মূর্তিগুলো এগিয়ে এসে বন্দিদের ঘিরে দাঁড়াল। তারপর দলের ভিতর থেকে পাঁচজন লোক বেরিয়ে এল, তাদের প্রত্যেকের হাতে একগাছা করে শিকল।
প্রথমেই একজন এসে বিমলের হাত ধরে টানলে, তারপর তার হাতে শিকল পরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে। চকিতে হাত সরিয়ে বিমল ক্রুদ্ধস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, কী! এত বড় আস্পর্ধা! চোখের পলক না ফেলতে বিমলের চারপাশে পঁচিশ-ত্রিশটা বর্শার ফলা চমকে উঠল।
বিনয়বাবু বললেন, দোহাই তোমার, ওদের বাধা দিও না, আমাদের প্রাণ এখন ওদেরই হাতে!
বিমল বললে, তা বলে আমি আমার হাত বাঁধতে দিচ্ছি না। এই হেঁড়ে-মাথা তালপাতার সেপাইগুলোকে আমরা এখনি টিপে মেরে ফেলতে পারি।
বিনয়বাবু বললেন, এ দলের পিছনে আরও কত দল আছে কে জানে? ছেলেমানুষি করলে আমরা সকলে মারা পড়ব!
বিমল অত্যন্ত অনিচ্ছুকভাবে আবার হাত বাড়িয়ে দিলে। একে-একে সকলেরই হাত তারা শিকল দিয়ে বেঁধে ফেললে।
রামহরি কাঁদো কাঁদো মুখে বললে, এইবারে আমাদের নিয়ে গিয়ে এরা বলি দেবে।
কুমার বললে, একটু পরে যখন মরতেই হবে, তখন যেচে ধরা দেওয়াটা ঠিক হল। কি?
কমল কিছু বললে না, নিজের বাড়ির কথা আর বাপ-মায়ের মুখ মনে করে তার তখন কান্না আসছিল।
বিনয়বাবু এক মনে হাতের শিকল পরখ করছিলেন। হঠাৎ তিনি মুখ তুলে বললেন, বিমল, হাতের শিকল ভালো করে দেখেছ?
কেন?
এ শিকল খাঁটি সোনার!
রামহরি বিস্ফারিত চক্ষে হাতের শৃঙ্খলের দিকে তাকিয়ে বললে, তাহলে এ শিকল আর আমি ফিরিয়ে দেব না। সোনার মায়া এমনই আশ্চর্য যে, বন্দি হয়েও রামহরির মন যেন অনেকটা আশ্বস্ত হল।
এদিকে সেই সশস্ত্র জীবগুলো একদিকে সার গেঁথে দাঁড়াল। তাদের দলপতি বন্দিদের সামনে এসে, হাতের ইশারায় অগ্রসর হতে বললে।
বিনয়বাবু বললেন, এসো, সকলে মিলে এগুনো যাক। এইবারে এখানে আরও কত আশ্চর্য ব্যাপার আছে, সমস্তই দেখতে পাওয়া যাবে।
.
চৌবাচ্চায় পুষ্করিণী
সব আগে বিনয়বাবু, তারপর যথাক্রমে বিমল, কুমার, কমল আর রামহরি এবং তারপর মঙ্গল গ্রহের হেঁড়ে মাথা বামন সেপাইরা পরে পরে ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।
বিনয়বাবু দেখলেন, তারা একটি খুব লম্বা পথের উপরে এসে দাঁড়িয়েছেন–সে পথের উপরে দীর্ঘতা অন্তত হাজার ফুটের কম হবে না। বলা বাহুল্য, পথটাও সেই নীল রঙা কাচের মতো জিনিস দিয়ে তৈরি। পথে দু-পাশে সারি-বাঁধা ঘর এবং সব ঘরের দেওয়ালই কালো পরদা দিয়ে ঢাকা।
খানিক দূরে যেতে না যেতেই সেপাইদের দলপতি তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ঝকঝকে সোনার তরোয়াল খুলে বন্দিদের দাঁড়াতে ইঙ্গিত করলে। তারপর এক পাশের পর্দা সরিয়ে একটা অব্যক্ত তীব্র শব্দ করে সামনের দরজায় তিনবার ধাক্কা মারলে। অমনি দরজাটা ভিতর থেকে খুলে গেল এবং আর-একটি বামনমূর্তি বাইরে এসে দাঁড়াল।
এ মূর্তির আকারও আগেকার মূর্তিগুলিরই মতো, কিন্তু তার পোশাক অন্যরকম। তার গলা থেকে পা পর্যন্ত একটা সবুজ রঙের কোর্তা, মাথায় একটা লাল রঙের টুপি–দেখতে অনেকটা গাধার টুপির মতো। কোর্তার উপরে একছড়া মালা–তাতে অনেকগুলো পাথর জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।
বিনয়বাবু চুপিচুপি বললেন, বিমল, পাথরগুলো বোধহয় হিরে!
বিমল বললে, আমারও তাই মনে হচ্ছে।..কিন্তু এর কাছে আমাদের নিয়ে এল কেন?
বোধহয় এই জীবটাই এখানকার কর্তা। দেখছ না, সেপাইদের দলপতি ওকে হেঁট হয়ে অভিবাদন করলে। ওর পোশাকও সেপাইদের চেয়ে ঢের বেশি জমকালো!
নতুন মূর্তিটা খানিকক্ষণ বন্দিদের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে দেখলে, তারপর সেপাইদের দলপতির দিকে ফিরে মঙ্গল গ্রহের ভাষায় কি বলতে লাগল। বিনয়বাবু খুব মন দিয়ে শুনেও সে ভাষার কিছু বুঝতে পারলেন না, কিন্তু কতকগুলো বিষয় তিনি লক্ষ করলেন। প্রথমত, তাদের ভাষায় বর্ণমালা খুব কম, কারণ কথা কইতে কইতে তারা একই বর্ণ ক্রমাগত উচ্চারণ করে। দ্বিতীয়ত, চিনেদের মতো তাদের ভাষায় অনুঃস্বরের বিশেষ বাড়াবাড়ি।
কথাবার্তা শেষ করে সেপাইদের দলপতি বন্দিদের কাছে আবার ফিরে এল। তারপর হাত নেড়ে ইঙ্গিত করে আবার সকলকে অগ্রসর হতে বললে।
বন্দিরা আবার অগ্রসর হল, কিন্তু অল্পদূর অগ্রসর হয়েই সকলে বিস্মিতভাবে শুনতে পেলে, কেমন একটা কিচিরমিচির শব্দ হচ্ছে।
বিনয়বাবু বললেন, এ যে একদল বানরের চিৎকার!
কমল বললে, মঙ্গল গ্রহেও বানর আছে।
বিনয়বাবু বললেন, না, আমার বোধ হয় এ সেই বানরের দল-বিলাসপুরের বটগাছের উপরে যারা বাসা বেঁধে থাকত!
আরও কয়েক পা এগিয়ে আবার এক অভাবিত ব্যাপার। পথের এক পাশে মস্ত বড় একটা খোলা জায়গা, আর সেইখানে বিশাল শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে খাড়া হয়ে আছে– প্রকাণ্ড একটা বটগাছ। এত বড় গাছ চোখে দেখা যায় না।
বিনয়বাবু বললেন, বিলাসপুরের বিখ্যাত বটগাছ!
মস্ত একটা মাটির ঢিবি তৈরি করে তার উপরে বটগাছটি পোঁতা রয়েছে এবং তার নীচেকার ডালে ডালে সোনার শিকল দিয়ে বাঁধা অনেকগুলো বানর। বিনয়বাবু প্রভৃতিকে দেখে বানরগুলো আরও জোরে কিচিরমিচির করে চেঁচিয়ে উঠল–অমানুষের আড্ডায় পরিচিত মানুষের দেখা পেয়ে এ যেন বানরদের প্রাণের আনন্দ প্রকাশ!
বটগাছের পাশেই আর-এক আশ্চর্য দৃশ্য! সেই নীল রঙা কাচের মতো স্বচ্ছ জিনিস দিয়ে তৈরি পুকুরের মতো বড় একটা চৌবাচ্চা এবং তার মধ্যে টলটল করছে এক চৌবাচ্চা জল! খালি তাই নয়, জলে যে দলে দলে মাছ খেলা করে বেড়াচ্ছে, স্বচ্ছ চৌবাচ্চার পাশ থেকে তাও স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
