বিনয়বাবু ও বিমল স্তম্ভিতের মতন দেখলেন, তারা তিনজনেই ছটফট করতে করতে তিরের মতন বেগে শূন্যে উঠে যাচ্ছেন।..মাঠের দিক থেকে সেপাইদের অনেকগুলো বন্দুকের আওয়াজ এল।
পরমুহূর্তে বিনয়বাবু ও বিমলের দেহও উপরের সেই সর্বগ্রাসী কালো ছায়ার দিকে প্রচণ্ড বেগে উড়ে গেল–চুম্বনের টানে লোহার মতো।
সেপাইরা আবার একসঙ্গে বন্দুক ছুড়লে।
.
শূন্যে
কোথা দিয়ে কী যে হল, কেউ তা বুঝতে পারলে না।
বিনয়বাবু প্রাণপণে বাধা দেবার চেষ্টা করেও রক্ষা পেলেন না, শুন্যের সেই অদৃশ্য শক্তির কাছে তার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে গেল, কি একটা প্রচণ্ড ঘূর্ণি হাওয়ার মুখে তুচ্ছ ছেঁড়া পাতার মতো তিনি তিরের চেয়েও বেগে আকাশের দিকে উঠে গেলেন কানের কাছে বাজতে লাগল। কেবল একটা ঝড়ের শনশনানি এবং দুম দুম করে অনেকগুলো বন্দুকের শব্দ। তার পরেই বিষম একটা ধাক্কা সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত যন্ত্রণায় তিনি কেমন যেন আচ্ছন্নের মতন হয়ে গেলেন।
অনেক কষ্টে আপনাকে সামলে নিয়ে বিনয়বাবু প্রথমেই দেখলেন, তার চোখের সামনে যেন একটা নীল রঙের স্রোত। হাত দিয়ে অনুভব করে বুঝলেন, তিনি আর শূন্যে নেই, একটা শীতল পদার্থের উপরে শয়ন করে আছেন।
আস্তে আস্তে উঠে বসে দেখলেন, যার উপরে তিনি শুয়ে ছিলেন সেটা কাচের মতো স্বচ্ছ এবং তার রং আকাশের মতোই নীল। কেবল তাই নয়–তার ভিতর দিয়ে অনেক নীচে পৃথিবীর গাছপালা ও আলো দেখা যাচ্ছে।
অত্যন্ত কৌতূহলী হয়ে বিনয়বাবু ভালো করে গৃহতলটা পরীক্ষা করতে লাগলেন। তিনি বুঝলেন, তা নীল রঙের কাচের মতন এমন কোনও স্বচ্ছ পদার্থ দিয়ে তৈরি, পৃথিবীতে যা পাওয়া যায় না। বিনয়বাবুর এটা বুঝতেও দেরি হল না যে, মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজের সমস্তটাই ঠিক এই একই পদার্থের দ্বারা প্রস্তুত। মেঝের উপরে বারকয়েক সজোরে করাঘাত করে তিনি আরও বুঝলেন, যে জিনিসে এটা তৈরি তা স্বচ্ছ ও পাতলা হলেও, রীতিমতো কঠিন ও হালকা।
তার পরেই বিনয়বাবুর মনে পড়ল তাঁর সঙ্গীদের কথা। সঙ্গে সঙ্গেই তিনি শুনতে পেলেন, বিমল অত্যন্ত বিহ্বল স্বরে ডাকছে, বিনয়বাবু, বিনয়বাবু!
বিনয়বাবু চেয়ে দেখলেন খানিক তফাতেই বিমল দুই হাতে ভর দিয়ে বসে আছে। আরও খানিক তফাতে রামহরি উপুড় হয়ে পড়ে আছে, তার কাছেই কমল ফ্যালফ্যাল করে চারদিকে তাকিয়ে দেখছে এবং আর একটু দূরে দুই হাঁটুর ভিতরে মুখ ঢেকে বসে রয়েছে কুমার।
দলের সবাইকে একত্রে অক্ষত দেহে দেখতে পেয়ে, এত বিপদের মধ্যেও বিনয়বাবুর মনটা খুশি হয়ে উঠল।
বিমল আবার ডাকলে, বিনয়বাবু!
বিনয়বাবু তাড়াতাড়ি তার কাছে গিয়ে বললেন, কী ভাই বিমল, কী বলছ?
এসব আমরা কোথায় এলুম?
বুঝতে পারছ না? মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজে।
তাহলে আপনার সন্দেহই সত্য? বলেই বিমল বিস্মিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
বিনয়বাবু বললেন, বিমল, এ উড়োজাহাজ কী আশ্চর্য জিনিস দিয়ে তৈরি, সেটা কিন্তু ধরতে পারছি না। এ জিনিসটা নীল-রঙা কাচের মতো, অথচ কাচ নয়। উপরে চেয়ে দেখো, দেওয়ালের ভিতর দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে।
বিমল বললে, কিন্তু এ উড়োজাহাজ চালাচ্ছে কারা?
এখনও তাদের কারুর দেখাই পাইনি। বিমল, বিমল, মনে আছে তো, আমি বলেছিলুম যে-কোনও Vaccum যন্ত্র দিয়ে এই উড়োজাহাজ পৃথিবী থেকে নমুনা সংগ্রহ করছে? ওই দেখো!
বিমল হেঁট হয়ে স্বচ্ছ গৃহতলের ভিতর দিয়ে দেখলে, তাদের কাছ থেকে অনেক তফাতে, একটা বিরাট ঘণ্টার মতন জিনিস নীচের দিকে নেমে গেছে–তার দীর্ঘ প্রায় তিনশো ফুট ও বেড় প্রায় একশো ফুটের কম হবে না।
বিমল আশ্চর্য স্বরে বললে, অত বড় একটা যন্ত্র যখন এই উড়োজাহাজের গায়ে লাগানো আছে, তখন এর আকার না জানি কী প্রকাণ্ড!
বিনয়বাবু বললেন, হ্যাঁ, এত বড় উড়োজাহাজের কল্পনা বোধহয় পৃথিবীতে এখনও কেউ করতে পারেনি। যে উড়োজাহাজে আমরা আছি, এটা নিশ্চয়ই একটা ছোটখাটো শহরের মতন বড়!
কিন্তু আমি কি ভাবছি জানো বিমল? আমরা ওই Vaccum যন্ত্র দিয়ে এখানে কি করে এলুম? চেয়ে দেখো, আমরা এখন যেখানে আছি, এর চারদিক দেওয়াল দিয়ে ঘেরা। কে বা কারা আমাদের এখানে নিয়ে এল? আর কোনও পথ যখন নেই, তখন আমরা এখানে এলুমই বা কেমন করে?
বিমল বললে, কেমন একটা ধাক্কা লাগতে আমি আচ্ছন্নের মতন হয়ে পড়েছিলুম, কোথা দিয়ে কী যে ঘটল কিছুই বুঝতে পারিনি।
আমারও ঠিক সেই অবস্থাই ঘটেছিল। কিন্তু ওই দেওয়ালগুলোর পিছনে কী আছে? জানবার জন্যে আমার কেমন কৌতূহল হচ্ছে।
কিন্তু কৌতূহল নিবৃত্তির কোনও উপায়ও নেই। কারণ বিনয়বাবুরা যে কামরায় আছেন, তার ছাদ, মেঝে ও এক পাশের দেওয়াল ছাড়া আর তিনদিকের দেওয়াল কালো রঙের পর্দা দিয়ে ঘেরা স্বচ্ছ দেওয়ালের ওপাশে পর্দার ভাঁজ স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।
বিমল বললে, এ কামরায় যে আলো জ্বলছে, তা লক্ষ করে দেখেছেন?
হ্যাঁ। ও আলোর ব্যবস্থা হয়েছে নিশ্চয়ই রেডিয়ামের সাহায্যে।
রেডিয়ামের সাহায্যে?
হ্যাঁ। রাত্রের অন্ধকারে রেডিয়ামের ঘড়ি দেখেন তো? এখানে সেই উপায়ে, অর্থাৎ ঘড়ির বদলে ঘর আলোকিত করা হয়েছে। বিমল, মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজে আসতে বাধ্য হয়ে তুমি ভয় পাওনি তো?
না, বিনয়বাবু, ভয় আমি মোটেই পাইনি, কিন্তু আমি চিন্তিত হয়েছি। চিন্তিত হয়েছ? কেন?
