কুমার আশ্চর্য স্বরে বললে, রকেটে চড়ে?
হ্যাঁ। কিন্তু এ তোমাদের সাধারণ বাজিওয়ালার হাতে তৈরি ছেলেখেলার রকেট নয়– তার চেয়ে হাজার হাজার গুন বড়। তার মধ্যে মস্ত এক ধাতু-তৈরি ঘর থাকবে, সে-ঘরে থাকবেন সেই সাহসী বৈজ্ঞানিক। উপরের ঘরের তলায় থাকবে বারুদের ঘর। মঙ্গল গ্রহ যে সময়ে পৃথিবীর কাছে আসবে, সেই সময়ে এই রকেট ছোঁড়া হবে। বায়োস্কোপের এক অভিনেতা একটি মাঝারি আকারের রকেটে চড়ে পৃথিবীর এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় নিরাপদে গিয়ে দেখিয়েছেন যে, এ ব্যাপারটা একেবারেই অসম্ভব নয়।
বিমল বললে, কিন্তু এ থেকে কী প্রমাণিত হচ্ছে?
এ থেকে প্রমাণিত হচ্ছে যে, মঙ্গল গ্রহ আর পৃথিবীর বাসিন্দারা পরস্পরের পরিচয় জানবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। এখন আমি যদি বলি যে, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা আমাদের চেয়ে আরও কিছু বেশি অগ্রসর হয়েছে, অর্থাৎ তারা ইতিমধ্যেই পৃথিবী থেকে নানা নমুনা নিয়ে যেতে শুরু করেছে, তাহলে কি অত্যন্ত অবাক হবে?
বিমল, কুমার আর কমল একসঙ্গে সবিস্ময়ে বলে উঠল, আঁ, বলেন কী, বলেন কী?
বিনয়বাবু দৃশ্য স্বরে বললেন, হ্যাঁ, বিলাসপুরে এই যে সব অলৌকিক কাণ্ড হচ্ছে তা মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দাদের কীর্তি ছাড়া আর কিছুই নয়। পৃথিবীর যা কিছু দেখেছে, পরীক্ষা করবার জন্যে সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছে।
বিমল রুদ্ধশ্বাসে বললে, কিন্তু কী উপায়ে?
উপায়ের কথা আমি ঠিক করে কিছু বলতে পারছি না বটে, তবে আমি যা আন্দাজ করেছি, সেটা সম্ভব হলেও হতে পারে। আমাদের জানা আছে যে পৃথিবীর উপরে মাইল কয়েক পর্যন্ত বাতাসের অস্তিত্ব, তার পরে আর বাতাস নেই, আছে কেবল শূন্য। এই শূন্যের মধ্যে অন্য অন্য যেসব গ্রহ ঘুরছে, তাদের মধ্যে হয়তো পৃথিবীর মতো বায়ুমণ্ডল আছে। কিন্তু পৃথিবী থেকে অন্য গ্রহে, কিংবা অন্য গ্রহ থেকে পৃথিবীতে যেতে আসতে হলে বায়ুহীন শূন্য পার হতে হবে। আমার বিশ্বাস মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা ডুবোজাহাজের মতো এয়ার-টাইট বা ছিদ্রহীন এমন কোনও ব্যোমযান তৈরি করেছে, যার ভিতরে দরকার মতো বাতাসের কিংবা অক্সিজেন বাষ্পের ব্যবস্থা আছে। সেই ব্যোমযান চড়ে শূন্য পার হয়ে তারা পৃথিবীর আবহাওয়াতে এসে হাজির হয়েছে। কাল রাত্রে যখন এখানকার চৌকিদার আর বাঘা আর্তনাদ করেছিল আকাশের দিকে চেয়ে তখন আমি লক্ষ করেছিলুম-অনেক উঁচুতে চাঁদের আলোর মাঝখানে প্রকাণ্ড কি একটা ছায়ার মতো ভাসছে–খানিক পরেই আবার তো মিলিয়ে গেল। আমার বিশ্বাস সে ছায়া আর কিছু নয়–মঙ্গল গ্রহের ব্যোমযান।
খানিকক্ষণ সকলেই অভিভূতের মতন স্তব্ধ হয়ে ভাবতে লাগল। বিনয়বাবু যা বললেন, কেউ তা স্বপ্নেও কোনওদিন কল্পনা করতে পারেনি। অবশেষে বিমল বললে, কিন্তু আমরা মঙ্গল গ্রহের কোনও লোককে তো দেখতে পাইনি! তবে বিলাসপুর থেকে স্টিমার, ইঞ্জিন, বটগাছ, পুকুরের জল আর জীবজন্তু কেমন করে অদৃশ্য হচ্ছে?
বিনয়বাবু বললেন, এ প্রশ্নের নির্ভুল জবাব দেওয়া শক্ত; তবে ওই রহস্যময় ঠান্ডা হাওয়ার প্রবাহের জন্য আমার মনে একটা সন্দেহ জাগছে। তোমরা কেউ Vaccum Cleaner দেখেছ?
কুমার বললে, হ্যাঁ শিয়ালদহ স্টেশনে দেখেছি। একটি যন্ত্রের সঙ্গে লম্বা নল আছে। সেই নলের মুখ ধুলোর উপরে ধরে যন্ত্র চালালেই ভিতর থেকে হু হু করে হাওয়া বেরিয়ে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত ধুলো নলের ভিতরে ঢুকে পড়ে। এই উপায়ে খুব সহজেই ধুলো সাফ করা যায়।
বিনয়বাবু বললেন, খুব সম্ভব মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারা এইরকম কোনও যন্ত্রের সাহায্যেই পৃথিবীর উপরে অত্যাচার করছে। তবে তাদের এই Vaccum যন্ত্রটি এত বড় ও শক্তিশালী যে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড স্টিমার, ট্রেন ও বটগাছ, এমনকী এক-পুকুর জল পর্যন্ত তা অনায়াসে শুষে গিলে ফেলতে পারে! আচমকা ঠান্ডা হাওয়া বইবার আর কোনও কারণে তো আমার মাথায় আসছে না। যন্ত্রটি যখন বায়ুশূন্য হয়, সেই সময়েই চারিদিকে ঠান্ডা বাতাসের ঝাঁপটা লাগে। এই আমার মত।
কুমার শোকাচ্ছন্ন স্বরে বললে, তাহলে আমার বাঘাকে আর কখনও ফিরে পাব না?
বিনয়বাবু মাথা নেড়ে জানালেন, না।
বিমল চিন্তিতভাবে বললে, বিনয়বাবু, জানি না আপনার কথা সত্য কিনা! কিন্তু আপনার যুক্তি শুনলে এসব ব্যাপার অবিশ্বাস করতেও প্রবৃত্তি হয় না। আচ্ছা, এ বিষয় নিয়ে আপনি যখন এত আলোচনা করছেন, তখন বলতে পারেন কি, মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দাদের চেহারা কীরকম? তারা কি মানুষেরই মতো দেখতে?
বিনয়বাবু বললেন, তা কী করে বলব? তবে তাদের মস্তিষ্ক যে খুব উন্নত, তারা যে যথেষ্ট সভ্য, আর জ্ঞান-বিজ্ঞানেও খাটো নয়, তাদের কাজ দেখে এটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। পৃথিবীর অবস্থা, জল-মাটি আবহাওয়া আর জীবনযাত্রা নির্বাহের প্রণালী অনুসারেই আমাদের চেহারা এরকম হয়েছে; মঙ্গল গ্রহের ভিতরকার অবস্থা যদি অন্যরকম হয়, তবে সেখানকার জীবেরা মানুষের চেয়ে বেশি সভ্য আর বুদ্ধিমান হলেও, তাদের চেহারা অন্যরকম হওয়াই সম্ভব।
বিমল কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে বললে, এবার থেকে এখানে বন্দুক না নিয়ে আমি পথে বেরুব না।
কেন?
দাঁতে দাঁত চেপে বিমল বললে, যদি সুবিধে পাই, বুঝিয়ে দেব যে, মানুষ বড় নিরীহ জীব নয়!
