বিনয়বাবু বললেন, উপায় একটা করতেই হবে বই কী! মানুষ এখনও টের পায়নি, তাদের মাথার উপরে কী বিপদের খাঁড়া ঝুলছে। আজ যে অত্যাচার খালি বিলাসপুরে হচ্ছে, দুদিন পরে তা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বিমল বললে, কিন্তু কী উপায় আপনি করবেন?
বিনয়বাবু বললেন, তা আমি এখন বলতে পারি না। তবে আজকেই আমি আমার মত একটি প্রবন্ধে খুলে লিখব, আর কাল তা সংবাদপত্রে প্রকাশ করব। সকলকে আগে আসল ব্যাপারটা জানিয়ে দেওয়া দরকার, কারণ আমাদের মতো দু-একজনের চেষ্টায় কোনওই সুবিধা হবে না, এখন সকলকে একসঙ্গে মিলে মিশে করতে হবে।
কমল বললে, কিন্তু বিনয়বাবু, দেশের লোকে যদি আপনার কথাকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেয়?
তাহলে তারা নিজেরাই মরবে। আমার যুক্তি আর এমন সব চাক্ষুষ প্রমাণ দেখেও যদি কেউ বিশ্বাস না করে, তাহলে আমি নাচার। তবু আমার কর্তব্য আমি করে খালাস হব। এখন চলো। সকলে বাংলোর দিকে ফিরল। যেতে যেতে মুখ তুলে বিমল দেখলে, আকাশের গায়ে সেই অদ্ভুত ছায়াটা এখনও জেগে আছে, তবে আরও ছোট আরও অস্পষ্ট।
বিমল অবাক হয়ে মনে-মনে ভাবতে লাগল–না জানি, এমন কী গভীর রহস্য ওই বিচিত্র ছায়ার আড়ালে লুকানো আছে, যা শুনলে সারা পৃথিবীর বুক ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে যাবে!
.
বিখ্যাত হওয়ার বিপদ
পরদিনের সকালে খবরের কাগজ আসবামাত্র বিমল তাড়াতাড়ি সেখানি নিয়ে পড়তে বসল, কারণ আজকেই বিনয়বাবুর প্রবন্ধটা প্রকাশ হওয়ার কথা।
খবরের কাগজ খুলেই বিমল সর্বপ্রথমে দেখলে, বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে–
বিলাসপুরের নতুন রহস্য!
আকাশ হইতে মানুষের মৃতদেহ পতন!
তারপর গতকল্য বিলাসপুরে যে ঘটনা ঘটেছিল এবং আমরা আগেই যার ইতিহাস দিয়েছি, তার বর্ণনা। তার পরেই আবার বড় বড় অক্ষরে–
বিশেষজ্ঞের বিচিত্র আবিষ্কার
মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দা।
পৃথিবীর ভীষণ বিপদ।
শিরোনামার তলায় বিনয়বাবুর প্রবন্ধ। বিনয়বাবু কিছুমাত্র অত্যুক্তি না করে বেশ সরল ও সহজ ভাষায় আপনার মত ব্যক্ত করে গেছেন। তার মতও আমরা আগেই প্রকাশ করেছি, সুতরাং এখানে আর তা উল্লেখ করবার দরকার নেই। প্রবন্ধের শেষে সম্পাদক লিখেছেন– বিনয়বাবু যে আশ্চর্য ব্যাপারের উল্লেখ করিয়াছেন, তাহা সহজে কল্পনায় আসে না। হয়তো অনেকেই তাহার কথাকে পাগলের প্রলাপ বলিয়া উড়াইয়া দিবেন, কিন্তু আমরা আপাতত তাহার মত সমর্থন করা ছাড়া উপায়ান্তর দেখিতেছি না। কারণ বিনয়বাবু বহু বৎসর আলোচনা চিন্তা ও বিচারের পর এবং চাক্ষুষ প্রমাণ দেখিয়া যে সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন, তাহা অস্বীকার করা অসম্ভব। মঙ্গল গ্রহে জীবের অস্তিত্ব যে বিনয়বাবুর মনগড়া কথা, তাহাও নহে। ইউরোপ আমেরিকার অনেক বড় বড় পণ্ডিত এ ব্যাপারটাকে সত্য বলিয়াই মানিয়া থাকেন। এমনকী বেতারযন্ত্রের আবিষ্কারক মার্কনি সাহেবও একবার মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দাদের সঙ্গে সংবাদ আদান প্রদানের চেষ্টা করিয়াছিলেন। সুতরাং এটা বেশ স্পষ্টই বুঝা যাইতেছে যে বিনয়বাবুর মতো যথার্থ বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপরেই প্রতিষ্ঠিত। এছাড়া বিলাসপুরের আশ্চর্য রহস্যের কিনারা করিবার আর কোনও উপায়ও দেখিতেছি না। আসল কথা, এই গুরুতর ব্যাপার লইয়া এখন রীতিমতো চিন্তা করা আবশ্যক। কারণ বিনয়বাবু পরিষ্কারভাবেই দেখাইয়াছেন যে, পৃথিবীর মাথার উপরে বিষম এক বিপদের মেঘ ঘনাইয়া আসিয়াছে,সময় থাকিতে সাবধান না হইলে এ বিপদ আরও ভয়ানকরূপে আত্মপ্রকাশ করিতে পারে।
বিমল বললে, বিনয়বাবু, সম্পাদক আপনারই মতো সমর্থন করেছেন!
বিনয়বাবু বললেন, যার মাথায় এতটুকু যুক্তি আছে, তাকে আমার মত মানতেই হবে।–এই বলে খবরের কাগজখানা নিয়ে তিনি পড়তে বসলেন।
বৈকালে ডাকবাংলোতে লোক আর ধরে না! স্থানীয় জমিদার, মোড়ল ও মাতব্বর ব্যক্তিরা বিলাসপুরের এবং আশপাশের গাঁয়ের লোকজনে ডাকবাংলোর ঘর থেকে বারান্দা পর্যন্ত ভরে গেল। কলকাতার অনেক খবরের কাগজের অফিস থেকেও সাহেব ও বাঙালি প্রতিনিধিরা এলেন। এ অঞ্চলের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট সাহেব ও দারোগা প্রভৃতি এসেও ঘরের একপাশে আসন সংগ্রহ করলেন। সকলেরই ইচ্ছা, বিনয়বাবুর সঙ্গে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে আলোচনা করা।
বিনয়বাবুর প্রথমটা ভয় ছিল, লোকে তার কথা বিশ্বাস করবে কিনা। কিন্তু এখন দেখলেন, তার উলটো বিপদ উপস্থিত। সকলের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে তার প্রাণ যায় আর কি!
পুলিশ সাহেব খানিকক্ষণ বিনয়বাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে বললেন, আচ্ছা বিনয়বাবু, আপনার সন্দেহ যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের কী করা উচিত?
সাহেব বললেন, রাত্রে গাঁয়ে সশস্ত্র সেপাই বসিয়ে রাখব কি?
কেন?
মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজ কাছে এলেই সিপাইরা বন্দুক ছুড়বে।
বিনয়বাবু একটু ভেবে বললেন, পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। কিন্তু এই উড়োজাহাজ কীরকম পদার্থ দিয়ে তৈরি তা তো আমি বলতে পারি না। বন্দুকের গুলিতে তার ক্ষতি হতেও পারে, না হতেও পারে।
সন্ধ্যার পরে একে একে সবাই যখন বিদায় নিয়ে চলে গেল, বিনয়বাবু শ্ৰান্তভাবে বিছানার উপরে শুয়ে পড়লেন।
বিমল হাসতে হাসতে বললে, বিনয়বাবু, একদিনেই আপনি বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন।
বিনয়বাবু হতাশ হয়ে বললেন, বিখ্যাত হওয়ার এত জ্বালা! আমার কী মনে হচ্ছে জানো বিমল? ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি!
