বিমল বললে, ওরা আপনাকে ছেড়ে দিলে তো কেঁদে বাঁচবেন। কিন্তু ওরা যে আপনাকে ছাড়বেই না। আপনি এখন যেখানে যাবেন ওরাও আপনার সঙ্গে সঙ্গে যাবে।
কেন, কেন?
কারণ আপনি এখন বিখ্যাত হয়েছেন।
বটে, বটে, তাই নাকি? তাহলে আমি অজ্ঞাতবাস করব।
ওরা আবার আপনাকে খুঁজে বার করবে।
বিনয়বাবু অত্যন্ত দুঃখিতভাবে বললেন, তাহলে আমাকে মঙ্গল গ্রহে যাত্রা করতে হবে। বিমল, এই একদিনেই কথা কয়ে কয়ে আমার মুখে ব্যথা ধরে গেছে, আজ সারাদিন আমি একটুও জিরুতে পারিনি।
.
শূন্যে
আজ সকাল থেকে ডাকবাংলোয় লোকের পর লোক আসছে সারা দিনের মধ্যে বিনয়বাবু একটু হাঁপ ছাড়বারও ছুটি পেলেন না।
বৈকালে তিনি মরিয়া হয়ে বাংলো ছেড়ে পলায়ন করলেন সঙ্গীদের কোনও খবর না দিয়েই।
বিমল, কুমার, কমল ও রামহরি চারিদিকে খুঁজতে বেরুল, কিন্তু বিনয়বাবুকে কোথাও পাওয়া গেল না।
বিমল মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, তাই তো, সত্যি-সত্যিই তিনি দেশত্যাগী হয়ে গেলেন নাকি?
রামহরি বললে, হয়তো এতক্ষণে তিনি নিজেই বাসায় ফিরেছেন।
দেখা যাক, বলে বিমলও আবার বাংলোর পথ ধরল।
তখন সন্ধে হয়েছে। সকলে যখন একটা বাঁশবনের পাশ দিয়ে আসছে–হঠাৎ তার ভিতরে একটা খড়মড় শব্দ শোনা গেল। বিলাসপুরে আজকাল একটা চিতাবাঘের উপদ্রব হয়েছে–বিমল তাড়াতাড়ি তাই তার বন্দুকটা বাগিয়ে ধরলে। সেদিনের সেই ব্যাপারের পর থেকে বন্দুক না নিয়ে সে আর পথে বেরোয় না।
বন্দুক তোলবামাত্র বাঁশবনের ভিতর থেকে শোনা গেল–বিমল ভায়া, সাবধান! যেন আমাকে শিকার করে ফেলো না!
কমল বলে উঠল, এ যে বিনয়বাবুর গলা!
বিনয়বাবু হাসতে-হাসতে বাঁশঝাড়ের এক পাশ থেকে বেরিয়ে এলেন।
বিমল আশ্চর্য স্বরে বললে, ওকী বিনয়বাবু, ওখানে আপনি কী করছিলেন!
বিনয়বাবু বললেন, দিব্যি নিরিবিলি হে, ঘাসের ওপরে পরম আরামে শুয়েছিলাম।
যদি সাপে কামড়াত?
সাপে শুধু কামড়ায়, কিন্তু প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে না। উঃ, ডাকবাংলোয় আরও কিছুক্ষণ থাকলে আমি পাগল হয়ে যেতুম। বিমল, বাংলো থেকে আপদগুলো এতক্ষণে বিদায় হয়ে গেছে কি?
বিমল বললে, এতক্ষণে বোধহয় গেছে।
বিনয়বাবু বললেন, দেখো বিমল, বাংলো থেকে বেরিয়ে এসে আর একটা উপকারও হয়েছে। এখানে শুয়ে শুয়ে আমি একটা দৃশ্য দেখলুম।
কী দৃশ্য?
সামনেই মাঠের ওপরে গাঁয়ের ছেলেরা ফুটবল খেলছিল। আমি এইখানে শুয়ে অন্যমনস্কভাবে তাই দেখছিলুম। এমন সময় আকাশে হঠাৎ সেই ভয়ানক শব্দটা শুনলুম–যেন হাজার হাজার শ্লেটের ওপরে কারা হাজার হাজার পেনসিল চালিয়ে যাচ্ছে।
বিমল, কুমার ও কমল একসঙ্গে বলে উঠল, অ্যাঁঃ দিনের বেলায়?
বিনয়বাবু বললেন, হ্যাঁ। এ থেকে প্রমাণ হচ্ছে, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দাদের সাহস দিনে। দিনে বেড়ে উঠছে। শীঘ্রই তারা আমাদের ওপরে অত্যাচার শুরু করবে।
বিমল বললে, তারপর?
শব্দটা শুনেই আমি তো ধড়মড় করে উঠে বসলুম। আকাশের দিকে চেয়ে দেখি, সেই প্রকাণ্ড কালো ছায়াটা ঘুরতে-ঘুরতে নীচে নেমে আসছে। মাঠের দিকে চেয়ে দেখলুম, ছেলেরা তখনও ফুটবল খেলা নিয়ে মত্ত কিছুই তারা টের পায়নি। হঠাৎ ফুটবলটা লাথি খেয়ে খুব উঁচুতে উঠল, কিন্তু সেটা উপর দিকেই সমানে উঠে মিলিয়ে গেল, নীচে আর নেমে এল না। ছেলেরা তো অবাক! তারপর আকাশপানে চেয়ে সেই কালো ছায়াটা দেখেই তারা ভয় পেয়ে যে-যার বাড়ির দিকে দৌড় মারলে।
আর সেই কালো ছায়াটা?
সেটা আর নীচের দিকে নামল না, আকাশের গায়ে এক জায়গাতেই দুলতে লাগল। সন্ধে পর্যন্ত যতক্ষণ চোখ চলে, আমি তাকে মাঠের উপরে ওইখানে দেখেছিবলে বিনয়বাবু আকাশের একদিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেন।
সকলে সেইদিকে চেয়ে দেখলে, কিন্তু কিছুই দেখা গেল না–আকাশ তখন অন্ধকার।
বিনয়বাবু বললেন, আজ আমি অনেকক্ষণ ধরে ছায়াটা–অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজখানা দেখবার সুবিধা পেয়েছি। যদিও সেটা অনেক উঁচুতে ছিল, তবু আমি আন্দাজেই বলতে পারি যে উড়োজাহাজখানার আকার খুব প্রকাণ্ড–অন্তত মাইলখানেকের কম লম্বা তো হবেই না।
রামহরি বললে, বাবু, আমার বুক কেমন ছমছম করছে। আর এখানে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে, বাসায় ফিরে চলুন, সেখানে গিয়ে কথাবার্তা কইবেন।
এমন সময়ে দেখা গেল, গাঁয়ের ভিতর থেকে অনেকগুলো লণ্ঠন নিয়ে একদল লোক মাঠের উপরে এসে দাঁড়াল।
কুমার বললে, মিলিটারি পুলিশ, সকলের হাতেই বন্দুক রয়েছে।
বিনয়বাবু বললেন, ছেলেদের মুখে খবর পেয়েই বোধহয় ওরা এইদিকে এসেছে। কিন্তু ওরা আর করবে কী, উড়োজাহাজ পর্যন্ত বন্দুকের গুলি তো পৌঁছোবে না।
ধীরে ধীরে আকাশের গায়ে তৃতীয়ার চাঁদ হাসিমুখে জেগে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে সেই শব্দ শোনা গেল হাজার হাজার শ্লেটের উপর হাজার হাজার পেনসিলের শব্দ।
বিনয়বাবু বললেন, শব্দটা যে আগেকার চেয়েও আরও কাছে বলে মনে হচ্ছে!
সকলে কান পেতে শুনতে লাগল–শব্দ আরও কাছে নেমে এল, আরও–আরও কাছে।
রামহরি ভীত স্বরে বললে, চলুন, চলুন–এইবেলা পালাই চলুন।
শব্দ আরও কাছে। আচম্বিতে পাশের বাঁশঝাড় ও গাছপালার মধ্যে ঝড় জেগে উঠল– কনকনে ঠান্ডা হাওয়ার ঝড়।
বিনয়বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার।
সঙ্গে সঙ্গে রামহরি, কুমার ও কমল আর্তনাদ করে উঠল।
