বিমল বিস্মিত স্বরে বললে, বিনয়বাবু এ জল বিলাসপুরের সেই পুকুর থেকে চুরি করে আনা হয়নি তো?
বিনয়বাবু বললেন, নিশ্চয় তাই হয়েছে!
কমল বললে, কিন্তু এসব নিয়ে এরা করছে কী?
বিনয়বাবু বললেন, সে কথা তো আগেই বলেছি। এরা পৃথিবী থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে বৈজ্ঞানিক আলোচনার জন্যে।
বিমল বললে, ওই নগণ্য বামন-জানোয়ারগুলো যে এমন সব অসাধ্য সাধন করতে পারে, তা তো আমার বিশ্বাস করতেও প্রবৃত্তি হচ্ছে না!
বিনয়বাবু মাথা নেড়ে বললেন, বিমল, পৃথিবীর মানুষের মতো চেহারা না হলেই কোনও জীবকে যে মানুষের চেয়ে নিম্নশ্রেণির বলে মানতে হবে, তার কোনও মানে নেই। অথচ তুমি বারবার সেই ভ্রম করছ। আকাশে পৃথিবীর চেয়ে ঢের বড় শত শত গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে– হয়তো তার অনেকের মধ্যেই এমন সব সভ্য জীবের অস্তিত্ব আছে যারা মোটেই মানুষের মতো দেখতে নয়। তাদের চেহারা দেখলে আমরা যেমন অবাক হব, আমাদের চেহারা দেখলে তারাও তেমনি অবাক হতে পারে। তারাও আমাদের দেখে হয়তো নীচু দরের জানোয়ার বলেই ধরে নেবে। ভবিষ্যতে এমন ভ্রম আর কোরো না। কারণ মঙ্গল গ্রহের জীবরা যে নগণ্য নয়, তার অসংখ্য প্রমাণ তো চোখের উপরে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছ! এরা দেহের জোরে আমাদের সমকক্ষ না হলেও বুদ্ধির জোরে আমাদের চেয়েও যে অনেক এগিয়ে গেছে, এটা আমি মানতে বাধ্য।
কমল বললে, কিন্তু একটা কথা বেশ বোঝা যাচ্ছে যে, মানুষের মতো এরা আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার জানে না।
বিনয়বাবু বললেন, হ্যাঁ, আমারও সেই বিশ্বাস। কিন্তু এ থেকে প্রমাণ হয় না যে এরা আমাদের চেয়ে নিম্নশ্রেণির জীব। দরকার হলেই কোনও জিনিসের আবিষ্কার হয়, এটা হচ্ছে সভ্যতার নিয়ম। এদের বন্দুক-কামানের দরকার হয়নি, তাই এরা তার জন্যে মাথা ঘামায়নি। কিন্তু এখানে আগে থাকতে এক বিষয়ে তোমাদের সাবধান করে রাখছি। বিমল, কুমার, তোমাদের বন্দুক আছে বলে তোমরা যেন তার অপব্যবহার কোরো না।
রামহরি বললে, আমাদের তো হাত বাঁধা, ইচ্ছে করলেও বন্দুক ছুঁড়তে পারব না। সুতরাং আমাদের কাছে বন্দুক থাকা না-থাকা দুই-ই সমান।
বিমল হেসে বললে, এই পাতলা সোনার শিকল আমি এক টানে এখনি ছিঁড়ে ফেলতে পারি, আমি কি মঙ্গল গ্রহের বামন যে এই শিকলে বাঁধা থাকব?
বিনয়বাবু বললেন, হ্যাঁ, যদিও আমার বয়েস হয়েছে, তবু এই সোনার শিকল ছেড়বার শক্তি এখনও আছে। তবে, আমাদের এ শক্তিও আপাতত ব্যবহার না করাই ভালো।
.
সামনে মরণ
সেপাইদের দলপতির ইঙ্গিতে আবার সকলকে দাঁড়াতে হল। সেখানেও পথের দুই ধারেই কালো পরদা ঢাকা দেওয়াল।
হঠাৎ সেই দেওয়ালের ওপাশ থেকে একটা শব্দ শুনে সকলেই চমকে উঠল। কে যেন মানুষের গলায় করুণ স্বরে ক্রন্দন করছে!
দলপতি এগিয়ে গিয়ে দেওয়ালের উপরে একটা সোনার হাতল ধরে ঘুরিয়ে দিলে, সামনের লম্বা দেওয়ালটা অমনি একপাশে সরে গেল।
সঙ্গে সঙ্গে কান্নার আওয়াজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিন্তু কালো পর্দাটা তখনও সকলের দৃষ্টি রোধ করে ছিল বলে কে কাঁদছে তা দেখা গেল না।
ইতিমধ্যে বামন-সেপাইরা একসঙ্গে একটা চিৎকার করে উঠল–চিৎকারটা শোনাল অনেকটা এইরকম–ঘং ঘং ঘং!–অমনি পথের আর এক পাশের দেওয়াল সরে গেল এবং পরদা ঠেলে দলে দলে বেরিয়ে এল পঙ্গপালের মতো শত শত বামন-সেপাই। তাদের সকলেরই হাতে প্রায় সাড়ে তিন ফুট উঁচু একগাছা করে সোনার ফলাওয়ালা বর্শা।
বিনয়বাবু বললেন, দেখছ তো বিমল, এখানে জোর খাঁটিয়ে লাভ নেই। আমরা এদের বিশ-পঁচিশ জনকে বধ করলেও শেষকালে আমাদেরই মরতে হবে।
নতুন সেপাইয়ের দল আসার সঙ্গে সঙ্গে দলপতি ওধারকার দেওয়ালের পর্দায় ঝোলানো একটা দড়ি ধরে টানলে, সঙ্গে সঙ্গে পর্দাটা সরে গেল এবং সকলের চোখের সামনে ফুটে উঠল এক বিচিত্র দৃশ্য!
খুব লম্বা একখানা ঘর এবং কাচের মতো মেঝের উপরে শুয়ে বসে ও দাঁড়িয়ে আছে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন মানুষ। তাদের সকলেরই মুখ বিমর্ষ, কেউ চাপা গলায়, কেউ বা উচ্চস্বরে ক্রন্দন করছে। দেওয়ালের গায়ে আড়াআড়িভাবে অনেকগুলো সোনার রিং বসানো এবং এক একটা রিং থেকে এক-এক গাছা লম্বা সোনার শিকল ঝুলছে–প্রত্যেক বন্দির হাত ভোলা থাকলেও ডান পা সেই শিকলে বাঁধা।
বিমল ক্রুদ্ধ স্বরে বললে, দেখুন বিনয়বাবু, এই হতভাগা বামনরা পৃথিবী থেকে কত মানুষ ধরে এনেছে!
বিনয়বাবু দুঃখিতভাবে শুধু বললেন, হু!
রামহরি হতাশভাবে মাথা নেড়ে বললে, আমাদের এখুনি ওই দশা হবে, হা অদৃষ্ট!
বিমলের কপালের শির ফুলে উঠল, রুদ্ধ আক্রোশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে কাঁপতে লাগল।
এমন সময়ে সেপাইদের দলপতি কি একটা হুকুম দিলে সঙ্গে-সঙ্গে কয়েকজন সেপাই বিমল ও কুমারের কাছে এসে তাদের বন্দুক দুটো কেড়ে নেবার চেষ্টা করলে।
বিমল চেঁচিয়ে বললে, খবরদার কুমার, বন্দুক ছেড়ো না। বন্দুক গেলে আমাদের আর আত্মরক্ষার কোনও উপায়ই থাকবে না!
বিনয়বাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, বিমল বিমল, ওদের বাধা দিয়ে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে এনো না!
বিমল দৃঢ় স্বরে বললে, আসুক বিপদ। এখানে শেয়াল-কুকুরের মতো সারাজীবন বাঁধা থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো!
বামন-সেপাইরা নাছোড়বান্দা দেখে বিমল তাদের উপরে বারকয়েক পদাঘাত করলে, তিনজন বামন বিকট আর্তনাদ করে মেঝের উপরে ঠিকরে গিয়ে পড়ল–তারপর তারা চ্যাঁচালও না, একটু নড়লও না।
