.
আকাশ থেকে মাংস-বৃষ্টি
সেইদিন সন্ধ্যার কিছু আগে বিনয়বাবুর সঙ্গে সকলে বেড়িয়ে বাংলোর দিকে ফিরছিল। গেল রাতের সেই প্রায় শুকনো পুকুরটার কাছে এসে বিনয়বাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। পুকুরের দু-দিকে বাঁধা ঘাট, কিন্তু জল নেমে যাওয়াতে ঘাটের সব নীচের শেওলা-মাখা সিঁড়ির ধাপ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুকুরের তলায় এখনও অল্প, একটু জল চিকচিক করছে।
বিনয়বাবু যেন আপনা-আপনি বললেন, যে যন্ত্র দিয়ে এত অল্প সময়ে অতখানি জল শুষে নেওয়া যায়, সে যন্ত্রটা না জানি কী প্রকাণ্ড! খালি ঠান্ডা হাওয়া নয়, এই পুকুর-চুরি দেখেও আমার বিশেষ সন্দেহ হচ্ছে যে, যন্ত্রটি নিশ্চয়ই Vaccum! বিশেষ, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা। যে এয়ার টাইট ব্যোমযানে করে এসেছে, তার আকারও নিশ্চয় সামান্য নয়! নইলে তার। ভিতরে স্টিমার, ইঞ্জিন, বটগাছ আর প্রায় এক-পুকুর জল থাকবার ঠাই হত না।
হঠাৎ উপর থেকে কি কতকগুলো জিনিস ঝপাং করে পুকুরের ভিতরে পড়ল এবং কতকগুলো পড়ল পুকুরের পাড়ের উপরে। সকলে বিস্মিত চোখে উপর দিকে তাকিয়ে দেখলে কিন্তু সেখানে কিছুই নেই। কেবল অনেক উঁচুতে আকাশের বুকে ছায়ার মতো কি যেন একটা জেগে রয়েছে, কিন্তু সেটা এত অস্পষ্ট যে, তার বিষয়ে জোর করে কিছু বলাও যায় না!
বিনয়বাবু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলে উঠলেন, হায়, হায়, কলকাতা থেকে আসবার সময় একটা ভালো দুরবিন যদি সঙ্গে করে আনতুম, তাহলে এখনি সব রহস্যের কিনারা হয়ে যেত!
কমল বললে, কিন্তু আকাশ থেকে ওগুলো কী এসে পড়ল?
বিমল তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেল, খানিক তফাতেই রাঙা পিণ্ডের মতন কি একটা পড়ে রয়েছে। কিন্তু কাছে গিয়েই সে সভয়ে আবার পিছিয়ে এসে বলে উঠল, বিনয়বাবু!
কী বিমল, ব্যাপার কী?
এ যে মানুষের দেহ!
অ্যাঁ, বলো কী!
সকলেই সেই রাঙা পিণ্ডটার দিকে বেগে ছুটে গেল। সামনে সত্যই একটা রক্তমাখা মাংসের স্তূপ পড়ে রয়েছে, অনেক উঁচু থেকে পড়ার দরুন সেটা এমন তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে যে সহজে তা মানুষের দেহ বলে চেনাই যায় না। তবে দেহের কোনও কোনও অংশ এখনও তার মনুষ্যত্বের অল্পস্বল্প পরিচয় দিচ্ছে।
কমল বললে, লোকটা বোধহয় মঙ্গল গ্রহের উড়োজাহাজ থেকে পালিয়ে আসবার জন্যে। লাফিয়ে পড়েছিল!
কুমার একটা নিশ্বাস ফেলে বললে, আহা বেচারা! আমার বাঘাও সেখানে আছে, না জানি সে কী করছে!
কিন্তু বিনয়বাবু তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সেই মাংসপিণ্ডের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, না, এই দেহ যার, সে নিজে উপর থেকে লাফিয়ে পড়েনি।
বিমল বললে, তবে?
লাফিয়ে পড়বার আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল!
কী করে জানলেন আপনি?
বিনয়বাবু মাংসপিণ্ডের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, দেখো, এই মড়াটার একটা হাত আর বুকের একটা পাশ এখনও থেতলে গুঁড়ো হয়ে যায়নি। ভালো করে চেয়ে দেখো দেখি, কী দেখছ?
বিমল হেঁট হয়ে পড়ে দেখতে লাগল। তারপর বললে, একী, এর দেহের উপরকার ছাল ছাড়িয়ে ফেলা হয়েছে।
খালি তাই নয়, বুকের আর হাতের উপরকার মাংসও ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে।
কেন বিনয়বাবু?
ভালো করে দেখলে তাও বুঝতে পারবে। দেখোনা, মেডিকেল কলেজের ডাক্তারেরা ঠিক যেভাবে মড়া কাটে, এই দেহটার উপরেও ঠিক সেইভাবেই ছুরি চালানো হয়েছে। বিমল, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা মানুষের শবব্যবচ্ছেদ করে দেখেছে।
তার মানে?
তারা দেখতে চায়, মানুষ কোন শ্রেণির জীব। হুঁ, এখন বুঝতে পারছি, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দাদের চেহারা নিশ্চয়ই মানুষের মতো নয়, কারণ তা যদি হত তাহলে মানুষের দেহ নিয়ে এভাবে পরীক্ষা করবার আগ্রহ তাদের নিশ্চয়ই থাকত না। বিমল, কুমার, পৃথিবীতে সত্যই যে মঙ্গল গ্রহের ব্যোমযান এসেছে, আর বিলাসপুরে স্টিমার ইঞ্জিন যে আকাশেই অদৃশ্য হয়েছে, উপর থেকে এই মড়ার আবির্ভাবে তোমরা বোধহয় সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছ?
বিমল, কুমার ও কমল কেউ কোনও জবাব দিলে না; আজ এই চাক্ষুষ প্রমাণের উপর আর কোনও সন্দেহ চলে না।
রামহরি বললে, কিন্তু বাবু, পুকুরের ভেতরেও যে এইসঙ্গে কি কতকগুলো এসে পড়েছে। সেগুলো কী, দেখবেন না?
বিনয়বাবু ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন, না রামহরি, আর দেখবার দরকার নেই। সেগুলোও হয়তো আর কোনও অভাগার দেহ! মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা নিশ্চয় এদের হত্যা করেছে, তারপর পরীক্ষা শেষ করে দেহগুলোকে আবার পৃথিবীতে ফেলে দিয়েছে।
রামহরি বললে, আপনার কথা শুনে তো বাবু আমি কিছুই ঠাউরে উঠতে পারছি না! আকাশে তো দেবতারা থাকেন, তবে কি দেবতারাই পৃথিবীতে বেড়াতে এসেছেন?বলেই সে আকাশের দিকে মুখ তুলে দেবতাদের উদ্দেশে ভক্তিভরে বার বার প্রণাম করতে লাগল।
বিমল রেগে বললে, রামহরি, এখান থেকে তুই বিদায় হ! এসময়ে তোর বোকামি আর ভালো লাগে না।
রামহরি বললে, চটো কেন খোকাবাবু? আমি তো আর তোমাদের মতো ক্রিশ্চান নই, রামপাখির ঝোলও খাই না। ঠাকুর-দেবতাকে ভক্তি করা আমি বোকামি বলে মনে করি না।
বিমল আরও চটে বললে, বেশ, এবারে দেবতাদের সাড়া পেলেই তোকে সশরীরে স্বর্গে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করব, আপাতত তুই মুখ বন্ধ কর।
কুমার বললে, কিন্তু বিনয়বাবু, এ যে বড় ভয়ানক কথা! আপনার ওই মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা পৃথিবী থেকে মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে খুন করবে, আর আমরা চুপ করে বসে তাই দেখব? তাদের বাধা দেওয়ার কি কোনও উপায় নেই?
