আমাদের ভবিষ্যৎ ভেবে।
ভবিষ্যতের কথা ভুলে যাও বিমল, ভবিষ্যতের কথা ভুলে যাও; এখন খালি বর্তমানের কথা ভাবো। আমার নিজের কথা বলতে পারি, আমি কিন্তু খুব খুশি হয়েছি। আমাদের চোখের সামনে এখন এক নতুন জ্ঞানের রাজ্য ভোলা রয়েছে–এক নতুন জগৎ, নতুন দৃশ্যের পর নতুন দৃশ্য! এমন সৌভাগ্য যে আমার হবে, আমি তা কল্পনাও করতে পারিনি!
পিছন থেকে এতক্ষণ পরে কুমার বললে, আপনার এ আনন্দ বেশিক্ষণ থাকবে না বিনয়বাবু! ভেবে দেখেছেন কি, আমরা আর কখনও পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারব না?
বিনয়বাবু খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু সে কথা ভেবে মন খারাপ করে কোনও লাভ নেই তো ভাই! পুরোনো পৃথিবীতে না যেতে পারি, আমরা না হয় এক নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে নতুনভাবে জীবনযাপন করব! মন্দ কী?
কমল বললে, কিন্তু এটাও ভুলবেন না বিনয়বাবু, যারা আমাদের ধরে এনেছে, তারা মানুষের শবব্যবচ্ছেদ করে।
রামহরি বললে, আমরা যে ভূত-প্রেতের হাতে পড়িনি, তাই-বা কে বলতে পারে।
বিমল গম্ভীর স্বরে বললে, প্রাণ আমি সহজে দেব না! বাংলো থেকে আমি বন্দুক নিয়ে বেরিয়েছিলুম, সে বন্দুকও আমার সঙ্গে এখানে এসেছে।
কুমার বললে, বন্দুক আমারও আছে। প্রথমে ঝোড়ো হাওয়ার টানে বন্দুকটা আমার হাত থেকে খসে পড়েছিল, কিন্তু এখানে এসে দেখছি আমার সঙ্গে সঙ্গে বন্দুকটাও উপরে এসে হাজির হয়েছে।
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, কুমার, তোমরা ছেলেমানুষি কোরো না। যারা আমাদের ধরে এনেছে, তাদের বুদ্ধি আর শক্তির কিছু কিছু পরিচয় তো এর মধ্যেই পেয়েছ। দুটো বন্দুক নিয়ে এদের বিরুদ্ধে কতক্ষণ দাঁড়াতে পারবে? তার চেয়ে
বিনয়বাবুর কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ কীসের একটা শব্দ হল–সঙ্গে সঙ্গে একদিকের দেওয়াল ধীরে-ধীরে সরে যেতে লাগল।
বিনয়বাবু বললেন, সাবধান! দেওয়ালটা এরা নিশ্চয় কোনও কল টিপে সরিয়ে ফেলেছে। এতক্ষণে বুঝলুম, এ কামরায় দরজা নেই কেন।
দেওয়ালটা যখন একেবারে সরে গেল, তখন সামনেই এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে সকলেই সবিস্ময়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল।
রামহরি তাড়াতাড়ি দুই হাতে চোখ চেপে ফেলে বললে, এরা যমদূত, এরা যমদূত! আমাদের নরকে ধরে নিয়ে যেতে এসেছে।
এমনকী বিনয়বাবু পর্যন্ত কেমন যেন হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন তার মনে হল, তিনি যেন এক ভয়ানক উদ্ভট স্বপ্ন দেখছেন।
.
মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা
বিনয়বাবু দেখলেন, দেওয়ালটা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত জীব তাদের সামনে এসে আবির্ভূত হল।
তার মাথাটা প্রকাণ্ড, এবং বিশেষ করে বড় কপাল থেকে খুলির দিকটা। মুখখানা অবিকল ত্রিকোণের মতন দেখতে। চোখ দুটো ঠিক গোল ভাটার মতনতাদের ভিতরে রক্তজবার মতো রাঙা দুটো তারা। কান দুটো শিঙের মতন। নাকের কাছে গোল একটা ছাদা ছাড়া আর কিছুই নেই। ঠোঁট ধনুকের মতন বাঁকা।
তার দেহ ও হাত-পা মানুষের মতন বটে, কিন্তু আকারে সমস্ত দেহটাই মাথা ও মুখের চেয়ে বড় হবে না। বিশেষ, তার দেহ আর হাত-পা অসম্ভবরকম রোগা ও অমানুষিক। তার উচ্চতা হবে বড়জোর তিন ফুট–এর মধ্যে মাথা ও মুখের মাপই বোধহয় দেড় ফুট!
এই অপরূপ মূর্তির রং ঠিক শ্লেটের মতন, কিন্তু তার মাথায় বা মুখে একটিমাত্র চুলের চিহ্নও নেই!
মূর্তির পরনে লাল রঙের খাটো কোট, কিন্তু কোটের হাতা কনুইয়ের কাছ থেকে কাটা। কোটের তলা থেকে হাঁটু পর্যন্ত সাদা রঙের ইজের বা হাফপ্যান্ট। পায়ে খড়মের মতো কাষ্ঠপাদুকা। খড়মের সঙ্গে তার তফাত শুধু এই যে, আঙুলের ও গোড়ালির দিকে দুটো করে চামড়ার ফিতে দিয়ে জুতো-জোড়া পায়ে লাগানো আছে। মূর্তির কোমরে একখানা তরবারি ঝুলছে, লম্বায় সেখানা পৃথিবীতে ব্যবহৃত ছোরার চেয়ে বড় নয়–চওড়ায় আরও ছোট পেনসিল কাটা ছুরির মতো।
মূর্তি তার ভয়ানক। চোখ মেলে বন্দিদের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল; তারপর বাজখাই গলায় কি একটা শব্দ উচ্চারণ করলে। তখনি আর একদল ঠিক সেইরকম মূর্তি কামরায় সামনে এসে দাঁড়াল। এই নতুন দলের সকলের হাতেই একগাছা করে বর্শা।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, এরাই কি মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা?
বিনয়বাবু বললেন, তাই তো দেখছি!
বিমল বললে, এই তুচ্ছ জীবগুলো এসেছে পৃথিবীর উপরে অত্যাচার করতে।
বিনয়বাবু ঘাড় নেড়ে বললেন, বিমল, চেহারা এদের যেমনই হোক, কিন্তু এদের তুচ্ছ বলে ভেবো না। কারণ যারা এমন আশ্চর্য উড়োজাহাজ তৈরি করেছে তাদের তুচ্ছ বলে ভাবলে ভুল করা হবে। ওই প্রকাণ্ড মাথাই ওদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির পরিচয় দিচ্ছে। পণ্ডিতদের মতে, হাজার হাজার বৎসর পরে পৃথিবীর মানুষদেরও হাত-পা আর দেহ ছোট হয়ে গিয়ে মাথা বড় হয়ে উঠবে। যারা যে অঙ্গ যত বেশি ব্যবহার করে তাদের সেই অঙ্গ তত বেশি প্রধান হয়ে ওঠে। দিনে দিনে মানুষের মস্তিষ্কের চর্চা বাড়ছে, দেহের চর্চা কমছে; কাজেই তাদের মাথা স্বাভাবিক নিয়মে বড় হয়ে উঠবেই।
কুমার বললে, ওদের বর্শার ফলাগুলো কি দিয়ে তৈরি? ও যে ঠিক সোনার মতো দেখাচ্ছে!
বিনয়বাবু বললেন, আমারও সন্দেহ হচ্ছে। মঙ্গল গ্রহে হয় লোহা পাওয়া যায় না, নয় সেখানে সোনা এত সস্তা যে, তার কোনও দাম নেই।
বিমল বললে, প্রথম জীবটা বোধহয় ওদের দলপতি। ওই দেখুন, এইবারে ওরা আমাদের কাছে আসছে।
