল্প চেষ্টাতেই নিজের সোনার বাঁধন ছিঁড়ে ফেলেছে।
সেপাইদের দলপতি পায়ে পায়ে পিছু হটতে-হটতে আবার বললে, ভং ভং–ভংকা!
বিমলকে বন্দুকে নতুন টোটা পুরতে ব্যস্ত দেখে কুমার এগিয়ে এসে দলপতিকে লক্ষ করে আবার বন্দুক ছুড়লে।
শূন্যে দু-হাত ছড়িয়ে দলপতিও ঘরের মেঝের উপরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল।
কুমার ফের বন্দুক ছুড়লে, পর মুহূর্তে বামন-সেপাইরা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় মেরে সেখান থেকে অদৃশ্য হল;-সঙ্গে-সঙ্গে একটা কর্ণভেদী তীব্র শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠল–ঠিক যেন দশ-বারোটা রেলের ইঞ্জিন একসঙ্গে কু দিচ্ছে।
বিনয়বাবু চমকে বললেন, ও কীসের শব্দ!
বিমল বললে, কিছুই তো বুঝতে পারছি না!
হঠাৎ ঢং-ঢং করে ঘন-ঘন ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল–সেই কু শব্দ তখনও থামল না।
সকলে সবিস্ময়ে দেখতে পেলে, দলে দলে বামন উড়োজাহাজের এক প্রান্তে ছুটে যাচ্ছে, তাদের সকলের মুখে-চোখে ফুটে উঠেছে কি-এক অজ্ঞাত ভয়ের রেখা।
কমল বললে, ওদের দেখে মনে হচ্ছে, ওরা যেন হঠাৎ কি একটা বিপদে পড়েছে।
বিমল বললে, হ্যাঁ সেই ভয়ে ওরা এতটা ভেবড়ে পড়েছে যে, আমাদের দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না।
বিনয়বাবু এগিয়ে গিয়ে ঘরের একটা দেওয়াল খানিকক্ষণ ধরে পরীক্ষা করলেন। তারপর ফিরে বললেন, বিমল, ব্যাপার যা হয়েছে আমি তা বোধহয় বলতে পারি। উড়োজাহাজের দেওয়াল আমাদের বন্দুকের গুলিতে ছাদা হয়ে গেছে। ওই যে কু শব্দ হচ্ছে, ওটা বাইরে থেকে বাতাস ঢোকার শব্দ। বামনরা সেই ছাদা মেরামত করছে।
কুমার বললে, কিন্তু এই উড়োজাহাজের দেওয়াল কি এমন পলকা যে, সামান্য বন্দুকের গুলিতে ভেঙে গেল?
বিনয়বাবু বললেন, বোধহয় দৈবগতিকে কোনও জোড়ের মুখে বা অস্থানে বন্দুকের গুলি লেগেছে।
বিমল বললে, ভারী ভারী জিনিসের ভার বইতে পারলেও হয়তো এই উড়োজাহাজ বন্দুকের গুলির চোট সইতে পারে না।
বিনয়বাবু বললেন, তাও অসম্ভব নয়, কীরকম উপাদানে এই উড়োজাহাজ তৈরি তা তো আমরা জানি না।
কুমার বললে, এখন আমাদের কর্তব্য কী? আমরা বামনদের হত্যা করেছি, ওরাও নিশ্চয় এর প্রতিশোধ নিতে আসবে!
বিনয়বাবু বললেন, ওরা কী করবে তা আমি জানি না। তবে, যখন বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়েছে, তখন আর নরম হওয়াও চলবে না, কারণ এখন আত্মসমর্পণ করলেও ওরা বোধহয় আমাদের ক্ষমা করবে না।
বিমল বললে, আমার মনে হয় ওরা আর সহজে এদিকে ঘেঁষবে না, কারণ ওরা আমাদের বন্দুকের শক্তি বুঝে গেছে।
বিনয়বাবু বললেন, ভবিষ্যতের কথা পরে ভাবা যাবে। আমাদের এখন সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে, যে মানুষগুলি বন্দি হয়ে আছে তাদের স্বাধীন করে দেওয়া। তাহলে আমরা দলেও রীতিমতো পুরু হব, আর ওদের আক্রমণেও বেশ বাধা দিতে পারব।
.
রক্ত-তারকার রহস্য
বন্দিদের ভিতরে ভদ্ৰশ্রেণির লোক কেউ ছিল না–বেশিরভাগই পূর্ববঙ্গের মুসলমান খালাসি, বিলাসপুর থেকে যারা স্টিমারের সঙ্গে অদৃশ্য হয়েছিল। বন্দিরা মুক্তিলাভ করে বিনয়বাবুদের চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে মনের খুশিতে জয়ধ্বনি করে উঠল।
বিনয়বাবু সকলকে সম্বোধন করে বললেন, দেখো, এ জয়ধ্বনি করবার সময় নয়। আমি যা বলি, তোমরা সবাই মন দিয়ে শোনো। আমরা সকলেই এক ভীষণ বিপদের মধ্যে পড়ে আছি। যে-কোনও মুহূর্তে আমাদের প্রাণ যেতে পারে। বিপদে পড়লে বাঘে-গরুতেও একসঙ্গে জল খায়, সুতরাং বড়-ছোট নির্বিচারে আমাদেরও এখন এক মন, এক প্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে। কাজেই এটা আমি অনায়াসেই আশা করতে পারি যে তোমরা কেউ আমার কথার অবাধ্য হবে না।
